নন্দন

নন্দন


পাহাড় জলের হাতছানি

পায়ের তলায় শর্ষে

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯      

সোহানা সাবা

পাহাড় জলের হাতছানি

সোহানা সাবা

আলো ঝলমলে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। যতই তাকিয়ে থাকি, মুগ্ধতা কাটে না। বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। ভ্রমণ আমার খুব পছন্দ। যে জন্য যখনই কোনো সুযোগ পাই ছুটে যাই পাহাড়ের কোলে, জলের কাছে। নানা কারণেই ওমান আমার ভ্রমণের প্রিয় একটি জায়গা। বেশ কয়েক মাস ধরে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। শহরটি বেশ সুন্দর। কোনো কোনো জায়গা ঠিক ছবির মতোই। দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। গত মাসের মাঝামাঝি গিয়েছিলাম ওই সৌন্দর্যের মায়ায়। বান্ধবীদের নিয়ে সব সময় বেড়ানো রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সঙ্গে তিন প্রিয় বান্ধবী থাকায় ভ্রমণের আনন্দ বেড়ে গিয়েছিল বহু গুণ। ওমানেও অনেক জায়গায় মধুর সময় কেটেছে। সবাই মিলে হারিয়ে গিয়েছিলাম অন্য ভুবনে। বিশেষ করে 'রঞ্জম্বাস'-এর ওয়াও দ্বীপে রাত যাপন স্মৃতিতে আলপনা আঁকবে বহুদিন। অদ্ভুত একটা 'সেমি এতিম দ্বীপ'!

ছোট্ট একটা সুন্দর দ্বীপ। আমাদের সেখানে নামিয়ে দিয়ে বোটটি চলে গেল। ক্রমেই রাত গভীর হতে লাগল। সম্বল শুধু দুটি ছাউনি, দুটি লাইট। আমরা নিলাম একটা চাটাই, কিছু জল খাবার, কিছু কাপড় আর একজন আরেকজনের সঙ্গ। ১৭ নভেম্বর পৌঁছলাম ওয়াও দ্বীপে। চারদিকে অন্ধকার। চোখ সব কিছু স্বাভাবিকভাবে দেখতে একটু সময় নিল। এক সময় চোখ সয়ে গেল। তারপর সেখানে পেট পুরে ও মনভরে খানাপিনা খেলাম। কাছে পানি থাকলে তার সঙ্গে মিতালী না হলে কি জমে? অতঃপর পানিতে ঝাঁপ। দাপাদাপি। আনন্দ হৈ-হুল্লোড়। শেষে রাত ১১টায় ঠাসাঠাসি করে ঘুমিয়ে পড়লাম টুপাটুপ সব। রাত ১২টায় একদল ছেলে বোট নিয়ে ভিড়ল আমাদের দ্বীপে। তাদের দেখে ভয় যে একেবারে পাইনি তা কিন্তু নয়! গা ছমছম করছিল। আমাদের সর্বকনিষ্ঠ সঙ্গী চকোর ঘেউ ঘেউ শব্দে ছেলেগুলো ভড়কে গিয়েছিল। ছেলেগুলো নিল অন্য ছাউনিতে আশ্রয়। আমরা এক সময় ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে ওয়াও দ্বীপকে তন্ন তন্ন করে আবিস্কার করলাম। সময়ের পরিক্রমায় বোট আমাদের নিয়ে ঘাটে ভিড়ল। আমরা সঙ্গী করে ফিরলাম আদিম যুগের এক টুকরো স্মৃতি। ওমানে সবাই অনেক ব্যস্ত ছিলাম। যে জন্য ঠিকমতো ঘুমাতেও পারিনি। শপিংয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল শেষ দিন। ঘুরে ঘুরে পছন্দসই জিনিস কিনলাম। সুন্দর পরিপাটি সাজানো-গোছানো দোকানগুলো। ওমানের সেখানেই যাই, সব কিছু তুলে বাড়িতে নিয়ে আসতে ইচ্ছা হচ্ছিল। কিন্তু পকেটের অবস্থা তো ঘুরে ঘুরে বাজে হয়েছে। সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না অনেক পছন্দের জিনিস কেনার। তবে শখ করে একটু ট্রায়াল না দিলে কি পোষায়। না হয় 'ক্ষণিকের রাজা' হলাম। ওমানের রাজরাসি মাস্কাটের কিছু জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। সেখানকার ইতিহাস-ঐতিহ্য জানার চেষ্টা করেছি। সবশেষে গিয়েছিলাম থাইল্যান্ড। ব্যাংককে জলরাশির বুক চিরে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোর অনন্য অভিজ্ঞতা নিয়েই ফিরেছি। স্পিডবোটে জমিয়ে ঘুরে বেড়ানো হয়েছে। আমার অনেক ভ্রমণের সঙ্গী অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও অরিত্র সিং। তাদের আমি আমার প্রাণের সঙ্গীই বলব। সোনালি সকাল, দুপুর, বিকেল কাটে এ দু'জনের সঙ্গে। ভ্রমণে প্রিয় বান্ধবীদের সুন্দর সান্নিধ্য ছাড়া সবকিছু পানসে মনে হয়।

যখনই শুটিংয়ে ক্লান্ত হয়ে যাই, পরিকল্পনা করে বেরিয়ে পড়ি। এর আগেও শাওনের সঙ্গে বান্ধবীরা মিলে নেপাল গিয়েছিলাম। নেপালে ভিসা লাগে না। তাই মন চাইলে যখন-তখন সে দেশে যাওয়া যায়। নেপালকে ঘিরে আমার সুন্দর অনেক স্মৃতি আছে। যে জন্য চিন্তা করলাম নিজেদের আনন্দে যখন বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবছি, তখন নেপালই যাই। ওইবার প্রথমে গিয়েছিলাম নাগরকোট। একদম পাহাড়ের ওপর; মেঘের কাছাকাছি। হোটেলের রুম থেকেও মেঘরাশি দেখা যায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে এভারেস্টের চূড়ার সৌন্দর্য উপভোগ করেছি।

নাগরকোট ছাড়াও ভক্তপুরে বেশ আনন্দে সময় কেটেছে। দরবার স্কয়ার ঘুরে ঘুরে দেখেছি। সব শেষে গিয়েছিলাম কাঠমান্ডুতে। একদম আকাশের কাছাকাছি উড়েও এলাম। ওড়াউড়ির পর মনে হয়েছে, কেমন যেন ভারহীন হয়ে গেলাম! হালকা মনে হলো নিজেকে। জীবনে অনেক দেশ ভ্রমণ করেছি। এটা আমার শখও বটে। ঘোরাঘুরির পাশাপাশি মনের খুশিতে খাওয়া-দাওয়া করেছি। পাহাড়ি এলাকায় মোমোটা খুব খাওয়া হয়েছে। মানুষ চাইলে কী না পারে! পানির নিচে মাছের মতো ঘুরতে পারে। আবার পাখির মতো আকাশে উড়তে পারে। মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাটা অনেক সুন্দর। প্রতিবার ভ্রমণে এই উপলব্ধি জেগে ওঠে। তাই যখনই মন চায় নদী-সাগর আর পাহাড়ের কাছে ছুটে যাই। মনকে পাঠিয়ে দিই আনন্দের রাজ্যে। আর বলতে ইচ্ছা হয় আমি একটা পাখি/আমি উড়তে পারি/ভাসতে পারি/সুযোগ পেলে সব ভুলে হাসতে পারি/গাইতে পারি... নাচতে পারি/বাঁচার মতো বাঁচতে পারি। প্রতীক্ষার প্রহর গুনছি আরও অনেকবার বিদেশ-বিভুঁইয়ে পা রাখার। কারণ বিশ্বমানচিত্রের নানা প্রান্তে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে নিজেকে ঋদ্ধ করতে চাই। সাজিয়ে তুলতে চাই আপন ভুবন। শুধু বিদেশে ঘুরতে ভালো লাগে তা কিন্তু নয়। ভ্রমণের জন্য দেশেরও অনেক সুন্দর জায়গা আছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ জায়গা আমার দেখা হয়েছে। আমাদের দেশটা অনেক সুন্দর। যে কেউ চাইলেই সময়-সুযোগ থাকলে যখন-তখন আকর্ষণীয় স্থানগুলোয় ঘুরে আসতে পারেন। সময়-সুযোগ পেলেই আমি বান্ধবীদের একত্র করে হারিয়ে যাই প্রকৃতির কোনো অপার সৌন্দর্যের রাজ্যে...।