'টিম ব্যর্থ' এমন নেতিবাচক একটি নামকরণ নিয়ে প্রশ্ন জাগতে পারে যে কারও মনেই। এত এত নামের ভিড়ে কেন এই শব্দ? 'এই নামকরণের পেছনে উদ্দেশ্যটাই ছিল এমন সব গল্প ফুটিয়ে তোলা, যেখানে জীবনে ব্যর্থতাই অনুপ্রেরণা দিয়ে সফলতার শিখরে পৌঁছে দিয়েছে'- আমাদের জানালেন মুরশিদুল। মুরশিদুল আলম 'টিম ব্যর্থ'র প্রতিষ্ঠাতা এবং কাজ করছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে। মুরশিদুলের ভাষায়, 'টিম ব্যর্থর নামকরণের পেছনে মূল কারণ- ব্যর্থতাই প্রকৃতপক্ষে জীবনে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অর্জনের সুযোগ করে দেয় এবং এই শিক্ষা পরবর্তী সময়ে আমাদের চলার পথে সাহায্য করে।' কী করে এই প্রতিষ্ঠান? সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনের শিক্ষা ও গল্পগুলো সংগ্রহ করে শিল্প, শিক্ষা এবং ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে তুলে ধরে টিম ব্যর্থ। ২০১৬ সালে নবম শ্রেণিতে পড়াকালে মুরশিদুল, রেদোয়ানুল এবং ফাইয়াজের হাত ধরে গড়ে ওঠা 'টিম ব্যর্থ'র পথচলার বছর পাঁচেক না পেরুতেই যেন রাঙিয়ে তুলেছে নিজেদের অর্জনের ঝুলি। আন্তর্জাতিক মহলে ইতোমধ্যে পেয়েছে 'সফল সংগঠন'-এর তকমা। বিশ্বের প্রায় ৭৫টিরও বেশি দেশজুড়ে কাজ করে যাওয়া এই সংগঠন ইতোমধ্যে জীবনের নানা শিক্ষণীয় গল্প পৌঁছে দিয়েছে ২.৫ লাখেরও বেশি মানুষের কাছে। তুলে ধরেছে জীবনের গল্প, সুযোগ করে দিয়েছে এসব হার না মানা গল্প থেকে শিক্ষা অর্জনের। শুধু তাই নয়, এসব গল্প তুলে ধরে মানুষের নানা সমস্যা সমাধানের পথও দেখাচ্ছে তারা। অডিও মাধ্যমে প্রচারিত 'ব্যর্থদলের ক্যারাভান', চিত্রণ ও সৃজনশীল লেখনী ব্যবহার করে প্রকাশিত 'হিউম্যান হিরোজ', সমাজের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের গল্প তুলে ধরতে 'প্রজেক্ট আনফার্ল', 'চিত্রগল্প' টিম ব্যর্থের কিছু প্রকল্পের নাম, যেখানে এই তরুণরা আপনগতিতে ছুটছে জীবনের প্রজ্ঞাময় গল্পগুলো হাজির করতে। এ বছরের শুরুর দিকে 'ফুয়েলিং হোপ' নামে একটি বইও প্রকাশ করে এই প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া আছে ভার্চুয়াল লাইভ সিরিজ 'ইচি-গো-ইচি-এ'। এর দ্বারা জনসচেতনতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রকাশ পাচ্ছে। অনুষ্ঠানটিতে সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিশেষজ্ঞ স্ব-গ্রহণযোগ্যতা, মানসিক আঘাত হতে উত্তরণ এবং নতুন করে পথচলা, সুন্দর জীবনের জন্য যোগব্যায়াম প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এত কাজের ভিড়ে কাজ করার শক্তিটা আসে কীভাবে? সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রেদোয়ানুল স্মরণ করলেন নিজের বিদ্যালয়ের স্কাউট শিক্ষক 'মো. হেলাল উদ্দিন'-এর নাম। পূর্ণোদ্যম নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার জন্য উৎসাহ যে তিনিই দিয়ে যাচ্ছেন! সবার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে জ্ঞানের প্রস্ম্ফুটন এবং একটি শান্তিপূর্ণ ঐক্যবদ্ধ সমাজ তৈরি করাই যেন এই দলের প্রধান উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ফাহমিনা ফয়েজ সেমন্তী মনে করেন, 'দেশ-বিদেশের অসংখ্য প্রাণবন্ত ও প্রাজ্ঞ মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তার নিজের সুপ্ত সম্ভাবনা খুঁজতে সাহায্য করার পাশাপাশি উদ্দীপ্ত করেছে তার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রকে।'

টিম ব্যর্থের এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ মিলেছে বিভিন্ন পুরস্কার। সংখ্যা যেন সোয়াশর কাছে। সম্প্রতি ২০২১-এ 'ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড' প্রাপ্তিই জানান দেয় নিজেদের কাজে ঠিক কতটা সফল হতে পেরেছে এই তরুণরা। এ ছাড়া আছে ইউনিসেফ সার্টিফিকেট ফর রাইটস অব মেরিট এডুকেশন ২০২০, ইউনিসেফ মিনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড, ব্লাস্ট শর্ট ফিল্ম ২০১৯ পুরস্কার, ডিসকভারি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের (ইউএসএ) বেস্ট ফরেন চলচ্চিত্র পুরস্কার। 'টিম ব্যর্থ' প্রতিনিয়ত তুলে আনছে সাহসী মানুষদেরই প্রতিচ্ছবি, যেগুলো বিশ্বের সামনে তুলে ধরে তাদের পরিচয়, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও অনুশোচনা। দলটির স্বপ্ন উদ্যোগগুলো ছড়িয়ে যাক এশিয়া বা আফ্রিকার গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার বড় শহরগুলোর কোনায় কোনায়। সঙ্গে একটা সুন্দর সর্বজনীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন তো আছেই।

মন্তব্য করুন