প্রকৃতিতে যখন শরৎকাল আসে, তখন কাশফুলই জানিয়ে দেয় এর আগমনী বার্তা। কাশফুল নরম এবং রং ধবধবে সাদা। মৃদু বাতাসে যখন পালকের মতো সাদা কাশফুলগুলো দোল খায়, তখন মন ভরে ওঠে। এ যেন বিছিয়ে আছে সাদা ফুলের চাদর। নীল আকাশের নিচে সাদা কাশফুল যখন বাতাসে দুলতে থাকে, তখন মনে হয় শ্বেতবসনা একঝাঁক শিল্পী নৃত্য করছে। নদীর তীর ঘেঁষে ফুটে থাকা কাশফুল দেখলেই মন চায় একটু ছুঁয়ে দেখি- দু'হাত ছড়িয়ে দিয়ে দৌঁড়ে ছুটে যাই কাশবনে। কাশফুলের অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রেমিকযুগল হাতে হাত রেখে হেঁটে বেড়ান কাশফুলের মাঝ দিয়ে। কাশবনে শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিও চোখে পড়ে। কাশফুল আমাদের শিখিয়েছে কোমলতা ও সরলতা। পৃথিবীর কোনো দেশে সম্ভবত ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের এমন কদর নেই। কিন্তু ঘাসজাতীয় কাশফুল বাংলাদেশের মানুষের মন জয় করে নিয়েছে সহজেই। প্রকৃতির শত শত প্রেমীর কাছে কাশফুল ব্যাপক জনপ্রিয়।

কাশ এক ধরনের বহুবর্ষজীবী ছন বা ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। আদিবাস রোমানিয়ায়। উচ্চতায় সাধারণত ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা। একেকটি কাশফুলের মঞ্জুরি দণ্ড ১৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর পাতা রুক্ষ ও সোজা; চিকন পাতার দু'পাশ খুবই ধারালো। সাধারণত নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল, শুকনো রুক্ষ এলাকা, পাহাড় কিংবা গ্রামের কোনো উঁচু জায়গায় কাশবন বেড়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকাতেই কাশফুল দেখতে পাওয়া গেলেও নদীর তীরে এদের বেশি জন্মাতে দেখা যায়। কারণ, নদীর তীরে থাকা পলিমাটি কাশের মূল সহজেই বিস্তার ঘটায়। কাশফুলের বেশকিছু ঔষধি গুণ রয়েছে। কাশফুল বেটে চন্দনের মতো নিয়মিত শরীরে মাখলে দুর্গন্ধ দূর হয়। পিত্তথলিতে পাথর হলে নিয়মিত এ গাছের মূলসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে ওষুধ তৈরি করে পান করলে উপকার পাওয়া যায়। কাশের মূল ফোঁড়ার ব্যথা উপশম করে। অর্থনৈতিকভাবেও কাশের গুরুত্ব রয়েছে। কাশ দিয়ে ঝাড়ূ তৈরি করা যায়। ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও চরাঞ্চলের চাষিরা বাণিজ্যিকভাবে কাশফুল চাষ করত। এখন কাশফুল বিলীনের পথে। শুধু নদনদীর তীরে কাশফুল দেখা যায়।

সাহিত্যে কাশফুলের কথা বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার 'শাপমোচন' নৃত্যনাট্যে বলেছেন, 'কাশফুল মনের কালিমা দূর করে। ভয় দূর করে শান্তির বার্তা বয়ে আনে। শুভ কাজে কাশফুলের পাতা এবং ফুল ব্যবহার করা হয়।' কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় বলেছেন, 'কাশফুল মনে শিহরণ জাগায়। মন বলে- কত সুন্দর প্রকৃতি, স্রষ্টার কী অপার সৃষ্টি!' কবি জীবনানন্দ দাশ শরৎ বন্দনায় লিখেছেন, 'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।' গ্রামবাংলার অপরূপ শোভা কাশবন এক চিরচেনা দৃশ্য। ঢাকার আশপাশে দিয়াবাড়ী, আফতাবনগর, কালিগঙ্গা নদী, ধলেশ্বরী নদী, মায়াদ্বীপ (মেঘনা), পদ্মা নদী, যমুনার চর, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এসব জায়গায় এখনও প্রচুর কাশবনের দেখা মেলে। মৃদু বাতাসে যখন পালকের মতো সাদা কাশফুলগুলো দোল খায়, তখন মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। প্রকৃতিপ্রেমীরা মিশে যায় কাশফুলের অভয়ারণ্যে। া

মন্তব্য করুন