এক.

ফারজানা ব্রাউনিয়া চ্যানেল আইতে প্রথম অনুষ্ঠান করে লেটস মুভ। ম্যাগাজিন ফর্মে কুইজ অনুষ্ঠান। মাসে একটি পর্ব। প্রতি অনুষ্ঠানে একটি গাড়ি উপহার দেওয়া হতো। সাচ্চুর পরিচালনায় অনুষ্ঠানটি তখনকার টেলিভিশনের অনুষ্ঠানমালায় সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। ব্রাউনিয়া এরপর কর্মসূত্রে সংযুক্ত হলেন চ্যানেল আইতে। মার্কেটিং বিভাগ ছাড়াও বড় বড় ইভেন্ট পরিচালনা ও উপস্থাপনায় ব্রাউনিয়া চ্যানেল আই পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেলেন। লাক্স-চ্যানেল আই অ্যাওয়ার্ড, সিটিসেল মিউজিক অ্যাওয়ার্ড- এসব বড় অনুষ্ঠানে ব্রাউনিয়াই ছিল উপস্থাপক। এ ছাড়াও 'সেরা কণ্ঠ' তারই পরিচালনায় শুরু হয়। 

ব্যতিক্রমী ফারজানা ব্রাউনিয়ার মাথায় সবসময় নানারকম ব্যতিক্রমী চিন্তা ঘুরপাক করতে থাকে। দুইয়ে দুইয়ে চার মিললেই হলো; ব্যস, অমনিই সেই ব্যতিক্রমী চিন্তার দশাসই বাস্তব রূপ দিয়ে ফেলে সে। তেমনই একটি ব্যতিক্রমী চিন্তার কথা একদিন সে উপস্থাপন করল চ্যানেল আইয়ের এক অফিসিয়াল বৈঠকে। সেদিনের বৈঠকে আমি ছাড়াও সেখানে উপস্থিত ছিল ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড, চ্যানেল আইয়ের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য শাইখ সিরাজ, বিপণন প্রধান ইবনে হাসান খান আর অনুষ্ঠান প্রধান আমীরুল ইসলাম।

প্রস্তাবনাটা উপস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই শাইখ সিরাজ একবাক্যে বলে উঠল- না, ব্রাউনিয়া। তোমার এই প্রেগন্যান্সি পিরিয়ডে এ ধরনের অনুষ্ঠান ধারণ করে অন-এয়ার দেওয়াটাকে আমি মোটেও সমর্থন করতে পারছি না। এটা ঠিক হবে না। কী বলো আমীরুল?

আমীরুল ইসলাম সদাসতর্ক মানুষ। তাই যেকোনো কিছুতে চট করেই সায় দেয় না। সিরাজের প্রশ্নে তাই তাৎক্ষণিক কিছু না বলে ব্রাউনিয়ার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল। 

ব্রাউনিয়ার পাল্টা যুক্তি- কিন্তু সিরাজ ভাই, প্রেগন্যান্সি তো কোনো অসুখ নয়। এটা একজন নারীর জীবনচক্রের অতি স্বাভাবিক একটি ঘটনা। আর এখন আমি প্রেগন্যান্ট বলেই এই প্রেগন্যান্সিবিষয়ক অনুষ্ঠানটি আরও গভীর উপলব্ধি নিয়ে করতে পারব।

কিন্তু লোকের কথাও ভাবো। লোকজন তো ভাববে প্রেগন্যান্সি পিরিয়ডেও চ্যানেল আই তোমাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছে। ছাড় দেয়নি। সিরাজও পাল্টা যুক্তি হাঁকল।

এভাবে ভাবলে তো সিরাজ ভাই মানুষ অনেক কিছুই ভাবতে পারে। নানা মানুষের নানা ভাবনা। সেসব কিছু গ্রাহ্য করলে তো আর নতুন কিছু হবে না ...।

এভাবে নানা যুক্তি-পাল্টা যুক্তি চালাচালির পর অবশেষে আমাদের সবাইকে রাজি করে ফারজানা ব্রাউনিয়া তার প্রথম মেয়েসন্তান শ্রেয়সীকে পেটে নিয়ে অনুষ্ঠান করল, যার নাম ছিল আমি মা হতে চলেছি। চ্যানেল আইতে অনুষ্ঠানটির মোট ৪০টি পর্ব সম্প্রচারিত হয়।

আগেই বলেছি, ব্যতিক্রমী ব্রাউনিয়ার মাথায় সব সময় ব্যতিক্রমী চিন্তা চলতেই থাকে। আমি মা হতে চলেছি অনুষ্ঠানটি করতে করতেই আরেকটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ফারজানা ব্রাউনিয়ার মাথায় চলে আসে। প্রেগন্যান্সিবিষয়ক অনুষ্ঠান করতে গিয়ে বাংলাদেশে সন্তান জন্মদানকালে গর্ভবতীর মৃত্যুহার এবং এই মৃত্যুর কারণগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারে সে। আর সেই থেকেই তার মনে হয় একজন নারীকে বয়ঃসন্ধিকালেই তার প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে হবে। 

প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সঠিক জ্ঞান নিয়ে বেড়ে উঠতে পারলেই একজন নারী কেবল বাল্যবিয়ে, অল্পবয়সে গর্ভধারণ, গর্ভকালীন জটিলতা, বয়ঃসন্ধিকালীন জটিল বিষয়গুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। আমাদের দেশের রক্ষণশীল সামাজিক ব্যবস্থার কারণে দেশের বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরীই প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সঠিক জ্ঞানের অভাবে ভোগে। ফারজানা ব্রাউনিয়া বেশ গভীরভাবেই এ বিষয়টি উপলব্ধি করে তার কন্যা শ্রেয়সীর জন্মের কিছুদিন পরই এ বিষয়ক একটি অনুষ্ঠান নির্মাণের প্রস্তাব আবার এক অফিসিয়াল বৈঠকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। 

এবারও নানা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হয় তাকে। কিন্তু ব্রাউনিয়াকে কি ঠেকানো যায়? জন্ম হয় কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক এক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান স্বর্ণ-কিশোরীর। চ্যানেল আই তার সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে অনুষ্ঠানটি নির্মাণ ও প্রচারে যাবতীয় সহায়তা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। প্রতি শুক্রবার বিকেল ৫:৩০ মিনিটে প্রচারিত ২০ মিনিট ব্যাপ্তির এই অনুষ্ঠান খুব অল্প সময়েই দর্শকপ্রিয়তা পেয়ে যায়। ফারজানা ব্রাউনিয়া দেশের ৬৪ জেলা পরিভ্রমণ করে এই অনুষ্ঠানটি নির্মাণ করে। একসময় প্রতিষ্ঠিত হয় স্বর্ণ-কিশোরী ফাউন্ডেশন। টেলিভিশন প্রচারযন্ত্রের চুম্বকীয় শক্তি খুব দ্রুত এই অনুষ্ঠানকে ছড়িয়ে দেয় সারাদেশে। দ্রুততম সময়ে দেশের ৬৪ জেলায় গঠিত হয়ে যায় প্রায় পাঁচ হাজার স্বর্ণ-কিশোরী ক্লাব। দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও নোবেলজয়ী কৈলাশ সত্যার্থীও এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে স্বর্ণ-কিশোরীর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

দেশ এবং দেশের বাইরে নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে স্বর্ণ-কিশোরীর কল্যাণ-কর্ম। চ্যানেল আইতে প্রচারিত হতে থাকে এইসব কল্যাণ-কর্মের নানা বিষয়। এরকমই নানা আয়োজনের একটি আয়োজন ছিল গত ১১ অক্টোবর ২০১৮ সালে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে। 

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা এবং তার আশপাশের আরও কয়েকটি উপজেলার স্বর্ণ-কিশোরীরা সেদিন উপস্থিত হয়েছিল গোদাগাড়ীর এক স্কুল প্রাঙ্গণে। 

স্বর্ণ-কিশোরী ফাউন্ডেশনের মূল কার্যক্রমের মধ্যে সেদিন ছিল কিশোরীদের মাঝে সাইকেল বিতরণ কার্যক্রম। সেই অনুষ্ঠানটিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোদাগাড়ী আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে আমাকে এবং বিশিষ্ট নজরুলসঙ্গীত শিল্পী ফেরদৌস আরাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় স্বর্ণ-কিশোরী ফাউন্ডেশন থেকে। স্বর্ণ-কিশোরীর এ ধরনের আরও অনেক আয়োজনেই আমি এবং দেশের আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি নানা সময়ে উপস্থিত থেকেছেন। সে রকমই একটি উপস্থিতি ছিল সেদিন আমার এবং বিশিষ্ট নজরুলসঙ্গীত শিল্পী ফেরদৌস আরার। 

ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ফারজানা ব্রাউনিয়া, পরিচালক রফিকুল ইসলাম আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিল তাদের এ কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পন্নের জন্য। আমি আমার সঙ্গে স্বর্ণ-কিশোরীর টেলিভিশন সম্প্রচারের দায়িত্বে থাকা চ্যানেল আইয়ের কর্মী বাহিনীর সদস্য ইফতেখারুল চিশ্‌তী এবং আমার প্রায় সর্ব সফরের সঙ্গী আমার একান্ত সহযোগী খায়রুল ইসলাম তুফান এবং বিশিষ্ট নজরুলসঙ্গীত শিল্পী ফেরদৌস আরাকে নিয়ে ইমপ্রেস এভিয়েশনের হেলিকপ্টারযোগে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে গিয়ে উপস্থিত হই। 

যাওয়ার সময় আবহাওয়া কিছুটা বৈরী ছিল। বৃষ্টি হচ্ছিলো গুঁড়ি গুঁড়ি। আমাদের চ্যানেল আইয়ের পরিচালক এয়ারপোর্টে উপস্থিত ছিলেন। আমি যাচ্ছি শুনে মামুন এয়ারপোর্টে আসেন এবং  আবহাওয়ার ক্লিয়ারেন্স দেন। আমরা রওনা হই এবং ৪০ মিনিটের মতো উড়ে গোদাগাড়ীতে গিয়ে পৌঁছি। আমরা পৌঁছানোর পর একটু জোরেই বৃষ্টি শুরু হয় সেখানে। তবে অনুষ্ঠানে আগত কিশোর-কিশোরীরা সেই বৃষ্টি উপেক্ষা করেই অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত থাকে, যা আমাদের আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে। আমরা প্রায় কাকভেজা হয়ে সেই অনুষ্ঠানমঞ্চে গিয়ে দাঁড়াই এবং উপস্থিত উদ্যমী কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলি। একসময় ফেরদৌস আরা তার দরাজ কণ্ঠে রক্ত-আন্দোলিত  করা একটি নজরুলসঙ্গীত পরিবেশন করেন। আমি, সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী, ফেরদৌস আরা, ফারজানা ব্রাউনিয়া এবং রফিকুল ইসলাম মঞ্চে দাঁড়িয়ে উপস্থিত কিশোরীদের মাঝে সাইকেল বিতরণ করি। অনুষ্ঠানটি শেষ করে ফিরে আসার পথে রফিকুল ইসলাম আর ফারজানা ব্রাউনিয়াকে বলি যে, হেলিকপ্টারের দুটো সিট খালি আছে, চাইলে তারা আমাদের সফরসঙ্গী হতে পারে। ফারজানা ব্রাউনিয়া আমাকে জানায়, ওর আর রফিকের বিকেলের ফ্লাইটে টিকিট কাটা আছে। তবুও আমি যখন বলছি, তখন আমার প্রস্তাবের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ওরা আমাদের সফরসঙ্গী হচ্ছে।

আমরা হেলিপ্যাডের কাছে চলে আসি। বৃষ্টি তখন কমেছে, কিন্তু একেবারে থামেনি। গুঁড়ি গুঁড়ি পড়ছিল। পাইলট জানাল, উড়তে সমস্যা নেই। বিশ মিনিট ওড়ার পর ওয়েদার ক্লিয়ার পাওয়া যাবে। এমপি সাহেব এবং ইউএনও সাহেব আমাদের বিদায় জানান। আমরা হেলিকপ্টারে চড়ে বসি। আশ-পাশে অনেক মানুষ ভিড় করেছিল হেলিকপ্টারটা কীভাবে ওড়ে তা দেখার জন্য। একসময় আমাদের হেলিকপ্টার মাটি ছেড়ে উঠে পড়ে। কিন্তু ষাট-সত্তর ফিটের মতো ওঠার পরই হঠাৎ একটা ঝাঁকি দিয়ে ওটার ইঞ্জিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। হেলিকপ্টারের ভেতরে বসা আমরা সবাই কিছু বুঝে ওঠার আগেই তা দারুণভাবে আছড়ে পড়ে মাটিতে। তবে এই ওড়া এবং আছড়ে পড়ার মধ্যবর্তী যে স্বল্প সময়টুকু আমাদের হাতে ছিল, তার মাঝেই পাইলটের প্রতি আমার দ্রুত প্রশ্ন ছিল, কী হলো? পাইলটের তার চেয়েও দ্রুত উত্তর ছিল, 'আল্লাহর নাম নেন। ইঞ্জিনটা সিস করছে।'

দুই

দুর্ঘটনার পরে কী ঘটেছে তা আমার বিশদ মনে নেই। হেলিকপ্টার মাটিতে নিথর পড়ে আছে। তুফান ও ব্রাউনিয়ার চেষ্টায় হেলিকপ্টার থেকে কোনোমতে বের হয়ে এলাম। আমরা স্তম্ভিত, হতচকিত, বিমূঢ়, বিস্মিত। ঘটনাস্থলে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে চারপাশে উৎসুক জনতার ভিড়। আমরাও বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু। জনতার ভিড় আমাদের ঘিরে ধরেছে। আমরা তখন বোধহীন, মাথা কোনো কাজ করছে না। কী হলো, কীভাবে হলো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা কি আহত হয়েছি? শারীরিকভাবে কে কতটা আঘাতপ্রাপ্ত কেউ জানি না। ফোনে ঢাকার কারও কারও সঙ্গে কথা হলো, প্রত্যেকেই উদ্বিগ্ন। ভীষণভাবে চিন্তিত- কণা, মেঘনা, মোহনা এই দুর্ঘটনার খবর শুনে ঠিক আছে কিনা সেটাই প্রথম জানতে চাইলাম। 

কাকে যেন বললাম, মা যেন জানতে না পারে। তাহলে দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়বেন তিনি। 

মামুন, শাইখ সিরাজের সঙ্গে কথা হলো। এসবই হচ্ছে ঘোরের মধ্যে। গাড়িতে চড়ে আমরা রওনা দিলাম রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। তার আগে স্থানীয় গোদাগাড়ী থানা কমপেল্গক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে কিডনির সমস্যার কারণে আমাকে ব্যথানাশক ইনজেকশন দেওয়া হলো না। বাকিদের ব্যথানাশক ইনজেকশন দিয়ে আমাদের হেলিকপ্টারে করে ঢাকা ফেরার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন মামুন। তখন হেলিকপ্টারে চড়ার মতো মানসিক অবস্থা আমাদের ছিল না। তাই পরে আমরা রাজশাহী থেকে বিমানে চড়েই ঢাকা ফিরলাম। ঢাকা থেকে রওনা দেওয়ার সময় জহিরউদ্দিন মাহমুদ মামুন বলেছিল, আকাশের যে অবস্থা তাতে নিরাপদে  উড়াল দেওয়া সম্ভব। এয়ারপোর্টে উপস্থিত ছিলেন তিনি। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে।

সেখানে আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব-শুভাকাঙ্ক্ষী সবাই অপেক্ষা করছে। শুরু হলো চিকিৎসা। প্রত্যেকেই কোমরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। বেশি আহত হয়েছি আমি। প্রচণ্ড ব্যথায় আমি অচৈতন্য হয়ে যাচ্ছি। মনে আছে- এই খবর শুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং  প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমার শারীরিক অবস্থার খবর নেওয়া হলো। 

পরদিন ১২ অক্টোবর। শুক্রবার। সন্ধ্যায় আমাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো বিশেষ বিমানে। 

তারপর চিকিৎসাকালীন সবকিছু থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল আমার। আমার সুস্থতার কারণেই এই ব্যবস্থা। চ্যানেল আই কীভাবে চলছে, বিজ্ঞাপন-অনুষ্ঠান এসবের কী অবস্থা। আমি নিজেও মানসিকভাবে একটু দূরে থাকলাম।

আমাদের দুর্ঘটনার সংবাদটির প্রচার বন্ধ থাকল। আমার জ্ঞান থাকাকালীন আমীরুলকে বলেছিলাম,

গোদাগাড়ী অনুষ্ঠান নিয়ে দ্রুত একটা প্রমোশনাল অনএয়ার করো। কারণ, কেন গোদাগাড়ী গেলাম এ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। অপু মাহফুজ তৈরি করে। কিন্তু কোনো রহস্যময় কারণে সেই প্রোমো প্রচারিত হলো না। এখন মনে হয়, এও যেন ষড়যন্ত্র! সেদিন যদি প্রমোশনাল এবং গোদাগাড়ীর অনুষ্ঠান নিয়ে সংবাদ ও স্বর্ণ-কিশোরী প্রচারিত হতো, তবে হয়তো এত ধোঁয়াশা তৈরি হতো না। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ অনেকেই আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, গোদাগাড়ী যাওয়ার কারণ কী? আমাকে বারবার বলতে হয়েছে, এটা নিছক হেলিকপ্টার ভ্রমণ নয়। একটি কমিটেড কাজের জন্য আমাদের যেতে হয়েছিল। 

শাইখ সিরাজ তখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছেন। পরে জেনেছি, হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার সব দোষ যেন স্বর্ণ-কিশোরীর। স্বর্ণ-কিশোরীর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গিয়েছি বলে এই দুর্ঘটনা। 

ব্যাপারটা আদৌ তা নয়। আমরা নিজেরাই হাজার হাজার কচিমুখের জন্য বৃষ্টি উপেক্ষা করে গোদাগাড়ী গিয়েছি। এজন্য স্বর্ণ-কিশোরী ফাউন্ডেশন কেন দায়ী হবে? চ্যানেল আইয়ের পর্দায় নিয়মিতভাবে প্রতি শনিবার 'স্বর্ণ-কিশোরী' অনুষ্ঠানটি প্রচার হতো। ওদের কার্যক্রম, কিশোরী স্বাস্থ্য, সুস্থ জীবন, ন্যায় ও আদর্শ এসব নিয়েই দর্শকপ্রিয় হয়েছিল অনুষ্ঠানটি। আমার অবর্তমানে শাইখ সিরাজ হয়তো তার কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে অনুষ্ঠান প্রচার স্থগিত করলেন। যুক্তি দিলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য লাইভ যাবে। তাই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেদিন স্বর্ণ-কিশোরী প্রচারের সময়ে বিএনপি-বিকল্পধারার সংবাদ সম্মেলন প্রচার করা হয়। বিএনপির সংবাদ সম্মেলন প্রচারের ব্যবস্থা কি আর কোনো পরিচালক দায়িত্ব নেবেন?

কারও একক সিদ্ধান্তে স্বর্ণ-কিশোরীর প্রচার বন্ধ থাকে। পরে জেনেছি সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যাচ্ছে- ১২ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে পরিচালকবৃন্দের কেউ চ্যানেল আইতে আসেননি। তাই অনুমান করি, কারও একক সিদ্ধান্তে অনুষ্ঠানটি বন্ধ করা হয়েছে। যে অনুষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ সংযুক্ত আছে। আমি টেলিফোনেও চেক করে দেখেছি, জনাব শাইখ সিরাজ কার কার সঙ্গে সেদিন কথা বলেছিলেন?

টিভি ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ পরের সপ্তাহের প্রচারও বন্ধ করে দিলেন। বলা হলো, স্বর্ণ-কিশোরীর ইমেজ ভালো নয়। তাই প্রচার বন্ধ রাখা হয়েছে। এই পুরো বিষয়টা আমাকে না জানিয়ে করা হলো। আমাকে জানানোর সামান্য প্রয়োজন বোধ করল না কেউ।

আমি আজও বুঝি না, কাউকে কিছু না জানিয়ে কোনো দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠানকে বন্ধ করা কি যৌক্তিক? টেলিভিশনে জড়িত আছি প্রায় পঞ্চাশ বছর। রাজনৈতিক কারণে বিটিভিতে শাইখ সিরাজের মাটি ও মানুষ বন্ধ হয়ে গেল।

কতটা বেদনাহত হয়েছিলেন শাইখ সিরাজ, তা কি ভুলে গেছেন তিনি? চ্যানেল আইতে সর্বস্ব শক্তি প্রয়োগ করে আবার শুরু হলো 'হৃদয়ে মাটি ও মানুষ'। চ্যানেল আইয়ের  কেউ কি ইচ্ছা করলেই 'হৃদয়ে মাটি ও মানুষ' বন্ধ করে দিতে পারেন? এটা কোন ধরনের সৌজন্যতা? স্বর্ণ-কিশোরীর প্রচার বন্ধ হয়ে গেল চ্যানেল আইতে। এই ফাউন্ডেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানটি অন্য কোনো চ্যানেলে প্রচারের প্রস্তাব পেয়েও প্রচার করেননি। অনুষ্ঠানটির সঙ্গে বিজ্ঞাপনসহ অনেক দেশি-বিদেশি সংস্থা জড়িত ছিল। কিন্তু প্রচার বন্ধ করার সময় এসব নিয়ে কেউ ভাবলেন না। অপমৃত্যু হলো এমন একটি স্বপ্নময় অনুষ্ঠান স্বর্ণ-কিশোরীর। 

পাদটীকা

শাইখ সিরাজের সঙ্গে আমার চল্লিশ বছরের বন্ধুত্ব। প্রায় ২৪ ঘণ্টা একসঙ্গে থাকি। আমি সহজেই প্রশ্ন করে স্বর্ণ-কিশোরী বন্ধের তথ্যগুলো জানতে পারতাম। কিন্তু যেহেতু স্বর্ণ-কিশোরী জাতীয় টেলিভিশনে প্রচারিত নিয়মিত একটি অনুষ্ঠান, সেজন্য একটি জাতীয় দৈনিককেই আমি বেছে নিলাম তথ্যগুলো জানানোর জন্য। প্রয়োজনে ১৩ অক্টোবরের পর স্বর্ণ-কিশোরী নিয়ে চ্যানেল আই ভবনে আরও কী হলো সেটাও আগামীতে কখনও লেখার চেষ্টা করব।

লেখক: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

মন্তব্য করুন