মঞ্চের বাইরে

মঞ্চের বাইরে

টানাপড়েনের দোলাচলে

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪

সাকিলা মতিন মৃদুলা
সবকিছুুই ঠিকঠাক! স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, আদালত, হাসপাতাল, পাহাড়-পর্বত কোথায় নেই মেয়েরা। সর্বত্রই পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরা_ কাজ করছে, কাজ করাচ্ছে। নিজেরা এগিয়ে চলছে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে আর সমস্যা কী? সমস্যা হলো স্ববিরোধিতা। বাধা হলো দ্বৈতসত্তা। একদিকে সন্তান গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরাই বলছি, 'একটি হলে দুটি নয়, মেয়ে হলে ভালো হয়।' কী করে ভালো হয়? মেয়েটি কি পারবে ছেলে সন্তানের মতো করে বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করতে আজীবন? বাবা-মা কি সংকোচহীনভাবে পারবে মেয়ে সন্তানের সাহায্য নিতে? শিক্ষিত স্বামী কি পাশে থাকবে মেয়েটির জীবনযুদ্ধে? আমরাই বলছি মেয়েদের স্বাবলম্বীর কথা। আবার আমরাই নেতিবাচকভাবে সমালোচনা করছি কাজে ব্যস্ত থাকা মেয়েটির কিংবা বউটির। নিজেদের শিক্ষিত বলে দাবি করছি আর বাড়ির বউটিকে প্রতিটি মুহূর্তে অবহেলা আর অনাদরে দিচ্ছি মানসিক যন্ত্রণা। নারীর পাশে নারী_ এমনটিই হওয়ার কথা কিন্তু হচ্ছে কই? শাশুড়ি, ননদ আর ননাস হচ্ছে বউটির প্রতিদ্বন্দ্বী। আপন করে নিচ্ছে না কিন্তু আপন করে চাইছে। শ্বশুর-শাশুড়ি ছেলের সঙ্গে না থাকার কারণ হিসেবে একতরফা দোষারোপ করছেন বউটিকে। প্রগতিশীলতার কথা বলছি, কিন্তু ভাবছি মেয়ের বাবা বিয়ে দিয়ে আজীবন দায় ঠেকে থাকবেন। একদিকে শৃঙ্খল ভাঙ্গার কথা বলছি আর অন্যদিকে বলছি মেয়েদের জেদ থাকতে নেই, জেদ করতে নেই! হোক সে কারণে কিংবা অকারণে। প্রতিবাদ করার সাহস রাখতে নেই। স্পষ্টবাদী সততার মূল্যায়ন নেই। মানসিক কিংবা শারীরিক নির্যাতনে পাগলপ্রায় বাড়ির বউটিকে বলছি, 'সাইকো'! কী বিচিত্র এই দেশ! কী বিচিত্র এই মানুষ। পিছিয়ে পড়া মানুষ হিসেবে নারীর এগিয়ে আসা সমাজের তথাকথিত ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছে অনেক আগেই। মেয়েরা আজ আর আগের মতো পিছিয়ে নেই। আইন আছে। বিচার আছে। সচেতনতাও আছে। সবই আছে। তবু কী যেন নেই! নেই নিশ্চয়তা। নেই মমত্ববোধ। নেই মানবতাবোধ। নেই সহনশীলতা। নৈতিকতা আর দায়বদ্ধতাও পাশ কাটিয়ে যায় মাঝে মধ্যেই। নারীর স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্রমবিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ছন্দপতন ঘটে ।
খুব বেশি ইচ্ছাতেও দূরে কোথাও নির্জনে, নিজের জন্য নিজে! কল্পনাতেও সম্ভব নয় এমনটি। রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে যানবাহনের খোঁজে যে পরিমাণ উৎসুক দৃষ্টি প্রতিনিয়ত এড়িয়ে চলতে হয় যেখানে পার্কের বেঞ্চিতে একা একটি মেয়ে চায়ের কাপ হাতে! এও কি সম্ভব? কিন্তু কেন? মেয়েটিরও তো একটি জীবন আছে, আছে স্বপ্ন, আছে হরেক রকম ইচ্ছা। তারও তো ইচ্ছা হয় খোলা আকাশে ইচ্ছার ঘুড়িগুলোকে উড়িয়ে দিতে। এক পশলা বৃষ্টি আর হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ায় নিজেকে মিশিয়ে দিতে। সে পারে না, অনেক কিছুই তার না পারার পৃথিবীটা বৃহৎ থেকে বৃহত্তর করে ফেলে। জানালার গ্রিল ধরে ঝমঝম বৃষ্টিতে পাড়ার ছেলেগুলোর ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠার আনন্দ দেখে আনন্দিত হওয়ার মাঝেই তার সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতা সংকুচিত হয়ে শুকিয়ে ঝরে যায় বখাটেদের অত্যাচার, ভালোবাসার নির্মমতায়। বেঁচে থাকার সব দুয়ার বন্ধ ভেবে অভিমানী মেয়েটি জীবনের গভীরে চলে যায়, বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। কিন্তু এভাবে আর কত কাল? কিছুই কি করার নেই? মিডিয়া কভারেজ, গ্রেফতার, মামলা, শাস্তি সবই তো হচ্ছে। কিন্তু থামছে কই? মেয়েদের অসহায়ত্ত কমছে কই? পুরুষরাও অসহায়, কিন্তু মেয়েরা দুইভাবে অসহায়। প্রথমত মানুষ হিসেবে আর দ্বিতীয়ত মেয়ে হিসেবে! মেয়েদের সীমাবদ্ধতা যেন আজীবনের সঙ্গী। বুঝে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যার বেড়ে ওঠা। কৈশোর, যৌবন, বিবাহিত, অবিবাহিত সর্বত্রই তার বিচরণ। মেয়েটি সব বলতে পারে না। সব বলতে না পারাই তার প্রজ্ঞা। সমাজ তাকে এমনটিই শিখিয়েছে!
সভ্যতার নিজস্ব গতিতে এবং সময়ের দাবিতে হাজার বছর ধরে লালিত গতানুগতিক নারী চরিত্রগুলোর অবস্থানগত এবং গুণগত পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়ে। এই পরিবর্তন কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব স্বার্থে এই পরিবর্তন নয়। যদিও পরিবর্তনের সঙ্গে গতানুগতিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঐতিহ্যের আদর্শগত দ্বন্দ্ব শুরু থেকেই বিদ্যমান। সমাজ পরিবর্তন কিংবা রূপান্তরের এই প্রক্রিয়া কখনোই সহজে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ১৯১৯ সালে আল এসলাম পত্রিকার একটি প্রবন্ধে আধুনিক মহিলাদের তিরস্কার করে বলা হয়, অধুনা তথাকথিত 'শিক্ষিতা' রমণীরা দেরিতে শয্যাত্যাগ করে চা-বিস্কুট হাতে নভেল নিয়ে অথবা আয়নার সামনে দিন কাটায়। শ্বশুরবাড়ির খেদমত, গৃহকর্ম সব উপেক্ষা করে এই নারীগণ আর যাই হোক মুসলিম গৃহের গৃহলক্ষ্মী নয়।' 'অন্দরমহল', 'অন্তপুর' থেকে 'গৃহের' দিকে নারীর এই যাত্রা বিবর্তন প্রক্রিয়ার একটি অংশ। হিমানী ব্যানার্জী এই বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, 'এই পরিপ্রেক্ষিতে দুটি কেন্দ্রীয় বিষয়_ সমাজ অনুমোদিত পারিবারিক ক্ষেত্র, যা প্রথমে অন্তঃপুর/অন্দরমহল এবং পরবর্তীতে 'গৃহ' হিসেবে পরিচয় লাভ করে। এই নবক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠাতা/সংগঠক নারীই/উনিশ শতকের গৃহিণী, প্রকারান্তেরে 'ভদ্রমহিলা'। 'গৃহ' শব্দটির নতুনত্ব এখানেই ধরা পড়ে, অর্থাৎ গৃহ ও অন্দরের পার্থক্য উপলব্ধি করা যায়। অন্দরমহল ছিল নারী, শিশু ও পরিচারকবৃন্দের বাসস্থান এবং পুরুষদের নৈশকালীন নিবাস মাত্র। এর স্বাতন্ত্র্য 'গৃহে'র সঙ্গে তুলনা করলেই প্রকট হয়ে ওঠে।' গৃহ পারস্পরিক সঙ্গ এবং ভালোবাসা আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একটা সময় সমাজ তা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।অন্দরমহল থেকে গৃহে বিবর্তন যথেষ্ট হয়নি। পরবর্তী সময় প্রয়োজন হয় সমাজের সঙ্গে পরিচয়ের। সেই পরিচয়ের শুরু থেকেই বাধা। তারপরও এগিয়ে চলা। এগিয়ে চলার সেই ধারাবাহিকতা আজও চলমান। বাধা ছিল, আছে, থাকবে। তারপরও বিবর্তনের ধারাবাহিকতা, ইতিবাচক পরিবর্তনের গতিশীলতাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। সেই সবচেয়ে শক্তিশালী যে নিজের আদর্শকে সম্বল করে একাই টিকে থাকার সাহস রাখে। আমরা সবাই মানুষ হবো_'মানুষের মতো মানুষ'। ক্লান্তিহীন অবিরাম যুদ্ধের যোদ্ধা মেয়েগুলো যুদ্ধ করবে, জয়ী হবে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। অনৈতিকতা, অশিক্ষা আর অমানবিকতার পরাজয় ঘটিয়ে মেয়েগুলো মানবিকতার জয়গান গাইবে।