প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্ব মা দিবস। বিশ শতকের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালন শুরু হয়। এরপর ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। পায় আনুষ্ঠানিকতা। পৃথিবীতে কেউ যদি নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন, তিনি মা। মাকে ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন নেই। 

তবু, একটা বিশেষ দিনকে ধরে সন্তানরা যদি মায়ের জন্য বিশেষ কিছু করার চেষ্টা করে ক্ষতি কি। বিশ্ব মা দিবসে বিশ্বের সব মায়ের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা...



'আমি বাড়ির পেছন থেকে দরোজায় টোকা দিয়ে/ ডাকলুম- 'মা'।/বহুদিন যে-দরোজা খোলেনি,/বহুদিন যে দরোজায় কোন কণ্ঠস্বর ছিল না,/মরচে-পরা সেই দরোজা মুহূর্তেই ক্যাচ্‌ক্যাচ শব্দ করে খুলে গেলো।/বহুদিন চেষ্টা করেও যে গোয়েন্দা-বিভাগ আমাকে ধরতে পারেনি,/চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে, অফুরন্ত হাওয়ার ভিতরে সেই আমি/কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দী হয়ে গেলুম;/সেই আমি কত সহজেই মায়ের চোখে চোখ রেখে/ একটি অবুঝ সন্তান হয়ে গেলুম।'

- নির্মলেন্দু গুণ, কবিতা :হুলিয়া

মা- শর্তহীন ভালোবাসার এক অফুরন্ত আধার। চির নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার পরম আশ্রয়। হতাশার অন্ধকারে একবুক ভালোবাসা। আমার কাছে এই হলো মা। মায়ের কাছে সন্তান সব সময়ই অবুঝ, ছোট্টটি। একই সঙ্গে সবার সেরা, সব সময় বিজয়ী। তাইতো তার কাছে কিছু লুকাবার নেই। নেই পরাজয়ের গ্লানি। তাই নির্মলেন্দু গুণের 'হুলিয়া' কবিতায় আমরা দেখি, বহুদিনের বন্ধ দরাজা এক 'মা' ডাকে মুহূর্তে খুলে যায়। যে ছেলেকে রাষ্ট্রযন্ত্র চেষ্টা করেও ধরতে পারে না, সেই সন্তানই মায়ের আলিঙ্গনে কত সহজেই বন্দি হয়ে যায়।

মায়ের এই সহজ ভালোবাসার সুযোগও কিন্তু আমার কম নিইনা। প্রতিটি সন্তানের ক্ষেত্রেই এটা কম বেশি সত্য। আসছি মা, বলে কতদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছি। সারাদিন টইটই করে যখন বাড়ি ফিরেছি, মা তখন উদ্বিগ্ন আমার রোদেপোড়া মুখের কথা ভেবে। হাজারো বকুনি, শাসনের মধ্যেও ঠিক টের পেতাম মায়ের আদর, ভালোবাসা। এই যে হিসাবহীন ভালোবাসা এটা কেন? মা সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, জন্ম দেন, জন্মের পর স্তন দেন এ কারণে?

বিজ্ঞানের দাবি, মা ও সন্তানের শর্তহীন এই ভালোবাসার পেছনে রয়েছে অক্সিটোসিন নামের বিশেষ এক হরমোন। এই হরমোন নিঃসরণের ফলে মা তার সন্তানকে ভালোবাসেন। রুথ ফেল্ডম্যান নামের বিজ্ঞানী তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, অক্সিটোসিন হরমোনের কারণেই মা ও সন্তানের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা অনেক বেশি হয়। এ জন্য মায়েরা অন্যের সন্তানের চেয়ে নিজের সন্তানকে বেশি ভালোবাসেন। গবেষণা দেখিয়েছে, মা তার সন্তানকে যখন স্পর্শ করেন বা কোলে নেন, তখন অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যায়। এতে মায়ের ভালো লাগা বা সুখানুভূতিও বাড়ে। মা আনন্দে থাকেন। আবার সন্তান যখন দূরে থাকে তখন এই হরমোনের নিঃসরণ কমে যায়, মায়ের মন খারাপ হয়ে যায়। বিষণ্ণতা বাড়ে।

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার কবি উপন্যাসে লিখেছেন, 'শিশুর জন্মের পর নাড়ি কেটে মার কাছ থেকে তাকে আলাদা করা হয়। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় তুমি আর তোমার মায়ের শরীরের কোনো অংশ না। তুমি আলাদা একজন মানুষ। সত্যিকার অর্থে সেই নাড়ি কাটা পড়ে না। যতদিন বেঁচে থাকেন ততদিন অদৃশ্য নাড়ির বন্ধন থাকে। বন্ধন কাটা পড়ে মা'র মৃত্যুতে।' এই অদৃশ্য নাড়ির বন্ধনই কি তাহলে অক্সিটোসিন হরমোন? জানি না।

জানি না, ল্যাবরেটরির মাপজোকে মায়ের ভালোবাসা পরিমাপ সম্ভব কিনা বা তার আকার আয়তন। শুধু এটুকু জানি জন্মের পর মুখে প্রথম খাবার তুলে দিয়েছে যে সে মা। অসহায় আমাকে কোলে তুলে কান্না থামিয়ে ছিল যে সে আমার মা। নিজের বোকামিতে সবকিছু হারিয়েও যেখানে গিয়ে সুখ খুঁজে পাই সে হলো মা। এই মায়ের ভালোবাসাকে আমি ল্যাবরেটরির মাইক্রোস্কপের নিচে ফেলতে চাই না। দেখতে চাই না, আমার উপস্থিতি-অনুপস্থিতিতে তার সেই হরমোন কতটুকু বাড়ল বা কমলো। এই মুহূর্তে হুমায়ূন আহমেদের আরেকটা কথা মনে আসছে, 'মা হলো পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক সেখানে আমরা আমাদের সব দুঃখ কষ্ট জমা রাখি এবং বিনিময়ে নিই বিনা সুদে অকৃত্রিম ভালোবাসা।' আমি চিরদিন সেই ভালোবাসারই কাঙাল। আমি জানি, জন্মের পর আমার প্রথম উচ্চারণ ছিল- মা।

মজার বিষয় হলো, পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাতেই 'মা' বোঝাতে যে শব্দগুলো ব্যবহার হয় তার উচ্চারণ খুব কাছাকাছি। এবং বেশির ভাগেই শুরু ম বা ইংরেজি এম বর্ণ দিয়ে। জার্মান ভাষায় মাট্টার, ওলন্দাজ-ময়েদার, হিন্দি-মা, ইংরেজি-মম, মাম্মি, মাদার; ইতালিয়ান-মাদ্রে, পর্তুগিজ-মায়ে, আলবেনিয়ান-মেমে, বেলারুশান-মাটকা, সার্বিয়ান-মাজকা, ডাচ মোয়েন্ডেরে-মোয়ের, হাওয়াইয়ান-মাকুয়াহাইন, ক্রোয়েশিয়া-মাতি বা মাজকা, আইসল্যান্ড-মোয়ির, আইরিশ-মাতাইর, নরওয়েজিয়ান-মাদার, পোলিশ-মামা বা মাটকা, পাঞ্জাবি-মাই বা মাতাজি, রোমানিয়ান-মামা/মাইকা, রাশিয়ান-মাত, তেলেগু-আম্মা, সিন্ধি-উম্মি, আক্কাদিয়ান-উম্মা, বসনিয়ান-মাজকা, ফরাসি-মেরি/মামা, পারসিয়ান-মাদার/মামা, ব্যাবিলন-উম্ম, ইউক্রেনিয়ান-মাতি, বুলগেরিয়ান-মাজকা, প্রাচীন গ্রিক-মাতির মায়ের সমার্থক শব্দ।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহূত মা ডাকের শব্দগুলোর মধ্যে উচ্চারণগত এই মিল কীভাবে ঘটল তা এক রহস্য। ভাষাবিদরা বলেন, শিশুরা যখন মায়ের দুধ পান করে, তখন তারা তাদের মুখভর্তি অবস্থায় কিছু শব্দ করে। সেই শব্দগুলো নাক দিয়ে বের হয় বলে উচ্চারণগুলো অনেকটা ম এর মতো শোনা যায়। তাই প্রায় সব ভাষাতেই মা ডাকে ব্যবহূত শব্দগুলো ম বা এম দিয়ে শুরু। মা- ডাকের ব্যাখ্যা যদি এটা হয়, তাহলে বাবার ব্যাখ্যা কী? সেসব প্রশ্নে এখানে যাবো না, শুধু এটুকু বলতে চাই- পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর উচ্চারণ- মা। এটি শুধু শব্দ নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে আবেগ, অনুভূতির অনন্য রসায়ন। এই অদ্ভুত শব্দটির উচ্চারণ মুহূর্তে দুঃখ-কষ্ট নাই করে দেওয়ার শক্তি রাখে। প্রেরণা জোগায় বিশ্ব জয়ের। খামখেয়ালির জন্য যথেষ্ট বদনাম কুড়ানো বিশ্বখ্যাত ফুটবলার দিয়াগো ম্যারাডোনা বলেছিলেন, 'আমার মা মনে করেন আমিই সেরা। আর মা মনে করেন বলেই আমি সেরা হয়ে গড়ে উঠেছি।'

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কাজি নুরুন্নবীর ডায়েরি পড়ছিলাম। ডায়েরির শেষ পাতাটি লেখা ১৯৭১ সালের ৩১ জুলাই। নুরুন্নবীর জন্মদিন। ডায়রির শেষ প্যারায় তিনি লিখেছিলেন, 'মাগো! কোথায় তোমরা কেমন আছো? প্রত্যেক জন্মদিনে তোমাদের আশীর্বাদ পেতাম মা। আজ তোমরা আমায় আশীর্বাদ করেছো মাগো? কি বলে? তোমাদের ছেলে স্বাধীনতার সৈনিক। আমাদের সাফল্যের আশীর্বাদ করো মা। বিজয়ী হয়েই যেন তোমাদের সামনে দাঁড়াতে পারি। তোমার সুযোগ্য সন্তান হবার প্রার্থনাই আজকে আমার প্রার্থনা।' নুরুন্নবী ফেরেননি। কিন্তু, দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি ছিলেন মায়ের সুযোগ্য সন্তান। আমরা কি তার মতো যোগ্য সন্তান হতে পেরেছি?

সেই যে আসছি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম আর ফেরা হয়নি। মা এখন দূর আকাশের তারা। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, 'মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ধন কাটা পড়ে মায়ের মৃত্যুতে।' সত্যিই কি তাই? তাহলে রবিঠাকুরের 'মাকে আমার পড়ে না মনে' কবিতার মতো, গরমে আমার পিঠ যখন ঘেমে ওঠে, মনে হয় কেন একটা স্নেহার্দ্র হাত গামছা দিয়ে ভেজা পিঠ মুছিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ করে কেন শীতল বাতাস পরশ বুলিয়ে যায়? এ বন্ধন কখনোই কাটা পড়ার নয়। আমি ফিরি আমার মায়ের কাছে- 'জানলা থেকে তাকাই দূরে/নীল আকাশের দিকে/ মনে হয়, মা আমার পানে/ চাইছে অনিমিখে।'

মন্তব্য করুন