ভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার। এই ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টা হলে দেখা দেয় আন্দোলন। আমরা যেমন আন্দোলন করে পেয়েছি- 'মোদের গরব মোদের আশা আ-মরি বাংলা ভাষা'।

ভাষা আন্দোলনের প্রতীক 'শহীদ মিনার'। এই শহীদ মিনার তৈরির পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে হোস্টেলের ছাত্রদের এক রাতের শ্রমে গড়ে ওঠে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। এটিই পরে শহীদ মিনার হিসেবে পরিচিতি পায়; যা এখন হয়ে উঠেছে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতীক।

মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং 'শহীদ স্মৃতি অমর হোক'- এ স্লোগানের পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয় প্রথম শহীদ মিনার। নির্মাণকারী ছাত্ররা এর নাম দিয়েছিলেন 'শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ'। ২৩ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের বারান্দায় উপস্থিত কিছু ছাত্রের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে সারাদিনের পরিশ্রমে রাতে নির্মিত হয় এই প্রথম শহীদ মিনার।

এই স্মৃতিস্তম্ভের নকশা করেন মেডিকেলের ছাত্র বদরুল আলম। 'শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ' ফলকটিও তারই হাতে লেখা। ২৩ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ছিল কারফিউ। কারফিউয়ের মধ্যেও ছাত্রদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয়েছিল এই শহীদ মিনার। এটি ছিল সাড়ে ১০ ফুট উঁচু ও ছয় ফুট চওড়া। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ভবনের সম্প্রসারণের জন্য সেখানে আগে থেকে রাখা ইট, বালি ও সিমেন্ট দিয়ে ছাত্ররা তৈরি করেছিলেন শহীদ মিনার। ২৪ ফেব্রুয়ারি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির খবর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ জনতা স্মৃতিস্তম্ভ পরিদর্শনে আসতে শুরু করেন এবং ধিক্কার জানান শাসক গোষ্ঠীকে।

প্রথম এই শহীদ মিনার ভাষার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং ছাত্র-জনতার মধ্যে প্রতিবাদী চেতনার জোয়ার নিয়ে আসে। 'শহীদ বীরের স্মৃতিতে' শিরোনামে আজাদ পত্রিকায় স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির খবর প্রকাশিত হয়।

২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে দৈনিক 'আজাদ' পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন। এটি মানুষের মুখে মুখে হয়ে ওঠে শহীদ মিনার এবং প্রতিবাদী চেতনার প্রতীক।

২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর ওইদিন বিকেলে টনক নড়ে শাসক গোষ্ঠীর। বিকেলেই পুলিশ বাহিনী হোস্টেল ঘেরাও করে শাবল, কোদাল ও ট্রাক নিয়ে ঢুকে পড়ে ভেতরে। শহীদ মিনারের বুকে দড়ি বেঁধে ট্রাক দিয়ে টেনে ভেঙে ফেলা হয় স্তম্ভ। এরপর ট্রাকে তুলে নিয়ে যায় শহীদ স্তম্ভের ভাঙা অংশ। শহীদ মিনার ভাঙার সময় রাইফেল তাক ছিল জনতার দিকে। তাই সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ছাত্রকে অসহায় চোখে দেখতে হয়ে শহীদ মিনার ভাঙার দৃশ্য।

প্রথম নির্মিত শহীদ মিনারটি এভাবে ভেঙে ফেললেও পাকিস্তানি শাসকরা শহীদের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারেনি। সারাদেশে বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে অনুরূপ ছোট ছোট অসংখ্য শহীদ মিনার গড়ে ওঠে এবং ১৯৫৩ সাল থেকে দেশের ছাত্র-যুবসমাজ একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটিকে 'শহীদ দিবস' হিসেবে পালন করতে থাকে।

১৯৫৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন পূর্ববঙ্গ সরকারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং ভাষাশহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম। সে সময়ই একুশে ফেব্রুয়ারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

১৯৫৭ সালে শিল্পী হামিদুর রহমানের পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণের একাংশে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু হয়। হামিদুর রহমানের সহকর্মী হিসেবে ছিলেন ভাস্কর নভেরা আহমদ। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে সামরিক আইন জারি হওয়ার পর শহীদ মিনার তৈরির কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খানের নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী মূল নকশা বহুলাংশে পরিবর্তন করে এবং পরিকল্পিত স্থাপত্যের বিস্তর অঙ্গহানি ঘটিয়ে একটি নকশা দাঁড় করানো হয়। এ নকশা অনুযায়ী দ্রুত শহীদ মিনারের কাজ শেষ করা হয় এবং ১৯৬৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি এ মিনার উদ্বোধন করেন শহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগম। এই সংক্ষিপ্ত এবং খণ্ডিত শহীদ মিনারই একুশের চেতনার প্রতীকরূপে জনমানসে পরিচিত হয়ে ওঠে।

'৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী মিনারটি আবার ভেঙে দেয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে শহীদ মিনার নতুন করে তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূল নকশা পরিহার করে ১৯৬৩ সালের সংক্ষিপ্ত নকশার ভিত্তিতেই দ্রুত কাজ শেষ করা হয়। ১৯৭৬ সালে নতুন নকশা অনুমোদিত হলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ১৯৮৩ সালে মিনার চত্বরের কিছুটা বিস্তার ঘটিয়ে শহীদ মিনারটিকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। বর্তমানের শহীদ মিনার তার স্থাপত্য-ভাস্কর্যগত অসম্পূর্ণতা নিয়েই সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

মন্তব্য করুন