মঞ্চের বাইরে

মঞ্চের বাইরে

অপুষ্টি অনেক বড় সমস্যা

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৪

এমআর পাটোয়ারী

অপুষ্টি অনেক বড় সমস্যা

ছবি :আয়াতুল আমিন শাওন

দেশে সামগ্রিকভাবে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ ও মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতিতে ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। তবে পুষ্টি পরিস্থিতির তেমন একটা উন্নতি ঘটেনি।
বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মতে, তীব্র অপুষ্টির কারণে দেশে প্রতি বছর ৬৫ হাজার শিশু মারা যায়। বর্তমানে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫ লাখ শিশু অপুষ্টিজনিত নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত। তারা মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব শিশুর চিকিৎসাসেবার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই।
স্বীকৃত যে, বরিশালসহ উপকূলীয় এলাকায় অপুষ্টির প্রকোপ সর্বাধিক। তবে দেশের উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে পঞ্চগড় জেলায় অপুষ্টির শিকার শিশুর সংখ্যা কম নয়। এখানকার শিশুরা অপুষ্টিজনিত নানা রোগব্যধিতে আক্রান্ত। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার তেমন একটা ব্যবস্থা নেই।
রাজধানী ঢাকায় হাতেগোনা কয়েকটি হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও এসব শিশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। তাই দেশের অন্যত্র শিশুর অপুষ্টিজনিত রোগব্যধির চিকিৎসা সীমিত হওয়াই স্বাভাবিক।
তাছাড়া পুষ্টি নিয়ে তেমন কর্মসূচিও নেই। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে কোনো কাজ করছে না। তেঁতুলিয়া উপজেলায় ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, শিশু ও মায়েদের ভিড়। তারা অনেকেই অপুষ্টির শিকার। উপজেলার কোম্পানিজোতে কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী ফ্লোরেন্স হেলেন জানান, শিশুদের জিঙ্ক জাতীয় ট্যাবলেট দেওয়া হয়। এখানে পুষ্টি নিয়ে তেমন কোনো কাজ হয় না। মায়েদের রক্তশূন্যতা দেখা দিলে আয়রন ট্যাবলেট দেওয়া হয়। শিশুদের কৃমিনাশক ওষুধ দেওয়া হয়। কৃমির কারণেও পুষ্টির অভাব দেখা দেয়।
জাপানের আজিমটো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহায়তায় 'আজিমটো পুষ্টি প্রকল্প' নামে কাজ করছে হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। তারা মা ও শিশুদের পুষ্টির অবস্থা বাড়ানো, পুষ্টি উন্নয়নবিষয়ক সচেতনতা ও ধারণা বৃদ্ধি, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মাধমে মারাত্মক অপুষ্টির শিকার মায়েদের পুষ্টি অবস্থার উন্নয়ন, দরিদ্র মায়েদের পুষ্টি অবস্থা স্থায়ীভাবে উন্নতি করা, আয়ের সুযোগ তৈরি করা, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের বাড়িতে পুষ্টিকর রান্নার মাধ্যমে খাদ্যের পুষ্টিমান বজায় রাখার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া তারা এ প্রকল্প সফল করতে মা ও শিশুকে সপ্তাহে ৬ দিন রান্না করা খাদ্য সরবরাহ করছে।
উল্লেখ্য দেশের ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সী ৪৩ শতাংশ কিশোরী রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। তাদের বেশিরভাগই আবার অল্প বয়সে বিয়ে করে গর্ভধারণ করে। এতে গর্ভের শিশুটিও অপুষ্টির শিকার হয়। এ চালচিত্র পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের প্রত্যেকটি জেলার।
অপুষ্টি থেকে শিশুদের মুক্ত করতে না পারলে তাদের নানা রোগব্যধির শিকার হওয়াই স্বাভাবিক। স্মরণ রাখা দরকার, আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, তারা পুষ্টির অভাবে নানা রোগব্যধির শিকার হলে তা জাতির জন্য অমঙ্গল বয়ে নিয়ে আসবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টির কারণে প্রধান ৬টি রোগ হয়। রোগগুলো হলো_ হাড্ডিসার রোগ, গা ফোলা রোগ, রাতকানা রোগ, রক্তস্বল্পতা রোগ, জিহ্বা ও ঠোঁটের কোণে ঘা এবং আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যা।
পুষ্টিবিদ ডা. শাহাজাদা সেলিম জানান, আমাদের দেশের অধিকাংশ শিশু আয়রনজনিত খাবারের অভাবে অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হয়। এর প্রধান কারণ, দারিদ্র্য এবং পরিবারে পুষ্টিজ্ঞানের অভাব। জন্মের ৪ থেকে ৬ মাস পর আয়রনসমৃদ্ধ বাড়তি খাবার না খেয়ে শুধু বুকের দুধ খেলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। এ সময় শুধু মায়ের দুধে আয়রনের অভাব পূরণ হয় না। কলিজা, মাংস, মাছ, মটরশুটি, শিম, বরবটি, ডাল, বাদাম, সবুজ শাক-সবজিতে প্রচুর আয়রন থাকে। এগুলো খেলে আয়রনের অভাব সহজে পূরণ করা যায়।
উল্লেখ্য, উন্নয়নশীল দেশে এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার। শুধু অপুষ্টির কারণে প্রতি মিনিটে ১০টি শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এ তথ্যটি তুলে ধরা হয়েছিল ২০০৬ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে। জাতিসংঘের এমডিজি বা সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ২০১৫ সালের মধ্যে অপুষ্টির হাত থেকে শিশুদের রক্ষায় একটি বার্ষিক লক্ষ্যও স্থির করে দেওয়া হয়েছিল। সে লক্ষ্য অর্জনে উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের সংকল্পও ব্যক্ত করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। ২০১২ সালের ৮ আগস্ট লন্ডনে বিশ্ব পুষ্টি সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা বলেন, দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অপুষ্টি কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। এর প্রভাব বিশ্বের সর্বত্র। তাই এসব বিষয়ে বৈশ্বিক জাতীয় পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নে গোটা বিশ্বের সম্পদের ব্যবহার, অভিজ্ঞতা বিনিময়, গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রয়োগের ব্যাপারে সবাইকে অঙ্গীকারবদ্ধ কাজ করতে হবে। বাংলাদেশও এ অঙ্গীকারে শামিল।
দেশের ২৫ শতাংশ শিশু অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। তাদের ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ না নিলে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই পরিপূর্ণতা লাভ করবে না। এ কথা স্মরণ রেখেই সরকারকে পুষ্টি বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে।