মঞ্চের বাইরে

মঞ্চের বাইরে

বাজেটে নারী

প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে কি?

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৪

২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় অর্থমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, 'আমরা বিশ্বাস করি যে, দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, পশ্চাৎপদ গোষ্ঠী_ অর্থাৎ নারীদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এবারও নারী উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ থাকবে।' প্রশ্ন হচ্ছে, এই নির্দিষ্ট পরিমাণ অঙ্কই কী নারী উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট বরাদ্দ! তাছাড়া এই বরাদ্দকৃত অর্থ নারীর উন্নয়নে কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সে বিষয়টি সুস্পষ্ট নয়। ফলে অস্বচ্ছতা এবং অস্পষ্টতার বেড়াজালে আটকে থাকছে নারীর সত্যিকার উন্নয়ন চিত্র। প্রস্তাবিত বাজেট কতটা নারীবান্ধব হয়েছে, নারীবান্ধব বাজেটের জন্য আরও কী কী করা প্রয়োজন সে বিষয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে মন্তব্যমূলক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আ হ ম ফয়সল

উন্নয়নে স্বচ্ছতা জরুরি
প্রফেসর হান্নানা বেগম, অর্থনীতিবিদ
২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় অর্থমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, 'আমরা বিশ্বার করি যে, দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, পশ্চাৎপদ গোষ্ঠী_ অর্থাৎ নারীদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বাজেটে অর্থমন্ত্রীর এই সদিচ্ছাকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, গত বছরের উন্নয়ন বাজেটে নারীর জন্য খাতওয়ারি যে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল তার বাস্তবায়ন চিত্র আমরা জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৪-১৫তে পাইনি। ফলে গত বাজেটে নারীর জন্য বরাদ্দ অর্থ কতখানি কার্যকর হয়েছে, তার চিত্র জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে নেই। এটি উন্নয়নের স্বচ্ছতার বিষয়। জনগণ বরাদ্দ যেমন দেখতে চায়, একই সঙ্গে বাজেটের বাস্তবায়নচিত্রও দেখতে চায়। স্বচ্ছতা বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান হাতিয়ার।
বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রে নারীর অন্তর্ভুক্তির জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা জানি না, সরকারের বরাদ্দকৃত এই অর্থ কোন স্তরের নারীরা ভোগ করছেন। আমাদের আশঙ্কা, এর একটি বড় অংশ উদ্যোক্তার স্বামী ব্যবহার করেন। অতএব, এ বিষয়ে সাম্প্রতিক তথ্য ও গবেষণার জন্য বার্ষিক বরাদ্দ রাখা দরকার। এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষায় ছাত্রীদের ভর্তির হার দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সরকারি মাদ্রাসায় নারী শিক্ষক নেই। এসব শিক্ষার্থী মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে কী ধরনের বৃত্তিমূলক কাজে অংশগ্রহণ করছে, এ বিষয়ে গবেষণার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা দরকার। উন্নয়ন বাজেটে নারীর জন্য উৎসাহব্যঞ্জক বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু বরাদ্দকৃত অর্থ খাতওয়ারি যথাযথ ব্যয় হচ্ছে কি-না এবং নারীর জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে সে বিষয়ে মনিটরিং প্রক্রিয়া চালু ও গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা দরকার।
স্থানীয় নারী প্রতিনিধিদের জন্য বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি আমরা বেশ কয়েক বছর ধরে উপলব্ধি করছি। এ বরাদ্দ এখনও আসেনি।
নারীর হিস্যা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া যায়। বাজেটে এ জন্য বরাদ্দ থাকা দরকার।
টেকসই উন্নয়নের প্রথম হাতিয়ার জনগণের জেন্ডার সংবেদনশীল মন-মানসিকতা। আমাদের আইন ফেল করছে, নারী যথাযথ বিচার পাচ্ছে না, শিক্ষক জেন্ডার সংবেদনশীল পাঠদানে বিরত থাকছেন। তার প্রধান কারণ জেন্ডার অসংবেদনশীল মানসিকতা। আর এর পরিবর্তনের প্রয়োজন কারিকুলামবিদ, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, বিচারক, সর্বস্তরের পরিচালকদের জেন্ডার সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ এবং তার জন্য অর্থ বরাদ্দ। আমাদের বাজেটকে আমরা এক্ষেত্রে কার্যকরী দেখতে চাই।
জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট তৈরি করতে হলে নারীর অ-আর্থিক (গৃহকর্ম) কাজের মূল্যায়ন করাটা অত্যন্ত জরুরি, কেননা অর্থনীতিতে নারীর অবদান সঠিকভাবে জানা থাকলেই কেবল নারীর জন্য সঠিক বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব। স্বাস্থ্য এখনকার দিনে নারীর জন্য শুধু প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নয়, বৃত্তিমূলক সাধারণ স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে অধিকতর হারে নারীর মৃত্যুর বড় কারণ বাল্যমাতৃত্ব। এটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ঘরে ঘরে নিরাপদ প্রসব সুবিধা পেঁৗছে দেওয়ার জন্য বাজেটে ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
সরকার বাজেটের ক্ষেত্রে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো অনুসরণ করছে। এটির ভালো দিক হচ্ছে বাজেট বরাদ্দের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দেখাতে হয় এই বাজেট বরাদ্দ অনুমোদিত হলে নারীসমাজ কী কী ভাবে উপকৃত হবে। এটি জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়নের উৎকৃষ্ট পন্থা। আমরা এ বাজেট কাঠামোর যথাযথা বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করি।

বাস্তবায়ন মূল কথা
আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী, সংসদ সদস্য
বর্তমান সরকার ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রণয়ন করেছে তা নারীর ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণয়ন করেছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে নারীর নেতৃত্ব তুলে আনা ও নারীকে ক্ষমতায়িত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের বাজেট বাস্তবসম্মত। এতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়বে। এবার ঘোষিত বাজেট নারী উন্নয়নে কার্যকরভাবে অবদান রাখবে। বর্তমান সরকার যে বাজেট ঘোষণা করছে তা সাধারণ মানুষের চিন্তা চেতনারই ফসল।
ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের নারীদের ৩০ ভাগ সম্পৃক্ত করে কাজ করার যে উদ্যোগ সরকার শুরু করেছে তা সত্যিকার অর্থেই প্রশংসনীয়। বাজেটে হিজড়া, প্রতিবন্ধী, আদিবাসীসহ কিছু বিশেষ শ্রেণীর জন্য যে ধরনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে তা তাদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করবে।
পাশাপাশি বাজেট নারীবান্ধব হলেও শহরের কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার নির্মাণের জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন ছিল। আমরা আশা করব, বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার এ বিষয়গুলো আরও বেশি নজরে আনবে। পাশাপাশি আমরা এও আশা করতে পারি, সাধারণ মানুষের মতের কথা, চাহিদার কথা, ভাবনার কথা এ সরকারই বাস্তবায়ন করবে। দেশে নারীদের বড় একটি অংশ পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত। বর্তমান সরকার তাদের বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নের পদক্ষেপ নিয়েছে। উন্নয়নের জন্য শুধু শহরে নয়, দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় যেসব নারীরা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের সুষম খাদ্য ও সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
আমাদের দেশে অনেক আদিবাসী আছে, যারা বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করে। বাজারে তাদের এসব পণ্যের বেশ চাহিদাও রয়েছে। সরকার তাদের পণ্য বাজারজাতকরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া বাজেটে নারীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো সামাজিক নিরাপত্তা খাত। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় এ খাতকে গুরুত্ব দিলেও নারীদের বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নের গুরুত্ব দিতে হবে।