নন্দন

নন্দন


আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২০      

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হয়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা অনেক শিল্পীরই হয়েছে।  এক মহান নেতাকে তারা যেভাবে আবিস্কার করেছেন, তা নিয়ে বলেছেন দেশের কয়েকজন তারকাশিল্পী।  তাদের বয়ানে বঙ্গবন্ধুকে দেখার অভিজ্ঞতা...



সৈয়দ হাসান ইমাম

বঙ্গবন্ধু যখন কলেজে পড়তেন, তখন তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল। আমার বয়স তখন ১০ বছর। তখন আমি নানাবাড়ি বর্ধমানে থেকে পড়াশোনা করতাম। এর পরে নানা কর্মকাণ্ডে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। ঢাকায় এলাম, একুশে ফেব্রুয়ারিতে। শুরু হলো প্রবল আন্দোলন। পাকিস্তান আমলে যখন আন্দোলন চলছে, তখন গঠিত হলো বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ। আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ করে বেতার টেলিভিশন অচল করে দিলাম। পরে বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সরকার আমাদের হাতে বেতার-টেলিভিশন ছেড়ে দিল। তখন এটি ঢাকা বেতার, ঢাকা টেলিভিশন নামে ছিল। এভাবে ২৫ মার্চ চলে এলো। আমরা আক্রান্ত হলাম। বঙ্গবন্ধুও গ্রেপ্তার হয়ে গেলেন পাকিস্তানে। পরে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরলেন। তখন আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ হলো। অনেক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম করেছি। এরপর বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আমেরিকা চলে গেলাম ১৯৭৫ সালের জুন মাসের শেষের দিকে। ফিরে এলাম আগস্টের ৫ তারিখে। তখন তিনি আজ নেই তবে মনে পড়ে অনেক কথা। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সময় পাইনি। একটি ছবির ডিস্ট্রিবিউশন কাজে ব্যস্ত ছিলাম। ১৫ আগস্ট আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে হারালাম। আমরা আত্মগোপন করলাম। বঙ্গবন্ধু আমাকে অনেক নির্দেশ দিতেন। তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করতাম। তার একাগ্রতা ছিল অনেক বেশি। একটি লক্ষ্য তিনি সবসময়ই স্থির করতেন। কিছুতেই সেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতেন না। ধনী-দরিদ্র সকলকে বুকে জড়িয়ে তিনি ভালোবাসতেন। আমার মেয়ে সংগীতাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতেন। একদিন তার বাসায় আমার মেয়েকে নিয়ে গেলে এক পত্রিকার ফটোসাংবাদিককে ছবি তুলতে বললেন- 'এই পাগলা এই দিকে আয়, ছবি তোল।' আমাদের নতুন প্রজন্ম সবাইকে আপন করে নিতেন। অনেক গুণে গুণান্বিত ছিলেন। তার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞাও ছিল অসাধারণ। এসব গুণই আমাকে বেশ টানত। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে আজ আমরা গভীরভাবে স্মরণ করছি তার জন্মশতবর্ষের নানা আনুষ্ঠানিকতায়। তিনি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ, হাজারো বছর...।

ফারুক

নয় বছর বয়সে আমার মা মারা যান। তার মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছিলাম। বাড়িতে কেউ আদর করত না। ওই বয়সে আমরা ১০-১২ জন মিলে বেরিয়ে পড়তাম বিভিন্ন জায়গায়। হঠাৎ একদিন পল্টন ময়দানের দিকে যাচ্ছিলাম। তখন একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, 'আমার দেশের মানুষ না খেয়ে থাকবে, আমরা তো বসে থাকতে পারি না।' তখনই মনে হলো, এটা আমার কথা। কে বলে আমার মনের কথা। তখন আমরা হাঁটতে হাঁটতে সেখানে যাই। দেখি, একজন মানুষ চশমা পরা, বেশ লম্বা, সুদর্শন। বন্ধু-বান্ধবদের বললাম, এ মানুষটি কে? তখন পাশ দিয়ে একজন বলল, শেখ সাহেব। এই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। তার হাত ধরেই ছাত্রলীগে যোগদান করেছি। এরপর কতশতবার যে তার কাছাকাছি এসেছি, তার ইয়ত্তা নেই। মাঝেমধ্যে ৩২ নম্বরের বাড়ি গিয়ে বসে থাকতাম। একজন মানুষকে দেখলে যদি শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা করে, এটা তার বড় অর্জন বলে আমি মনে করি। বঙ্গবন্ধুও তেমনি ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র। তার কথা বলার ভঙ্গি মানুষকে আকর্ষণ করত। সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মিশতেন। বঙ্গবন্ধুর মুখে জয় বাংলা স্লোগান এখনও কানে বাজে। সবার মুখেই এখন এটি উচ্চারিত হচ্ছে। তাই যতবারই কণ্ঠে তুলি, ততবারই অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যাই। তার বক্তব্য সব জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। নেতা সব সময় মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। কারণ, বঙ্গবন্ধু আমার আত্মার সঙ্গে মিশে আছেন। তার জন্যই রাজনীতিতে আসা। তার ডাকে সাড়া দিয়েই যুদ্ধে হানাদারের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। এবার সেই মহান নেতার জন্মদিন বছরব্যাপী উদযাপিত হতে যাচ্ছে, এটা অন্য রকম আনন্দের।

কবরী

মুক্তিযুদ্ধের আগে আমি আমার দুই ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরছি। একই ফ্লাইটে সামনের দিকে বসা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নাম অনেক মাধ্যম থেকে আমি শুনেছি। পত্রপত্রিকায় পড়েছি; কিন্তু সামনাসামনি দেখা হয়নি। ফ্লাইট ঢাকায় পৌঁছার পর তিনি আমায় ডেকে বললেন, 'কবরী, আমরা চলে এসেছি। তুমি তোমার ছেলেদের ডেকে তোলো।' তিনি আমায় কত আপন করে ডাকলেন! তা এ জীবনে ভুলব না। রাজনীতিতে আদর্শ ও মূল্যবোধের চর্চায় এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সবাইকে আপন করে নেওয়ার এ অসাধারণ গুণ ছিল তার। তা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। সেখান থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়ানো। বঙ্গবন্ধুর দলে রাজনীতি করা ভাগ্যের ব্যাপার। রাজনীতিতে এসেছি কৌতূহলী হয়ে। জন্মশতবার্ষিকীতে মহান মানুষটির জন্য রইল শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

সাবিনা ইয়াসমিন

শেখ মুজিবুর রহমান। এক বটবৃক্ষের নাম, এক স্থপতির নাম, সর্বোপরি একটি দেশ তৈরির কারিগরের নাম। তাকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে কয়েকটি অনুষ্ঠান আয়োজনে। তার সংগ্রামী মুখখানা এখনও চোখে ভাসছে। এ মহান নেতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে বছরজুড়ে, এটা সত্যিই আনন্দের। চারদিকে এখন উৎসবের আমেজ। এ শুভক্ষণে কয়েকটি আয়োজনে গান করেছি। গাইতে পেরে মনে হয় ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলাম। স্বাধীনতার মশাল জ্বালিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার ডাকে দেশ স্বাধীন হয়েছে। একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। এর চেয়ে একজন মানুষের জীবনে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! বিশ্বের মানুষের কাছে আমাদের মর্যাদাই অন্যরকম। তবে এ বিশেষ বছরে আমার চাওয়া- শেখ মুজিবের আদর্শ ও চেতনা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

দিলারা জামান

বঙ্গবন্ধুকে অনেক দূর থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি। রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দিতে দেখেছি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এ মহান মানুষটি নিজের জন্য কিছুই করেননি। দেশ ও জাতির জন্য ছিলেন নিবেদিত। বিনিময়ে জনগণ তাকে বেশ ভালোবাসতেন। সবাইকে আপন করে নেওয়ার বেশ ক্ষমতা ছিল। তার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে দুটি সিনেমায় অভিনয় করেছি। এতে তার মায়ের চরিত্রে আমাকে দেখা যাবে। ভাবতে ভালো লাগছে ইতিহাসের একটি অংশ হতে পেরে। অভিনয়জীবনে আমি অনেক সিনেমায় কাজ করেছি। এটা আমার জীবনে অন্য মাত্রা যোগ করবে বলে বিশ্বাস করি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উৎসব চলছে। এ উৎসব ঘিরে আমার প্রত্যাশা অনেক। তবে যে কথাটি না বললেই নয়, বঙ্গবন্ধু সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। আমাদেরও একইভাবে মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। সব শ্রেণির মানুষ তাদের নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে যাবেন- এটি আশা করছি।