মায়ের প্রতি ভক্তি-ভালোবাসার টানে ঝড়ের রাতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দামোদর নদী সাঁতরিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন। মাতৃভক্তির এমন প্রচলিত উদাহরণ এখনও সবার মুখে। তবে সম্প্রতি মায়ের জন্য নিখাদ ভালোবাসার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন ঝালকাঠির নলছিটি পৌর শহরের বাসিন্দা জিয়াউল হাসান।

জিয়াউল হাসান বলেন, 'মায়ের অক্সিজেন লেভেল নেমে যাচ্ছিল। তার অস্থিরতা বাড়ছিল। হাতে সময় ছিল না। তাই নিজেই পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে মাকে পেছনে বসিয়ে বাইক চালিয়ে প্রায় ১৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। মাকে নিয়ে যখন রওনা হই, তখন আমার ভাবনায় ছিল না- করোনা ছোঁয়াচে নাকি। আমার ধ্যানজ্ঞান শুধু যে কোনো মূল্যে মাকে বাঁচাতে হবে। মা আমার কাছে পৃথিবী, তিনি আমার শিক্ষকও।' জিয়াউল হাসান বলেন, হাসপাতালে লাগাতার তিন রাত ঘুমাইনি। ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম মায়ের শয্যাপাশে। হাসপাতালে ওই ছয় দিন মা ছাড়া আর কোনো কিছু মাথায় ছিল না আমার। সুস্থ মাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মনে হয়েছে. আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বিজয়ী মানুষ। সেদিন মনে যে কী আনন্দ হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। ছোটবেলায় শোনা একটি গানের কলি বারবার মনে পড়ছিল- 'মাগো তোমার  নেই তুলনা।'


পেশায় কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা জিয়াউল হাসানের মা নলছিটি বন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা রেহেনা পারভীন করোনায় আক্রান্ত হন ১৫ এপ্রিল। নলছিটি পৌর শহরের সূর্যপাশা (৭নং ওয়ার্ড) এলাকায় বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। জিয়াউল হাসান বলেন, ১৬ এপ্রিল রাত থেকে মা শ্বাসকষ্ট অনুভব করছিলেন। পরদিন সকালে শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যায়। নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে মাকে দ্রুত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরমর্শ দেওয়া হয়। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিই সেখানে যাওয়ার। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স, পিকআপ, ইজিবাইক- কোনো যানবাহনই পাচ্ছিলাম না। লকডাউন ছাড়াও করোনা রোগী শুনে কেউ রাজি হচ্ছিল না বরিশালে আসতে। এ অবস্থায় নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ মনে হচ্ছিল। সিদ্ধান্ত নিই, নিজেই বাইক চালিয়ে মাকে নিয়ে যাব। তাই শরীরের সঙ্গে ২০ কেজি ওজনের সিলিন্ডার বেঁধে রওনা দিই হাসপাতালের উদ্দেশে। মা যাতে বাইক থেকে পড়ে না যান সে জন্য পেছনে অন্য একটি বাইকে ছিল ছোট ভাই রাকিবুল হাসান। মাকে নিয়ে যখন আমরা হাসপাতালে আসি তখন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কে এক পুলিশ কর্মকর্তা আমার ছবিটি তুলে ফেসবুকে দেন। ছবিটি ভাইরাল হয়। অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে বেঁধে মাকে নিয়ে এক সন্তানের হাসপাতালে ছোটার ছবি অনেককেই নাড়া দেয়। চিকিৎসার পর ২৩ এপ্রিল মাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা জানিয়ে জিয়াউল হাসান বলেন, ২৪ এপ্রিল আমি নিজেই করোনা পজিটিভ শনাক্ত হই। তেমন জটিলতা না থাকায় বাড়িতে আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছি। অসুস্থতায় মায়ের প্রতি সন্তানের এমন কর্তব্যনিষ্ঠা সম্পর্কে মা রেহেনা পারভীন বলেন, বাংলার ঘরে ঘরে যেন এমন সন্তান জন্ম নেয়- সৃষ্টিকর্তার কাছে এই প্রার্থনা করি।

মন্তব্য করুন