১৯৭১ সাল। একটি স্বাধীন দেশের মানচিত্রের জন্য পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে চলছে বাংলাদেশের মানুষদের এক অসম লড়াই। পাকিস্তানি হায়েনাদের বর্বরতার শিকার হয়ে মরছে লাখো মানুষ। সেই সময়ে সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরের রাষ্ট্র আমেরিকায় লাখো শ্রোতাপ্রিয় কিছু শিল্পী স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য হাতে তুলে নিলেন গিটার, সেতার। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষের জন্য তারা আয়োজন করলেন 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' নামক একটি চ্যারিটি কনসার্টের। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত সেই কনসার্টের ৫০ বছর পূরণ হবে আগামীকাল। মহাকাব্যিক সেই আয়োজন নিয়ে লিখেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন

রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলা, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া আর অসীম সাহসিকতায় শত্রুর মোকাবিলা করা মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাধারণ একেকটি অধ্যায়। সেই সঙ্গে ছিল দেশের জন্য অকাতরে জীবনদান; অগণন নারীর সল্ফ্ভ্রম হারানো। সম্মুখযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছে জাগরণের গান। যুদ্ধক্ষেত্রে তখন বাজছিল 'তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে'-এর মতো শিহরণ জাগানো গানগুলো। ঠিক তেমনিভাবে একাত্তরের আগস্ট মাসের একটি দিনে হাজার মাইল দূরে আর সাত সাগর তেরো নদীর পাড়ে বাংলাদেশের জন্য সুরের ঝঙ্কার তুলেছিলেন মানবতাবাদী বিশ্বসেরা একদল শিল্পী, যা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে। তৈরি হয়েছিল ভিন্ন এক ইতিহাস।

একটি দেশের জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের গায়কদের একত্রে এমন গান করার ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল গত শতাব্দীতে। ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেই আয়োজনটির নামই দেওয়া হয়েছিল 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'। সেই কনসার্টের ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল নিউইয়র্কের 'ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন'কে। সেখানে গান গাওয়ার উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছিলেন সারাবিশ্বের সংগীত জগতের সুপারস্টার অনেকে। যাদের তখন 'সুপার গ্রুপ' নামে অভিহিত করা হয়েছিল। সেই আয়োজনে দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিও ছিল ইতিহাস গড়ার মতোই।

যে দেশটির সরকার ছিল আগ্রাসী পাকিস্তানিদের সমর্থক; সেই আমেরিকার মাটিতেই আয়োজিত হয়েছিল গানের সেই মহাআয়োজন। সেই দেশের মানুষই টিকিট কেটে সমবেত হয়েছিলেন দর্শক সারিতে। জড়ো হয়েছিলেন ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ। সংগীত পরিবেশন করেন আমেরিকানসহ বিশ্বের খ্যাতিমান শিল্পীরা। সেই কনসার্টের মাধ্যমে মানবসভ্যতায় গৃহীত হয়েছে নতুন শব্দজোড়া 'বেনিফিট কনসার্ট'। এটিই ছিল আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে বড় আকারের প্রথম বেনিফিট কনসার্ট। এরপরই বড় কোনো উপলক্ষকে সামনে রেখে কনসার্ট আয়োজনের ধারণাটির সূত্রপাত হয়। সেই পথ দেখিয়েছে 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'।

কিন্তু কী ছিল, সেই আয়োজনের প্রেক্ষাপট! তখন বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা আর মানবতার বিপর্যয় দেখে, অনেকের মতো কেঁদে উঠেছিল এক মানবতাবাদী মানুষের হৃদয়। তিনি পণ্ডিত রবিশঙ্কর। ভারতীয় এই বাঙালি সেতারবাদকের তখন জগৎজোড়া খ্যাতি। তিনি তখন বাংলার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তার বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে কথা বলেন। শরণার্থী মানুষগুলোকে সহায়তা করতে, একটি কনসার্ট আয়োজনের পরিকল্পনা করেন। সেই প্রস্তাবে সাড়া দিতে খুব বেশি সময় নেননি জর্জ হ্যারিসন।

পরবর্তীকালে জর্জ হ্যারিসন একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল রবিশঙ্করের পরিকল্পনা। সে কিছু একটা করতে চেয়েছিল। আমার সঙ্গে কথা বলে সে তার উদ্বেগের কথা জানায়। জানতে চায়, আমার কোনো পরামর্শ আছে কি না। এরপর আমরা শো করার বিষয়টি নিয়ে অর্ধেক রাত পর্যন্ত কথা বলি। তারপরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি অনুষ্ঠানটি করব। তখন অনেককে একত্র করার চেষ্টা করি। আমাকে কিছু জিনিস সংগঠিত করতে হয়েছিল; তার মধ্যে ছিল ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন। আসলে এটাই। পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সফলভাবে এর বাস্তবায়ন পর্যন্ত এই পুরো আয়োজনটি সম্পন্ন করতে মাত্র চার সপ্তাহ সময় লেগেছিল।'

জর্জ হ্যারিসন ছিলেন বিশ্বে সাড়া জাগানো ব্যান্ড দল দ্য বিটলসের লিড গিটারিস্ট এবং ভোকাল। যখন কনসার্টের আয়োজন চলছিল, তারও দুই বছর আগে ১৯৬৯ সালে দ্য বিটলস ভেঙে গেছে। এ যেন একটি ব্যান্ড দল ভেঙে যাওয়া নয়, বিশ্বব্যাপী কোটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া।

সেই সময় জর্জ হ্যারিসন তার অন্য বন্ধুদের নিউইয়র্কের জগদ্বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ' দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'-এ অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। তার সাবেক দল দ্য বিটলসের সদস্যদেরও তিনি অংশ নিতে অনুরোধ করেন। পল ম্যাকার্টনি যোগ দিতে চাননি। জন লেনন বলেছিলেন যোগ দেবেন। স্ত্রীর সঙ্গে মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়ে ওঠেনি তারও। শেষ পর্যন্ত বিটলস ব্যান্ডের কেবল রিঙ্গো স্টার যোগ দেন ঐতিহাসিক সেই কনসার্টে।

তবে এখানেই থেমে থাকেননি জর্জ হ্যারিসন। অন্যদেরও আহ্বান জানান। তাতে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রিস্টন, লিয়ন রাসেল। ব্যান্ডদল ব্যাড ফিঙ্গারসহ যোগ দিয়েছিলেন আরও অনেকে। দ্য বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর এটিই ছিল হ্যারিসনের সরাসরি অংশগ্রহণ করা প্রথম কোনো অনুষ্ঠান। এরিক ক্ল্যাপটনও এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ মাস পর কোনো সরাসরি অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন। ১৯৬৯ সালের পর বব ডিলান প্রথমবারের মতো শ্রোতা-দর্শকদের সামনে এলেন। রবিশঙ্করের সঙ্গে উপমহাদেশের কিংবদন্তি সরোদবাদক আলি আকবর খানও ছিলেন অগ্রভাগে। তবলায় ছিলেন আল্লা রাখা আর তানপুরায় কমলা চক্রবর্তী।

সেদিনের জগদ্বিখ্যাত তারকাদের অংশগ্রহণে কনসার্টটির প্রভাব ছিল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে সেই কনসার্টের প্রতিক্রিয়া হয়েছে অনেক। যাতে করে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ জেনেছিলেন বাংলাদেশের নাম। গোটা বিশ্ব সেদিন আরও ভালো করে জেনেছিল, পাকিস্তানি হায়েনারা কী তাণ্ডবই না চালাচ্ছে বাংলার সবুজ জমিনে। মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে, মনে দাগ কেটেছে সেই আয়োজন।

পরবর্তীকালে পণ্ডিত রবিশঙ্কর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ''আমার মতে সেদিন একটা ম্যাজিকের মতো ব্যাপার ঘটেছিল। মাত্র এক রাতের মধ্যে সারা পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের নাম জেনে যায়। আমি কখনও ভাবতে পারিনি এটা এত বড় একটা অনুষ্ঠান হবে। আমি গর্বিত যে, আমি এর অংশ হতে পেরেছিলাম এবং জর্জকে আবারও ধন্যবাদ। কারণ তাকে ছাড়া 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' কখনও সম্ভব হতো না।"

দুটি বেনিফিট কনসার্ট ও অন্যান্য অনুষঙ্গ থেকে পাওয়া অর্থ প্রায় আড়াই লাখ ডলার ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থীদের সাহায্যার্থে ব্যবহূত হয়েছিল। প্রকাশিত হয় কনসার্টের লাইভ অ্যালবাম; যা রীতিমতো বিক্রির রেকর্ড গড়ে। একটি বক্স থ্রি রেকর্ড সেট এবং অ্যাপল ফিল্মসের তথ্যচিত্র ১৯৭২ সালে চলচ্চিত্র আকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৭৩ সালে যা বেস্ট অ্যালবাম হিসেবে জিতে নেয় গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড। ২০০৫ সালে 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' নিয়ে ডিভিডির একটি বিশেষ সংকলন ছাড়া হয়। এতে ছিল দুটি ডেস্ক। যার প্রথমটিতে ছিল কনসার্টের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্রটি। দ্বিতীয় ডিস্কে ছিল ২০০৫ সালে ধারণকৃত 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ রিভিজিটেড উইথ জর্জ হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস' নামের একটি তথ্যচিত্র।

মন্তব্য করুন