বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে ধ্রুপদি সংগীতের বিশ্বখ্যাত নাম ওস্তাদ রবিশঙ্কর এবং সাড়া জাগানো বিটলস ব্যান্ডের গিটারবাদক জর্জ হ্যারিসনের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট আমেরিকার নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত সেই কনসার্ট উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছিলেন অনেকেই। তাদের কয়েকজনের সেদিনের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন শামীম আল আমিন

১৯৭১ সালে প্রযুক্তি এখনকার মতো আলো ছড়ায়নি। ফলে যারা কাছ থেকে ঘটনাপ্রবাহ জেনেছেন কিংবা দেখেছেন, তার মূল্য অনেক বেশি। 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' নিয়ে কাজ করার সময় তেমনি কিছু মানুষের দেখা পেয়েছি। যারা কোনো না কোনোভাবে সেই কনসার্টটির কাছাকাছি ছিলেন। কেউ প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন, কেউ ছিলেন কেবলই দর্শক; কেউবা তখন কাছাকাছি থেকে আয়োজনটির গভীরতা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন।

অধ্যাপক হায়দার আলী খান ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের কোনো এক সন্ধ্যায় নিউইয়র্কগামী বিমানে ওঠার জ্েয ঢাকা ছেড়েছিলেন। প্রথমে করাচি, এরপর লন্ডন হয়ে তিনি পৌঁছান নিউইয়র্কে। ঢাকা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হায়দার আলী জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সফল হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তরুণদের একটি সমাবেশে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। সমাবেশ শেষে যখন দেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ। ভীষণভাবে ভেঙে পড়লেন হায়দার আলী খান। স্বদেশভূমির জন্য বুকের মধ্যে তীব্র কষ্ট অনুভব করতে লাগলেন। সেবার আর ফেরা হয়নি হায়দার আলী খানের। সেই যাত্রা এতটাই দীর্ঘ হলো যে, এখনও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। থাকেন কলোরাডোর ডেনভার শহরে। বর্তমানে ডেনভার ইউনিভার্সিটির জোসেফ কর্বেল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক। মুক্তিযুদ্ধের সময়গুলো কাজে লাগিয়েছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নিয়ে তার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘ আলাপ হয়েছে। স্মৃতি হাতড়ে অধ্যাপক হায়দার আলী খান জানালেন, 'ঠিক হলো বন্ধু ফ্রাঙ্কের সঙ্গে কনসার্ট দেখতে যাব।

সেদিন জর্জ হ্যারিসন স্টেজে এলেন অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর। চুল, গোঁফ-দাড়িতে তাকে অনেকটা সন্ন্যাসীর মতো দেখাচ্ছিল। ব্যাপক সফল হয়েছিল আয়োজনটি। 'বাংলাদেশ' গানটি রীতিমতো সাড়া ফেলে দেয়।' সেই গানটি সম্পর্কে জর্জ হ্যারিসনের বক্তব্য কী ছিল? তা নিয়ে হ্যারিসনের সঙ্গে কথা বলার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছিলেন হায়দার আলী খান। তিনি বলেন, 'কনসার্টের পর হোটেলে রবিশঙ্করের ঘরে বসে কিছু কথাবার্তা বলার সুযোগ মিলেছিল। তখন জর্জ হ্যারিসনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এ রকম অকৃত্রিম সহানুভূতি তার মনে কেমন করে তৈরি হলো। তার উত্তরটি ছিল অত্যন্ত সরল। তিনি বললেন, 'দেখো, রাভি (রবিশঙ্কর) আমার বন্ধু। তার দেশের লোক নির্যাতিত হচ্ছে, মরছে, এটা আমার জন্য মাথা খাটিয়ে বোঝার ব্যাপার নয়। বন্ধুর দুঃখ যেমন সহজে হৃদয়ে অনুভব করি, সারা বাংলাদেশের দুঃখ আমি সেভাবেই অনুভব করার চেষ্টা করেছি।'

২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর, দুপুর বেলা ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের সামনে দেখা হয়েছিল অভীক দাশগুপ্তের সঙ্গে। কথা বলায় আন্তরিকতার ছাপ। বলতে শুরু করলেন তিনি, '১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে আসি। সবেমাত্র ২৩ বছর বয়স আমার। এখানে-ওখানে চাকরির জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছি। ছোটখাটো একটা কাজও পেয়ে যাই। মাইনে বেশি নয়। তবুও চলে যাচ্ছিল। সেই সময় ম্যানহাটানের থার্টি ফোর্থ স্ট্রিট আমাদের কাছে খুব প্রিয় একটি জায়গা ছিল। কেননা সেখানে মেসিজের বিরাট একটি স্টোর রয়েছে। একসময় শুনতে পেলাম বাংলাদেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। বাংলাদেশের মানুষকে আলাদা ভাবিনি কখনোই। তাদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতনের কথা শুনে মনটা খুব অস্থির হয়ে থাকত।'

হাত দিয়ে ইশারা করে অভীক দাশগুপ্ত এরপর সেই সময়ের বর্ণনা দেওয়া শুরু করলেন। 'ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের সামনের এই রাস্তাটি ধরে একদিন এগিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখলাম- ওই যে বোর্ডটা দেখছেন, সেখানে জর্জ হ্যারিসনের ছবি। কাছে গিয়ে দেখলাম একটি কনসার্ট হবে। লেখা রয়েছে 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'। মনটা কেমন করে উঠল। একটা মহৎ উদ্দেশ্যে জর্জ হ্যারিসন কনসার্ট করবেন। সঙ্গে ভারতীয় কিংবদন্তি রবিশঙ্কর। কী যে ভালো লাগল। সিদ্ধান্ত নিলাম সবচেয়ে কম দামের টিকিট কেটে হলেও এই কনসার্ট দেখতে যাব। ভেতরে টিকিট কাউন্টার রয়েছে। সেখান থেকে একটি টিকিট কাটতেও পারলাম। যখন ভেতরে গেলাম আমি রীতিমতো অভিভূত। এত বড় ও সুন্দর হলে আমি তো জীবনে আসিনি। আমি গিয়েছিলাম দুপুরের শোতে। ভেতরে তখন দারুণ একটি পরিবেশ। অসংখ্য লোক। সবাই এসেছেন প্রিয় তারকাদের দেখতে। তাদের গান শুনতে। পুরো হল ভরা ছিল। সেই সঙ্গে একটা ভালো উদ্দেশ্যও রয়েছে। ভালো লাগায় মন ভরে গেল। চোখে জল চলে এলো।'

কাজী সাহিদ হাসান বললেন, 'সবকিছু যেন চোখের সামনে এখনও ভাসছে।' একাত্তরে বাংলাদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র। খবর পেলেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশের সাহায্যার্থে একটি কনসার্ট হবে। দিনক্ষণ ঠিক রেখে বোস্টন থেকে বাসে চেপে রওনা হয়ে গেলেন। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের সামনে এসে বুঝতে পারলেন কনসার্ট দেখার জন্য যতটা অর্থ থাকা দরকার সেটা নেই। সেই দিনের কথা স্মরণ করে কাজী হাসান বলছিলেন, 'পরিস্কার মনে আছে অসংখ্য লোকজন চারপাশে। গেটের একজনকে বললাম, আমার কাছে টিকিট কেনার মতো প্রয়োজনীয় ডলার নেই। তবে আমি বাংলাদেশের মানুষ। এ কথা শুনে লোকটা ধমকের সুরেই যেন বললেন, 'গেট ইন' অর্থাৎ ভেতরে যাও। কেউ কেউ বললেন, কনসার্ট তো তোমাদের জন্যই। তখনকার ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন অন্যরকম ছিল। মানুষকে জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না, এমন অবস্থা। আমার মতো অনেক বাংলাদেশিই নিশ্চয়ই তখন কনসার্ট দেখতে এসেছিলেন। আমি স্টুডেন্ট, বোস্টন থেকে এসেছি। তেমন কারও সঙ্গে দেখাও হয়নি। তবে গোটা আয়োজনে আমি ছিলাম বিমোহিত। তার যে প্রভাব হয়েছিল, এক কথায় বিরাট।

মন্তব্য করুন