নন্দন

নন্দন


প্রচ্ছদ

একটি মুজিবরের থেকে...

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২০      

রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

একটি মুজিবরের থেকে...

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান [জন্ম :১৭ মার্চ ১৯২০, মৃত্যু :১৫ আগস্ট ১৯৭৫] ,ছবি :: নাসির আলী মামুন

লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দঁাঁড়ানো আর স্বাধীন দেশের মানচিত্র ছিনিয়ে আনতে বঙ্গবন্ধুর যে আহ্বান, তা নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য গান। যে গানগুলো একাত্তরে হয়ে উঠেছিল মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামের হাতিয়ার। স্বাধীনতার পরেও জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অগণিত গান। যেখানে উঠে এসেছে এক মহান নেতার অবয়ব। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গাওয়া গানে পাওয়া যায় শৃঙ্খল মুক্তির মহানায়কের প্রতিচ্ছবি

৭ মার্চ ১৯৭১। রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের ভিড়। প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন সবাই, কখন আসবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অবশেষে তিনি এলেন, উঠলেন মঞ্চে। আওয়াজ তুললেন- পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন, নিষ্পেষণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তার বজ্রকণ্ঠে ভেসে এলো স্বাধীনতার ডাক, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' এর পরই বদলে গেল প্রেক্ষাপট। ঐতিহাসিক সেই ভাষণের পর জেগে উঠল বীর বাঙালি। নেমে পড়ল স্বাধীন মানচিত্র ছিনিয়ে আনার লড়াইয়ে। বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি শব্দ, বাক্য আর প্রতিবাদী স্বর নিয়ে সংগীত যোদ্ধারাও নেমে পড়লেন কণ্ঠযুদ্ধে। তৈরি হতে লাগল একের পর এক গান। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গীতিকবিতায় সুর বসালেন অংশুমান রায়। কথা-সুরের সম্মিলন আর অনিন্দ্য গায়কিতে জন্ম নিল কালজয়ী এক গান, 'শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি/ আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি ...।'

এখানেই শেষ নয়, একই গীতিকবির আরেকটি গান 'আমরা সবাই বাঙালি'র মধ্যে উঠে এলো মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠের বিশ্ব কাঁপিয়ে দেওয়ার কথা। শ্যামল মিত্রের সুর করা এই গান ছাড়াও একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত সর্বাধিক গানে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কথা। মোর্শেদ তালহার কথা ও সুরের 'শোনেন শোনেন ভাই সবে, সত্য এ যে ঘটনা' ও এনামুল হকের লেখা ও আলতাফ মাহমুদের সুরে 'ধন্য জীবন ধন্য সুর ও সংগীত ধ্বনি' গানগুলোয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ, দেশপ্রেম, উদার মানসিকতা, নেতৃত্বসহ একজন মহান নেতার প্রতিকৃতি উঠে এসেছে। এ ছাড়া 'আমার নেতা তোমার নেতা শেখ মুজিব', 'রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি'সহ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বেশকিছু গানে বঙ্গবন্ধুর অবয়ব তুলে ধরা হয়েছে। তারও আগে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে শুরু হয়েছিল একের পর এক গানের সৃষ্টিকর্ম। 'জয় বাংলা জয় বাংলা বইলা রে', 'মুজিব বাইয়া যাও রে'সহ আরও কিছু গান তৈরি করেছিলেন হাফিজুর রহমান, রথীন্দ্রনাথ রায়সহ বেশকিছু গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। স্বাধীনতা-উত্তর বেশকিছু সময় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নতুন কোনো গান তৈরি হয়নি। সামরিক শাসনের জাঁতাকলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান করতে গিয়ে অনেকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন। কিন্তু সেই বৈরী পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতেও শিল্পীদের সময় লাগেনি। জাতির পিতার পক্ষে আওয়াজ ওঠাও দমিয়ে রাখা যায়নি। মলয় কুমার গাঙ্গুলী, সাবিনা ইয়াসমিনের মতো শিল্পী ঠিকই এই মহান নেতার স্মরণে গেয়ে উঠেছেন, 'যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই ...।'

মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরও অসংখ্য গান সৃষ্টি হয়েছে, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের কাছে জাতির পিতার আদর্শ, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, ব্যক্তিত্ব, কৃতিত্ব, গৌরব, সাদাসিধে জীবনযাপনসহ তার জীবনের নানা অধ্যায় তুলে ধরেছে। 'যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো', 'বঙ্গবন্ধু তুমি আমার সোনার বাংলা', 'বঙ্গবন্ধু তুমি ফিরে এলে', 'তুমি আমার বঙ্গবন্ধু', 'বাংলাদেশ', 'বঙ্গবন্ধু তুমি শ্রেষ্ঠ বাঙালি', 'মধুমতী নদীর ধারে টুঙ্গিপাড়া গ্রাম'সহ আরও অগণিত গান প্রকাশ পেয়েছে; যেখানে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি রূপে তুলে ধরেছেন গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও মিউজিশিয়ানরা।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রতিটি যুগে সৃষ্টি হওয়া গানগুলো নিয়ে কণ্ঠশিল্পী শাহীন সামাদ বলেন, 'যাকে আমরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে মানি, তাকে নিয়ে প্রতিটি যুগে নানা ধরনের কাজ হবে- এটাই বিশ্বাস করি। বঙ্গবন্ধু সেই মহান নেতা, যার ডাকে সাড়া দিয়ে বীর বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র ছিনিয়ে এনেছে। একটি দেশের জন্ম যার হাত ধরে, তাকে নিয়ে কথা সংগীত ভুবনের মানুষরা বলবেই। আমরা যেমন একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতারের বিভিন্ন গানে তার নেতৃত্ব, মুক্তির সংগ্রামের কথা বলেছি, একইভাবে এখনও নতুন প্রজন্মের কাছে এই মহান নেতার কথা বলছি। ভালো লাগার বিষয় এই যে, নতুন প্রজন্মের অনেকে জাতির পিতাকে নিয়ে গান করছেন। যেখানে ইতিহাসের নানা অধ্যায় উঠে এসেছে। এতে করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নতুন প্রজন্ম অনেকে কিছু জানার সুযোগ পাচ্ছে।' একই রকম কথা শোনা গেছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আরেক কণ্ঠসৈনিক রফিকুল আলমের কাছে। তিনি বলেন, 'গানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবন তুলে ধরার চেষ্টা থেমে নেই। একসময় আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানে তার নেতৃত্ব, বজ্রকণ্ঠে লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার কথা বলেছি। এখন নতুন করে এ প্রজন্মের সঙ্গে মিশে গিয়ে গানে গানে তুলে ধরছি তার কৃতিত্ব, গৌরব, নেতৃত্বের আদ্যোপান্ত, সাদাসিধা জীবন, দর্শন, ভবিষ্যৎ ভাবনা, দেশপ্রেম এবং মৃত্যুর আগে ও পরের প্রতিটি বিষয়। মুজিব শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে আমরা কিছু গানের আহ্বান করেছিলাম। সেখানে ২২০০ গান জমা হয়েছিল, যেখানে বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠত্বের কথা নানাভাবে স্থান পেয়েছে। সেখানে থেকে গান নির্বাচন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এতকিছু বলার আছে, যা গুটিকয়েক গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বাইরে আমি নিজেও ২২টি গান গেয়েছি, যেখানে বঙ্গবন্ধুর কথা উঠে এসেছে। ক'দিন আগেও একটি গান রেকর্ড করেছি, যেখানে বিশ্বনন্দিত আরেক নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়ের সঙ্গে যে তুলনা করেছেন, তার কথা উঠে এসেছে। আমি বিশ্বাস করি, এভাবে যুগ যুগ ধরে লাখো শিল্পীর কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর কথা সুরের আবিরে ছড়িয়ে পড়বে।' বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক আপেল মাহমুদের কথায়, 'বঙ্গবন্ধু শুধু নেতা নন, একটি দেশ ও জাতির স্বাধীনতার প্রতীক। তাকে নিয়ে সবাই বলবে, লিখবে, গাইবে- এটাই স্বাভাবিক। শতাব্দী পেরিয়েও তাকে নিয়ে আয়োজন কখনও শেষ হওয়ার নয়।' সাবিনা ইয়াসমিনের কথায়, 'বঙ্গবন্ধু চিরকাল বাঙালি এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছেন, থাকবেন। তার জন্য গাইতে পেরে নিজেকে ধন্য বলেই মনে করি।' বরেণ্য সুরকার সুজেয় শ্যামের কথায়, 'একটা সময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলা, গান গাওয়া রুখে দেওয়ার যে চেষ্টা ছিল, তা পরবর্তী প্রজন্ম রুখে দিয়েছে, এটা আশার কথা। নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান করছে, যা পরবর্তী প্রজন্মকে এই মহান নেতা সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেবে, এই বিশ্বাস রাখি।' স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আরেক কণ্ঠসৈনিক রথীন্দ্রনাথ রায় বলেন, ''এখন অনেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান করছেন। কিন্তু দেখার বিষয় হলো, সেখানে স্বার্থ কতটা জড়িত। আমরা যে আবেগ নিয়ে গান করেছি, তা অনেকের মধ্যে চোখে পড়ে না। মনে আছে, 'বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে'- এমন একটা খবর শুনে আমরা কতটা উদ্বেগের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন রাত ২টা বাজে, তার পরও প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে গানকে বেছে নিয়েছিলাম। উঠেপড়ে লেগেছিলাম এই মহান নেতাকে নিয়ে গান তৈরিতে। 'আমার নেতা তোমার নেতা', 'মুজিব বাইয়া যাও রে', 'জয় বাংলা জয় বাংলা বইলা রে'সহ আরও অনেক গান গেয়েছি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও আন্দোলনের মাঠে। ঊনসত্তর থেকেই আমরা মুজিব নিয়ে নানা গান বেঁধেছি। মুজিবের বজ্রকণ্ঠে শোনা, 'তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকো'- এই কথা শুনে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমরা যারা গানের মানুষ, তারা গানকেই অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম। বাকিরা চলে গিয়েছিল সম্মুখ সমরে। এই যে আবেগ, মুক্ত স্বাধীন দেশ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা- এর বাইরে আর কোনো স্বার্থ আমাদের ছিল না। এখনও সেভাবেই নিঃস্বার্থভাবে গান করে যেতে হবে। কারণ বঙ্গবন্ধু শুধু গানের বিষয় বা চরিত্র নন, একটি জাতির পিতা।'' তার মতো একই রকম কথা শোনা গেছে স্বাধীন বাংলা বেতারের কণ্ঠযোদ্ধা, গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীরের কণ্ঠে। তিনি বলেন, 'ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা বহুবার হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আত্মপরিচয়, কীর্তি, ত্যাগ, দেশপ্রেম, সংগ্রাম- কোনো কিছুই লুকিয়ে রাখা যায়নি। আমরা যারা স্বাধীনতার পক্ষের প্রকৃত সৈনিক, তাদের মাধ্যমেই সত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে, আগামীতেও হবে। গানে গানেও সে কথা বলার চেষ্টা করেছি, আগামীতেও করে যাবো। 'মুজিব আমার স্বপ্ন সাহস, মুজিব আমার পিতা'- এই গানের মতো করেই সত্য জ্বলজ্বল করবে- এটাই আমি বিশ্বাস করি। তাই নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে যখন মুজিববন্দনা শুনি, তখন আশার আলোয় বুকটা ভরে যায়। তাদের গানের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীরা পরাস্ত হবে, যুগ যুগ ধরে মুজিবকে নিয়ে গান তৈরি হবে, তার কীর্তিগাথা রচিত হবে- এটাই আমার প্রত্যাশা।'