কেউ বলে লোক দেখানো, কেউ বলে মাথায় সমস্যা, আবার কেউ পিঠে হাত দিয়ে উৎসাহ দ্বিগুণ করেন। লোকে তো কত কিছুই বলে, তাই বলে কি কোনো ভালো উদ্যোগ থেমে থাকে। তেমনি থেমে থাকেনি 'টেন বুকস লাইব্রেরি'র যাত্রা।

জামালপুরের পোগলদিঘা ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী হাসান নাহিদ। প্রত্যন্ত গ্রামের চায়ের দোকান, স্যালুন, ফার্মেসি, চৌরাস্তার মোড়, রেলস্টেশন, বাজারের শুরুতে অথবা শেষে যেখানে জনসমাগম, সেখানেই একটি বাক্সে ১০টি বই তুলে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এক লাইব্রেরি। যার নাম 'টেন বুকস লাইব্রেরি' আর তার স্লোগান 'অবসরে পড়ি বই, জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হই'।

হাসান নাহিদের বই পড়ার অভ্যাস তখন ছিল না। ভাই আর বাবাকে দেখতেন বইয়ের পাতায় মুখ গুজে থাকতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত, কখনও তাদের মুখে হাসি ফুটে উঠত আবার কখনও রাগ-ক্ষোভ। নাহিদ ভাবতেন, বইয়ে এমন কী মুগ্ধতা আছে যে, সব ছেড়ে বইয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করেন তারা। মুগ্ধতা খুঁজতে গিয়ে তিনিও বই খোলেন; তারপর একে একে অনেক বই পড়া হয়ে গেছে। বইয়ের পাতায় মিশেছে প্রাণ।

বইপ্রেমী এক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলেই বইয়ের নানা চরিত্র, লেখার রূপ-রস, ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা হতো। এই সেই ভাই, যার প্রেরণায় নাহিদ বইকে ভালোবাসতে শিখেছে। তার সঙ্গে লাইব্রেরি করার প্রাথমিক আলোচনা শেষ হলো। বইয়ের কাছে পাঠক নয়, পাঠকের কাছে বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নিজের ১০টি বই দিয়ে আর সেই ভাইয়ের টাকায় একটা ছোট বাক্স তৈরি করে ফেললেন। এ ধরনের আইডিয়া নাহিদ পেয়েছেন ইন্টারনেট দেখে।

প্রথমে ভেবেছিলেন মানুষ হয়তো বইয়ের বাক্স বসাতে দেবে না। দিলেও বই থাকবে না। একটা-দুইটা করতে পারলেও আর হবে না। কিন্তু এমন হয়নি, লাইব্রেরি করার উদ্যোগ সবাইকে জানানোর পর এগিয়ে এসেছেন অনেকে। কেউ বাক্স তৈরি করে দিয়েছেন, আবার কেউ দিচ্ছেন বই। 'টেন বুকস লাইব্রেরি'র এখন সরিষাবাড়ীতে ১০টি শাখা, যার প্রতিটিতে বিভিন্ন ধরনের ১০টি বই রয়েছে। আর পাঠক সংখ্যাও কম নয়, তারাও নাহিদের সঙ্গে কাজ করেন। অল্প বই দেখে অনেক আগ্রহ নিয়ে পড়েন। এখন তারা নিয়মিত পাঠক। এক লাইব্রেরির বই মাসের নির্দিষ্ট সময়ে অন্য লাইব্রেরিতে তুলে দেন; যাতে সবাই সব বই পড়তে পারেন। এত কাজের পরও অনেকের নেতিবাচক মন্তব্য প্রায়ই পেয়ে থাকেন হাসান নাহিদ। উত্তরে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। এই যেমন নেতিবাচক মন্তব্য করা একজনকে বলেছেন, আপনি আমার ৫০তম লাইব্রেরি নিজ হাতে উদ্বোধন করবেন। আসবেন তো?

বেশি বই দেখলে মানুষের আগ্রহ থাকে না। অল্প বই দেখলে ভাবে, একটা পড়ে দেখি তারপর নিয়মিত পাঠক হয়ে যায়। এ জন্যই ছোট ছোট লাইব্রেরি করার পরিকল্পনা ছিল। মানুষ চাইলে অনেক কিছুর পরিবর্তন করা সম্ভব। এ জন্য উপযুক্ত শিক্ষা মানুষের থাকা প্রয়োজন আর ভালোবাসা থাকা প্রয়োজন নিজ সংস্কৃতির প্রতি। মোবাইলে মুখ লুকিয়ে অন্ধকারে না গিয়ে বইয়ের আলোয় আলোকিত এক তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন দেখেন হাসান নাহিদ। তিনি মনে করেন, সবাই এগিয়ে এলে আবার সেই বইপাগল প্রজন্ম ফিরে আসবে। া

মন্তব্য করুন