কিছু ক্ষত হৃদয়ে থেকে যায় আমৃত্যু। শুকানোর বৃথা চেষ্টা। জীবনপাঠে সে ক্ষত বারবার পীড়া দেয়। মা আমার জীবনের ছিল পুরো পৃথিবী। মাথার ওপর এক আসমান। আমার হৃদয়ে মায়ার মহাসাগর। আমার অক্সিজেন। তার প্রস্থান আমাকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের পেরেক গেঁথে দেয়। মায়ের সঙ্গে আমার শেষ স্মৃতি সাদা কাফনে জড়িয়ে কবরে রেখে আসা। ২০১৫ সালে ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার উদ্দেশে অফিস থেকে বের হই। বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ। খুশির জোয়ার। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ করব। সেই ফুরফুরে মন নিয়ে গাবতলী পৌঁছাই। বাসে উঠব। ঠিক তার আগ মুহূর্তেই খবর আসে মা মারা গেছেন! আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। আমার ভেতর সিডর, টর্নেডো, কালবৈশাখী বয়ে যাচ্ছে। আমি চারপাশ দেখছি। সব ঠিকঠাক। সব মানুষ ছুটছে মৌমাছির মতো। গাড়ি ছুটছে পাগলা ঘোড়ার মতো। কিন্তু আমার মনের ভেতর যেন তছনছ হয়ে যাচ্ছে। আমার আর্তনাদে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না, আমার চোখের গরম পানি কাউকে আহত করছে না। আমি কী করব দিশেহারা। শোকাহত মন নিয়ে এক বাসে উঠলাম। উঠেই মা বলে জোরে চিৎকার দিলাম। পুরো বাসের মানুষ এবার আমাকে নজরে আনলেন। তারা কিছুক্ষণ সান্ত্বনা দিয়ে আগের মতো শোরগোল করতে লাগলেন। তাদের তো কিছু হারায়নি, তারা কেন আমাকে বুঝবে। সেই বাড়ি ফেরা যেন অন্যরকম ছিল। এক মিনিট যেন এক শতাব্দীর মতো মনে হচ্ছিল। এখন বাবা, ভাই, বউ, সন্তান নিয়ে ঢাকায় থাকি। এখন যেন আগের মতো বাড়ি ফেরার তাড়া নেই। মাকে কথা দিয়েছিলাম যতদিন বেঁচে থাকি, কোনোদিন গ্রাম ছাড়া ঈদ করব না। সে ওয়াদা ভঙ্গ করেছি। সেই স্মৃতিগুলো এখন মনে হলে হাউমাউ করে কান্না করি। মায়ের কথা মনে হলেই বুকের ভেতর সেই ক্ষত জেগে ওঠে।

পরিবারের আমি বড় সন্তান। আমাকে ঘিরে মায়ের ছিল বাড়তি টান বা ভালোবাসা। ঈদে কবে ফিরব। কতদিন ছুটি পাব। অসংখ্য প্রশ্নে আমাকে পাগলপ্রায় করে ফেলত মা। বাড়ি ফিরতে রাত শেষ হলেও অপেক্ষা করত। আমি গেলে একসঙ্গে বসে খেতাম। দীর্ঘ যানজটে বসে থেকেও মলিন মুখ নিয়ে বাড়ি ফিরে যখন মাকে দেখতাম, তখন সব ক্লান্তি বা মলিনতার ইতি ঘটত। এখন বাড়ি ফিরলে মনে হয় সাহারা মরুভূমি। মা নেই, মায়ের সব স্মৃতি আছে। নারিকেল গাছ, জামগাছ, পেয়ারা গাছ, ফুল বাগান করেছিল- তা সব আছে। সেগুলো হাত দিয়ে স্পর্শ করি, মাকে মনে করি। মা যে মগে পানি পান করত, খাটে ঘুমাত, পাতিলে রান্না করত, দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করত- তা সবই আছে, শুধু মা নেই। এখন কেন জানি বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা হয় না। কেন জানি বাড়ি ফেরার কথা মনে হলেই মায়ের মুখ চোখের সামনে জলছবি হয়ে ভাসে। বাড়ি ফিরলে মায়ের কথা বেশি মনে হয়। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো হয়ে যায়।

মন্তব্য করুন