নন্দন

নন্দন

একক অভিনয়ের 'হ্যাপি ডে'জ'

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বিপ্লব বালা

একক অভিনয়ের 'হ্যাপি ডে'জ'

'হ্যাপি ডে'জ' নাটকে জ্যোতি সিনহা -ছবি ::সনজু সিংহ

'আমরা তো কেউ একা বাঁচি না'- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মণিপুরি থিয়েটারের স্যামুয়েল বেকেট রচিত 'হ্যাপি ডে'জ' মঞ্চায়ন হলো ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল হলে ১ ফেব্রুয়ারি। এ বুঝি এক অনিবার্য মানব-নিয়তি আজ :শূন্য বিবরে ঢুকে ডুবে আছে যেন সে- ত্রিশঙ্কুর মতো, জেগে আছে তার হাতখানি কেবল; যা দিয়ে সে ডাকে, ছুঁতে চায় আর কারও হাত, একদা তার সম্পর্কিতজনের, সে-ও আছে কোথাও হয়তো আরেক গহ্বরে পতিত- একই দশায় বুঝি-বা। অথচ 'মানুষের মন চায় মানুষের মন'। এই নাটকে কবরের ঢিবিতে চাপা পড়া একলা এক নারী, উইনি- বকবক করে ফেরে আপন মনে, ডেকে মরে, যেজন আছে নিকটেই হয়তো- যার নাগাল মেলে না যেন কিছুতেই তার। তীব্র রৌদ্রদাহ ঝলসে দেয় তাকে, দিন তার নিদারুণ, প্রখর তাপের আবহাওয়ায়। সে জানায়, এমন তার ছিল না আগে- তবে কী করে, কেন-ই বা তার হেন দুরবস্থা তা বলে না। উচ্চকণ্ঠ ঘণ্টা বাজে, তাকে কেবল জাগাতে আর ঘুম পাড়াতে। সম্বল কেবল তার একটি পেটিকা- তাতে কত তার প্রিয় আর কাজের যত টুকিটাকি- চিরুনি, টুথব্রাশ; অন্যদিকে যা দিয়ে আখর কাটা যায়, সারাক্ষণ কিছু যেন শনাক্ত করে চলে সে, কী আছে লেখা- 'হারিয়ে ফেলেছি পুরনো আখরগুলি' যা কিছুতেই পড়ে উঠতে পারে না সে; এ ছাড়া আছে টুথপেস্ট, অর্ধেক খালি লাল ওষুধের শিশি, লিপস্টিক, নখ-কাটারি, রিভলবার আর মিউজিক বক্স। এই তাহলে খড়কুটো তার, যা নিয়ে সে বেঁচে আছে এই আশায়- সুন্দর সুখী দিন আসবে একদিন। এসব যেন তার বাঁচনের সর্বশেষ অবলম্ব্বন, হারিয়ে ফেলা প্রিয় সঙ্গস্মৃতি, যা সম্বল করে তার বাঁচা আর প্রিয়ের স্মৃতিও জাগিয়ে তোলা। কাছে কোথাও আছে যেজন- তার আশার আশ্রয় আর বেদনসখা হয়ে। সারাক্ষণ তাকেই সম্বোধন করে বকে মরে সে নিরাশ্বাস। তার স্মৃতির ঝাঁপি যা কিছু নিয়ে আছে সে তা খুলে, বলে চলে কথা আপন মনে। আর ডেকে ডেকে উইলিকে, তার মনোযোগ পেতে। উইলির খবরের কাগজ বাদ সাধে সংযোগে। তবু সে আবার সব ফিরে পাবে, বিশ্বাসবাসে, আজই হবে সে আরেক শুভসুখী দিন- যদিও সে কেবলি ডুবে যায়, গেড়ে যায় হতাশ্বাসে। সবশেষে সে যেন শুনতে পায়, উইলি যেন নাম ধরে ডাকছে তাকে- অসম্ভব এক সুখের অশ্রুজলে ভাসে সে, 'তবু আশা, যেন মাতৃভাষা/চিরায়ুষ্ফ্মতী তন্বী।' যদিও আমরা চেয়ে চেয়ে দেখি, সে নেমে যাচ্ছে অতল গহ্বরে, খাদে।

সব কথা, ক্রিয়াকলাপ সংযোগ চেয়ে, বিয়োগের মর্মন্তুদ দশায় আর্ত, করুণ। প্রতিটি বস্তু ও ক্রিয়াদি যেন প্রতীক-রূপক হয়ে সাক্ষ্য দেয় তার বিবশা। এহেন এক অন্তর্নাট্য, তার এমন অনাটকীয়তা কী করে যে অভিনয় হতে পারে! আমরা যেখানে অভ্যস্ত, রপ্ত করেছি শারীরমুদ্রার এক অতিরেক আস্ম্ফালন শুধু নাটকে, অভিনয়ে? পারঙ্গম গুণী অভিনেত্রী জ্যোতি সিনহাকেও তাই বুঝি নতুন এক আর্তবাচন আবিস্কার, আয়ত্ত করতে হয়- অধীত তার যত সাজের/বিদ্যার অলঙ্কার, সব ছেড়েছুড়ে তিনি স্বরূপের নিহিত বাচনমুদ্রা উপার্জন করেছেন- নিজেকেই যেন অনুপুঙ্খে খুঁজে পেয়ে। ২২ বছরে ২৫টি চরিত্রে অভিনয়ের পুঁজি নিয়ে এই উজ্জ্বল-উদ্ধার সম্ভব হয়েছে বুঝি- শিল্পের এ এক বিরাট জয়। প্রতিটি ক্রিয়ায় সত্য হয়ে ওঠা, এতখানি আত্মোন্মোচন অভিনয়ে দুর্লভ; নিজেকেই উন্মুক্ত করা যেন- যার সাক্ষাৎ আগে আমরা পাইনি। নানা চরিত্র অভিনয়ে তা বুঝি ঢাকা পড়েছিল এতদিন। দর্শক হিসেবে আমরাও যেন তার সঙ্গে নিজেদের গভীর, গোপন উন্মোচন দেখি, নিজেকেই পাই বুঝি- সেই তো অন্বিষ্ট শিল্পের। প্রচলিত নাট্যে, অভিনয়ে- জীবনেরই মতো আমরা শুধু লুকিয়ে চলি, অভিনয় করে ফিরি- সত্তার সত্য পরিচয় যাতে মেলে না। জীবনে যা কিছু আমরা হারাই, খোয়াই, নানা মুখোশে ঢাকি নিজেদের, তাকেই নানা অভিনয়ে প্রকাশ করা ছাড়া সত্তার মুক্তি কেমনে মেলে! অভিনয়ে ব্যক্তির এই গহন-প্রকাশের দুই পূর্বস্মৃতি মনে পড়ছে :ফেরদৌসী মজুমদারকৃত নির্বাকনাট্য 'একা' আর রোকেয়া রফিক বেবীর 'রিকোয়েস্ট কনসার্ট'। নির্দেশক শুভাশিস সিনহা অ্যাবসার্ড নাটক বলে বিভ্রান্ত হননি। মানব-নিয়তি চিরকালই তো আনন্দ-বেদনা, হর্ষ-হিংসাময়। তাকেও তাই পূর্বার্জিত বিদ্যা থেকে সরে আসতে হয়েছে- অন্তর্নাট্যের গৃঢ়াভাস আয়ত্ত করতে। একটি শুধু অনুযোগ :কবরের ঢিবি কি এহেন দশার যোগ্য দৃশ্যকল্প, দর্শকের অভ্যস্ত রুচি মেনে বুঝি তা করা, আরও কোনো লাগসই সৃজনস্ম্ফুর্তি চাই, এক্সপ্রেশনিস্ট নয় ইমপ্রেশনিস্ট। আখ্যানের যোগ্য প্রতিবেশ যাতে অধিক বাঙ্‌ময় হতে পারে।

ফরাসি দূতাবাসকে ধন্যবাদ, নারীর ক্ষমতায়নে উদ্বেজিত এই প্রযোজনার জন্য। নাটকটি দ্বিভাষিক হয়ে আয়ত্ত করেছে অধিক বাঙ্‌ময়তা। কবীর চৌধুরী ও শাহীন কবীরকৃত অনুবাদ যথা সম্পাদনা, পুনর্বাচন করেছেন শুভাশিস সিনহা ও জ্যোতি সিনহা। ধ্বনি-সঙ্গীত পরিকল্পনা ও প্রয়োগ দ্বিসাংস্কৃতিক আবহে ভরে তুলেছে দৃশ্যকাব্য। যেন হয়ে উঠেছে সহযোগী অভিনেত্রীবৎ। এটা একটা অর্জন বটে, ধ্বনিমণ্ডলের চরিত্র হয়ে ওঠার এই বিস্তার। হুমায়ুন আজাদ রেওয়াজ, শর্মিলা সিনহা ও স্বর্ণালী সিনহার এই যৌথ রূপায়ণ। সব মিলিয়ে তারিফযোগ্য এক নাট্য-অভিজ্ঞতা 'হ্যাপি ডে'জ'। আমরা সত্যিই বুঝি জ্যোতিস্নাত হলাম।