জীবন মুচকি হাসে

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০১৮      

সাইফুন নেছা

সময়টা মার্চ মাস। ২০১০-এর এক মঙ্গলবার। অফিস ছিল না আমার। অন্য দিনের মতো সকাল ১০টায় ঘুম থেকে উঠলেন আমার স্বামী বরকত সাহেব। শেভ করলেন, হাত-মুখ ধুলেন, নাস্তা করলেন। টেলিফোনে পরদিন শুক্রবার কী করবেন সে প্রোগ্রাম ঠিক করলেন এক আত্মীয়ের সঙ্গে।

সাড়ে ১০টার দিকে কাপড় পরতে পরতে আমাকে বললেন, ব্লাডের রিপোর্টটা নিয়ে আমি ফিরে এসে গোসল করে চা খাব। বললাম, ঠিক আছে তাই করো। আসার সময় ডিম কিনে আনতে বললাম। তিনি বললেন, ঠিক আছে তাই হবে।

বাসায় থাকতেই পছন্দ করেন তিনি। তাই আমি জানি যত দ্রুত পারেন কাজ শেষে ফিরে আসবেন। আমি তাই ঘর গেরস্থালির কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। মগবাজার টিঅ্যান্ডটি কলোনি থেকে রাশমনো ক্লিনিকে যেতে হলে একটি রেললাইন পার হয়ে যেতে হয়। সেই রেললাইনই কাল হয়ে দাঁড়াল আমার জীবনে। হঠাৎ একটা শব্দ স্তব্ধ করে দিল আমাকে। অ্যাকসিডেন্ট। আহা এতদিন শুধু মানুষের মুখে, খবরের কাগজে দেখে এসেছি। আজ নিজের জীবনে। আমার স্বামী, প্রিয়বন্ধু সেই শব্দের শিকার।

অ্যাকসিডেন্ট শব্দটা শুনেই হাত-পায়ের চলা মনে হয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তারপর আমার অবস্থা কেমন হয়েছিল বলতে পারব না। বলতে পারব না আমি কীভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছলাম। ওয়্যারলেস রেলগেটে গিয়ে দেখি আমার স্বামী বরকত সাহেবের নিথর-নিস্তব্ধ দেহখানি রেললাইনের পাশে পড়ে আছে। যাতে বুকের কোনো স্পন্দন নেই। মুখে কষ্টের কোনো শব্দ নেই। নেই কোনো হাত-পা নড়াচড়া। চোখের পলক নেই। তার মানে শেষ? আমি দৌড়ে আসছি, আমার জন্য অপেক্ষাও করলে না তুমি? হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও দিলে না? অনেক সময় আমাকে না বলেই ঘরের বাইরে চলে যেতে। আজও কি আমাকে না বলেই চলে গেলে?

ঘটনাস্থলের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল রাশমনো হাসপাতাল থেকে রক্ত পরীক্ষার কাগজ নিয়ে ফেরার সময় রেললাইন পার হচ্ছিলেন তিনি। ট্রেন কাছাকাছি এসে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। ট্রেনের ধাক্কা লেগে ছিটকে দূরে গিয়ে পড়েছিলেন। হাত ও মাথায় আঘাত লেগেছিল। হাতে থাকা কাগজের ফাইলটা ছিটকে কোথায় পড়েছিল, পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ ছটফট করার পর আত্মীয়-স্বজন, ছেলে-মেয়ে আপনজনদের অবর্তমানে কাউকে কিছু না বলে দুনিয়া ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন। বিদায়কালে পানির পিপাসা লেগেছিল কি-না কে জানে। কারও কথা মনে পড়েছিল কি-না কে জানে।

একটু বয়স হওয়ার পর তাকে একা বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করতাম। কে শোনে কার কথা? এই শহর কি জানে প্রিয় মানুষ হারানোর কষ্ট কী? এই শহরের পিচঢালা পথ? এই শহরের অচেনা সব মানুষ। কেউ জানে না। কেউ বুঝবে না প্রিয়জন হারানোর ব্যথা। নিমিষেই তাই একজন মানুষ ঘর থেকে দুই পা ফেললেই লাশ হয়ে ঘরে ফেরে।

বাসা থেকে এটাই তার শেষ বের হওয়া ছিল বুঝতে পারিনি। জীবনটা এখানেই থেমে যাবে ভাবিনি। যে উদ্দামের সঙ্গে ছেলে-মেয়ে-স্বামী নিয়ে মায়াজালে আঁকড়ে ধরেছিলাম, কয়েক মিনিটেই তা শেষ হয়ে গেল। ৩০ বছরের সাজানো সংসারকে ঝাপসা দেখতে পেলাম।

ছেলে বাসায় নেই, ফুলবাড়ীতে। মেয়ে ১ম বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরে এলো, সে সময়। মেয়ে এসে এ অবস্থা দেখে চিৎকার করে যখন বলল- কখন, কীভাবে এটা হলো মা? মেয়েকে কীভাবে এর জবাব দেওয়া যায় বলতে পারেন? আত্মীয়-স্বজন সব এসে বাড়ি ভরে গেল। ফিরে এসে চা খাবে, তাই কাপ, কেটলি রেডি করে রেখে ছিলাম, সব তেমনি আছে। শুধু আমার মানুষটা নেই।

সব চলছে ঠিক, প্রকৃতির নিয়মে। শুধু রুটিন বদল আমার। সকাল-বিকেল চায়ের আয়োজন নেই। বড় ওষুধের বাক্সটি আর কেউ ব্যবহার করছে না। কালোজিরার তেলের বোতল, মধুর বোতল পড়ে রয়েছে। কিছু কিছু জিনিস হাত দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। ওইসব জিনিস শত ঘাঁটাঘাঁটি করলেও আর কেউ চেঁচামেচি করছে না।

পৃথিবীর নিষ্ঠুর নিয়ম? কোনো কিছুই বন্ধ থাকবে না? আমার জীবন থমকে গেল।

পরবর্তী খবর পড়ুন : চাপমুক্ত সুন্দর জীবন

অন্যান্য