নন্দন

নন্দন


নাচকন্যার গল্প

প্র চ্ছ দ

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০১৯      

সমু সাহা

নাচকন্যার গল্প

পূজা সেনগুপ্ত

শিল্পের সঙ্গে ইতিহাস ও সভ্যতার রয়েছে এক গভীর সংযোগ। শিল্পের বিচরণ মানুষের মনে, তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিমূর্ত শিল্প নিজের মতো করে আবর্তিত হয় স্থান, কাল, পাত্রভেদে। পরিভ্রমণ করতে পারে পৃথিবীজুড়ে। কিন্তু সভ্যতার নিদর্শনগুলো মাটি আঁকড়ে থেকে যায় কালের সাক্ষী হয়ে। পুরো ব্যাপারটাকে যদি একটা বৃক্ষের রূপকের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে সভ্যতা বৃক্ষের শিকড় আর শিল্প হলো বৃক্ষের ডালে জন্ম নেওয়া ফুলের সুরভী। নিজের ভাবনার অতলে ডুব দিয়ে এভাবেই অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন নৃত্যশিল্পী ও নির্দেশক পূজা সেনগুপ্ত। তার কথাগুলো একেবারেই অমূলক নয়। ইতিহাস ও শিল্পের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করে কীভাবে অনিন্দ্যসুন্দর পরিবেশনা দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা যায়, তা পূজার ভালোই জানা। এই তো কিছুদিন আগেই তার নাচের দল তুরঙ্গমী ডান্স থিয়েটার মঞ্চে নিয়ে এলো নৃত্যনাট্য 'হো চি মিন'। ভিয়েতনামের স্বপ্নদ্রষ্টা হো চি মিনকে উপজীব্য করে এর চিত্রনাট্য, নির্দেশনা, কোরিওগ্রাফি, সেট, পোশাক, কণ্ঠ ও নির্দেশনা দিয়েছেন পূজা সেনগুপ্ত। একটি প্রযোজনার এতগুলো শাখায় বিচরণ করেছেন, কিন্তু ভাবনা-চিন্তায় নতুন কিছু করে দেখানোর চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না তার। প্রথমবারের মতো হো চি মিনের মতো বর্ণময় নেতার জীবনচিত্র তুলে ধরা চাট্টিখানি কথা নয়। তাছাড়া নাচের মধ্য দিয়ে একজন সংগ্রামী মানুষের গল্প বলার পরিবেশনাও ঢাকার মঞ্চে একেবারেই নতুন। তবে বিষয়টি পূজা ভালোভাবেই জানতেন। সে জন্য প্রযোজনাটি মঞ্চে আনার জন্য তিনি ভালোভাবে চ্যালেঞ্জও নিয়েছিলেন। গত সেপ্টেম্বরে হো চি মিনের তিনটি প্রদর্শনী ঢাকার মঞ্চে অনুষ্ঠিত হলো। তবে পুরো প্রযোজনায় তিনি যে এভাবে দর্শককে চমকে দেবেন তা মিলনায়তনে উপস্থিত কেউই ভাবেননি। 'হো চি মিন' নৃত্যনাট্যের শব্দ ও সংগীতে শোনা গেছে হো চি মিনের কণ্ঠ, তার লেখা কবিতার আবৃত্তি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের গানের সুর। পুরো নৃত্যনাট্যে তিনি ইতিহাসের সঙ্গে প্রাচ্যের শিল্পের সংমিশ্রণ ঘটালেন অপরূপ রূপে। পূজা প্রযোজনাটি দিয়ে আবারও প্রমাণ করলেন, 'নতুনেরে তিনি বাসেন ভালো, নতুনে করেন বাস'। মৌলিক প্রযোজনাটি নিয়ে তুরঙ্গমী পরিচালক পূজা বলেন, '২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক নৃত্য উৎসবে অংশ নিতে ভিয়েতনামে যাই, তখন হো চি মিনের জাদুঘরে যাওয়া হয়। তার সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু এত বড় একজন নেতার জীবনী তুলে ধরার প্রয়াস কখনই সহজ ছিল না। আমাদের পুরো দল অনেক পরিশ্রম করেছে। দর্শকদের মতগুলো আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে।

প্রযোজনাটি নিয়ে আলাদাভাবে কিছু বলতে চাই না। আমি যা বলতে চেয়েছি, সেটা আমার কাজের মাধ্যমেই বলেছি। হো চি মিনের মতো এত বড়মাপের নেতার জীবন নিয়ে কাজ করার সুযোগ আমার জন্য অনেক সম্মানের ও সৌভাগ্যের ব্যাপার।' সত্যিই, পূজা তার কাজের মধ্য দিয়েই কথা বলতে পছন্দ করেন। ইতোমধ্যে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক ডান্স কাউন্সিলের সদস্য হয়েছেন পূজা সেনগুপ্ত। একই মর্যাদা পেয়েছে তার নাচের প্রতিষ্ঠান তুরঙ্গমী স্কুল অব ডান্স। এই স্বীকৃতির ফলে এখন থেকে ইউনেস্কোর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারবেন তিনি ও তার দল। এ ছাড়াও সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ডান্স কাউন্সিল ইউনেস্কোর প্যানোরমায় স্থান পেয়েছে তুরঙ্গমীর প্রযোজনা 'হো চি মিন'। এর মধ্য দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ডান্স কাউন্সিল ইউনেস্কোর প্যানোরমায় বাংলাদেশ ট্যাব যুক্ত হয়েছে এবং প্রথম বাংলাদেশি প্রযোজনা হিসেবে ইউনেস্কোর আর্কাইভে জায়গা করে নিয়েছে তুরঙ্গমীর 'হো চি মিন'। সেখানে প্রযোজনাটিকে বিশ্বের প্রথম জীবনীমূলক ডান্স থিয়েটার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এত সাফল্যে কখনই আত্মতৃপ্তিতে থাকতে চান না পূজা। তাই নিরলসভাবে করে চলছেন নতুনের সন্ধান। ইতোমধ্যে তার দল তুরঙ্গমী প্রস্তুতি নিচ্ছে বেশ কয়েকটি নতুন প্রযোজনা মঞ্চে নিয়ে আনার জন্য। অন্যদিকে আগামী মাসে ফ্রান্সে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেবেন পূজা। সবমিলিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন পূজা ও তুরঙ্গমী। তবে শত ব্যস্ততার মাঝেও আবারও মঞ্চে হো চি মিনের প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান এ নৃত্যশিল্পী।

এখনই পূজা সেনগুপ্তের অর্জনের তালিকা বেশ ভারী। তবে অদ্ভুত বিষয় হলো, শুরুর দিকে শখের বশে নাচ করতেন তিনি। কখনই ভাবেননি এটিই হবে তার পেশা, এমনকি নেশাও বটে! নিজেই বলেন, 'প্রথম দিকে শখের বশে কাজ করলেও একটা সময় ভালোবাসার জিনিসটি যেন হারিয়ে না যায় তাই নাচটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছি। যখন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি নাচই হবে আমার জীবনের পেশা, তখন মাথায় কাজ করল অনেক তো শেখা হলো, এখন একটা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি দরকার। তাই ২০১১ সালে ছুটে গেলাম রবীন্দ্রভারতীতে। ফিরলাম ২০১৩ সালে। ফিরে এসে পুরোদমে কাজ শুরু করলাম।'

তবে দেশে ফিরে একবিন্দুও অবকাশ মেলেনি তার। ২০১৪ সালে গঠন করেন নিজের নাচের দল 'তুরঙ্গমী'। সচরাচর নাচের দলের মতো নয়। একটু ভিন্ন আঙ্গিকে নাচকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন পূজা। নাচে পেশাদারি জায়গা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। পূজা বলেন, 'আমাদের দেশে অনেক নৃত্যশিল্পী অনেক বছর নাচ শিখে একটা সময় হারিয়ে যান। নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো উপায় থাকে না তাদের কাছে। এমন শিল্পীদের একটি পেশাদারি প্ল্যাটফর্ম দিতে তুরঙ্গমীর জন্ম। তা ছাড়া সারা বিশ্বে নাচ অনেক এগিয়ে গেছে। নিজেদের দেশের নাচকেও আন্তর্জাতিক মানের করে তুলতে চায় তুরঙ্গমী।' বলে রাখা দরকার, এটিই বাংলাদেশের প্রথম ডান্স থিয়েটার ও নৃত্যভিত্তিক রেপার্টরি। এই নৃত্যদলের প্রতিষ্ঠার চার বছর পূর্তিতে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তুরঙ্গমী স্কুল অব ডান্স। প্রথাগত নৃত্যশিক্ষার পাশাপাশি নাচ নিয়ে গবেষণা ও নতুন আঙ্গিক নির্মাণ নিয়ে কাজ করছে তুরঙ্গমী স্কুল অব ডান্স।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক নৃত্য উৎসবে অংশ নিয়েছে পূজার দলটি। ঝুলিতে আছে ডান্স থিয়েটার, ডান্স ফিল্ম, অ্যানিমেশন ডান্সসহ নানা মাত্রিক প্রযোজনা। সৈয়দ শামসুল হককে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রথম প্রযোজনা করেছিল দলটি। এরপর তারা একে একে 'পথিকৃৎ', 'রেজ্যুলেশন', 'ওয়াটারনেস', 'অনামিকা সাগরকন্যা'র মতো প্রযোজনা তৈরি করে।

বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করা পূজা সেনগুপ্তের দেশীয় নাচ নিয়ে রয়েছে গভীর জানাশোনা। তাই দেশের সার্বিক নাচের পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের নিজস্ব নৃত্য আঙ্গিক অনেকটাই হারিয়ে গেছে। খুবই স্বাভাবিক যে, আমাদের ভূখণ্ড বারবার শাসিত হয়েছে বিভিন্ন শাসক দ্বারা। এতে নিজেদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখা কঠিন ছিল এ অঞ্চলের মানুষের জন্য। এখানে পাল, সেন, মোগল, ব্রিটিশ সবাই তাদের সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দিয়েছে। অবশ্য আশার কথা, আমাদের এখন ভালো সময় যাচ্ছে, সরকারের সহায়তায় আমরা এগোতে পারছি।'