মঞ্চের বাইরে

মঞ্চের বাইরে

'জীবন শেষ অই গেলেবুঝি ভিজিডি ফাইমু'

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৪

এমএ আহমদ আজাদ, নবীগঞ্জ

'আমি সংসার চালাইতে পারি না, ভাত পাই না, অন্যের বাড়ি কাজ করি অখনো কি ৩০ কেজি (ভিজিডি) চাল পাইমু না', 'জীবন শেষ অই গেলে বুঝি ভিজিডি ফাইমু'_ আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলেন চান বিবি।
নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের ছিট ফরিদপুর (নোয়াহাটি) গ্রামের বাসিন্দা মৃত দিনমজুর হেলিম উল্লার স্ত্রী বিধবা চান বিবি। পাঁচ ছেলের সংসারে তিনি এখন একা। স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক কষ্টে ছেলেদের বড় করেছেন। ছেলেরা সবাই নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত, চান বিবির জীবন চলে অন্যের সাহায্যে।
ছিট ফরিদপুর গ্রামের অসহায় গরিব সুরমা বিবি বলেন, আমি বারবার চেয়ারম্যান-মেম্বরের কাছে আকুতি করিয়াও ৩০ কেজির চালে (ভিজিডি) নাম থুলতাম ফারিনাই। 'তারা কইছন আমারে ভিজিডির চাল দিবা, কবে দিবা আল্লাহই জানে। অনেক কষ্টে দিন কাটাইতেছি।'
এমন চিত্র নবীগঞ্জ উপজেলার গ্রামে গ্রামেই। ভিজিডি বঞ্চিত অনেক নারী-পুরুষই আছেন, যারা ভিজিডি ভাতা সম্পর্কে জানেন না। কখনও আবার চেয়ারম্যান-মেম্বার নিজেদের মনোনীত ব্যক্তিদের ভিজিডি ভাতা দিয়ে থাকেন। অসহায়-দুস্থ গরিবদের এ ভাতা সঠিকভাবে প্রদান করা হচ্ছে না। সুরমা বিবির মতো অনেক অভাবী মানুষের আর্তি কেউ শোনে না।
সরেজমিনে দেবপাড়া ইউনিয়নের ভিজিডি ভাতা প্রাপ্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রতি মাসে কাগজে-কলমে ৩০ কেজি চাল দেওয়া হলেও বাস্তবে ২৫ কেজি করে পান। তবে তারা এ কর্মসূচির আওতায় এসে অত্যন্ত খুশি। নিজেদের পরিবারের এ খাদ্য সহায়তা পেয়ে অনেকেই এখন পরিবারের অন্যান্য খরচ ও সামাজিক উন্নয়ন করতে পারছেন। ফরিদপুর গ্রামের বিধবা রুহেলা বেগম বলেন, দুই ঈদে আমি ভিজিএফের চাল পাইছি, কিন্তু ভিজিডির চাল পাই নাই। তা ছাড়া সরকারি কোনো ভাতাও আমি পাই না। দেবপাড়া ইউনিয়নে মোট ১৩৪ জনকে ভিজিডি ভাতা দেওয়া হচ্ছে। প্রতি মাসে ৪ মে. টন ২০ কেজি চাল বরাদ্দ আসে। দুস্থদের খাদ্য সহায়তা প্রকল্প বা ভিজিডি একটি নিয়মিত খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি। কোনো এলাকায় দরিদ্র অসহায় অভাবগ্রস্ত পরিবারকে ভিজিডি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। গত এপ্রিল মাসে নবীগঞ্জ উপজেলা খাদ্য গুদাম থেকে ৪ হাজার ২০ কেজি ভিজিডির চাল উত্তোলন করা হয়। ভিজিডির চাল বিতরণের সময় তদারকি করেন উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা।
দেবপাড়া ইউনিয়নের সচিব আবদুস সামাদ বলেন, আমাদের প্রতি মাসে ভিজিডির চাল আনতে সরকারিভাবে কোনো গাড়ি ভাড়া দেওয়া হয় না। ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ফান্ডের টাকা দিয়ে চাল আনা হয়। আবার চাল আনতে গিয়ে খাদ্যগুদামে সংশ্লিষ্টদের টাকা না দিলে কাজ হয় না। প্রতি দুই বছর পর ভিজিডি কার্ডের তালিকা করা হয়। তালিকা করার সময় মেম্বারদের মধ্যে সামান্য ঝামেলা সৃষ্টি হয়, কে বেশি নেবে, কে কম নেবে। ভিজিটি ভাতাপ্রাপ্ত রুহেলা বেগম বলেন, আমাদের বালতি দিয়ে ৬ বালতি দেওয়া হয়। বাড়িতে এসে দেখি এখানে ২৫ কেজি চাল আছে। টিপসই নেওয়ার সময় বলা হয় ৩০ কেজি দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ইউনিয়ন সচিব বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে বালতি দিয়ে চাল দেওয়া হচ্ছে। বালতি মাপের মধ্যে কম হতে পারে। আমরা বালতির মাপ সঠিক কি-না দেখব।
ইউনিয়নের একেকটি ওয়ার্ডে পাঁচ হাজারেরও অধিক জনসংখ্যার রয়েছে। প্রত্যেক মেম্বারের ভিজিডির সর্বোচ্চ ১০টি করে কার্ড বরাদ্দ থাকে কিন্তু। তাদের এ কার্ড নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক সময় মেম্বাররা স্বজনপ্রীতি করে নিজের পরিচিত ধনী পরিবারকে কার্ড দিয়ে দেন। এতে বঞ্চিত হন হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীভুক্ত পরিবারের লোকজন।