নন্দন

নন্দন


ভালো লাগে জোছনা রাতে...

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২০      

আল নাহিয়ান

'ব্যান্ডের সবাই নানা কাজে ব্যস্ত। শত ব্যস্ততার মাঝেও আমরা ১৮টা গানের কাজ শেষ করেছি। কিন্তু সমস্যা হলো, এই অ্যালবাম বা এর গানগুলো প্রকাশ করার মাধ্যম খুঁজে পাচ্ছি না। এখন একটি করে গানের ভিডিও নির্মাণ করে যেভাবে প্রকাশ করা হয়, আমরা সেভাবে গান প্রকাশে ইচ্ছুক নই। গান বিষয়টা শোনা ও অনুভবের। কিছু দৃশ্য তৈরি করে ক্যামেরাবন্দি শেষে তা গানে জুড়ে দিয়ে প্রকাশ করার ব্যাপারটা একদম সমর্থন করি না।' রেনেসাঁর কণ্ঠশিল্পী ও কি-বোর্ডিস্ট নকীব খানের মুখে এ কথা শুনে ভক্তরা হতাশ হতেই পারেন। কেননা, ১৪ বছর প্রতীক্ষার পর রেনেসাঁভক্তরা আশার বাণী শুনেছিলেন তাদের পঞ্চম অ্যালবাম প্রকাশের খবরে। কিন্তু হঠাৎ কেন তার প্রকাশনা পিছিয়ে গেল, সে প্রশ্নই এখন অনেকের। তাই নকীব খানের কাছে প্রশ্ন ছিল, পাঁচ বছর ধরে যে অ্যালবামের কথা বলছিলেন, তা কি এ বছরও প্রকাশ পাবে না? এর উত্তরে নকীব খান বলেন, 'অ্যালবামের কাজ শেষ। এখন শুধু প্রকাশনার মাধ্যম খুঁজে নেওয়া বাকি। ওই যে বললাম, একটি করে গানের ভিডিও তৈরি করে গান প্রকাশের বিষয়টি আমরা সমর্থন করি না। তাই ভিন্ন প্রকাশনার জন্য অন্য কোনো উপায় আছে কিনা, সেটাই দেখছি। তবে ভক্তদের এটুকু আশ্বাস দিতে পারি, তাদের আর প্রতীক্ষায় রাখব না। এ বছরেই রেনেসাঁর পঞ্চম অ্যালবাম তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব।'

নকীব খানের এ কথায় একটা বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেল, শিগগিরই রেনেসাঁর পঞ্চম অ্যালবাম প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সে সুবাদে আমরাও আশা করতে পারি, 'ভালো লাগে', 'ও নদীরে', 'আচ্ছা কেন মানুষগুলো', 'রংধনু', 'বেঁচে থাকা নিয়ে যাদের যুদ্ধ', 'আজ যে শিশু', 'তৃতীয় বিশ্ব', 'চৌকিদার', 'হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয়', 'স্বপ্ন ভরা সুর', 'জানি বদলে পারো', 'একুশ শতকের গ্রাম-বাংলা'র মতো আরও কিছু ভিন্ন আঙ্গিকের গান উপহার পাব। এমন প্রত্যাশা তাদেরই কাছে থাকে, যারা সংগীতের অনিন্দ্য পরিবেশনা দিয়ে হৃদয় স্পর্শ করেছেন। রেনেসাঁ তেমনই একটি ব্যান্ড, যাদের পরিবেশনা অন্য যে কোনো ব্যান্ড থেকে আলাদা। মেলোডি গানে কত বৈচিত্র্য তুলে ধরা যেতে পারে, তার প্রমাণ বহুবার দিয়েছে রেনেসাঁ। এ কারণেই ব্যান্ডের পঞ্চম অ্যালবামের আয়োজন নিয়ে ভক্তদের এত কৌতূহল। নকীব খানের কাছে তাই জানতে চাওয়া হয়েছিল, এবারের আয়োজনে কতটা ভিন্নতা তুলে ধরা হচ্ছে? নকীব খান বলেন, 'যে ধরনের গান রেনেসাঁকে আলাদা এক পরিচিতি এনে দিয়েছে, সেই মেলোডিপ্রধান গান দিয়েই অ্যালবাম সাজানোর পরিকল্পনা করেছি। কিন্তু মেলোডিকে প্রাধান্য দিলেও কথা, সুর, সংগীতে ভিন্নতার ছাপ তুলে ধরার চেষ্টা শুরু থেকেই ছিল। জনপ্রিয়তার জন্য নিজস্বতাকে দূরে ঠেলে দিতে চাই না। ভক্তদের প্রত্যাশা পূরণ ছাড়াও আত্মতৃপ্তির জন্য গান করি। তাই নিরীক্ষাধর্মী কাজ করলেও নিজস্বতা ধরে রেখেই গান করতে চেয়েছি। জনপ্রিয়তার মোহে তাই কখনও দিক বদল করিনি।' নকীব খানের এ কথায় স্পষ্ট, রেনেসাঁ তাদের গানের স্বকীয় ধারা থেকে বেরিয়ে আসেনি। যে ধরনের গান শ্রোতা তাদের কাছে শুনতে চেয়েছে বারবার, তারই ছাপ থাকছে পঞ্চম অ্যালবামের গানগুলোয়। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালে যখন স্বনামে রেনেসাঁ তাদের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করে তখন অনেকেই স্বীকার করেছেন, এমন একটি অ্যালবামের প্রতীক্ষায় ছিলেন তারা। ব্যান্ড অ্যালবাম মানেই রক, হেভি মেটালের ঝাঁঝালো সুর-ঝংকার- এ তত্ত্বেও বিশ্বাসী নন তারা। এমন নয় যে, মেলোডি গান অন্যান্য ব্যান্ড তৈরি করেনি। অনেক ব্যান্ডই মেলেডি গান করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে রেনেসাঁর গানগুলো কোনোভাবেই মেলানো যায় না। এখানেই রেনেসাঁর স্বকীয়তা। তার প্রমাণ আরও একবার পাওয়া গেছে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত 'তৃতীয় বিশ্ব' অ্যালবাম থেকে। এই অ্যালবামের গানগুলোয় বিশ্বমানবতা, শিশু অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের যাপিত জীবনের চিত্র থেকে শুরু করে ভালোবাসার কাব্যকথা উঠে এসেছে। এর বাইরেও রেনেসাঁ চেষ্টা করেছে স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর। তার ফলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালজয়ী কিছু গান নিয়ে প্রকাশ করেছে 'একাত্তরের রেনেসাঁ' অ্যালবামটি। ২০০৪ সালে প্রকাশিত 'একুশ শতকে রেনেসাঁ' অ্যালবামেও ছিল ভিন্নতার ছাপ। শহর, নগর, গ্রামীণ জনপদের জীবনচিত্র ছিল অ্যালবামের বেশ কিছু গানে। রাজনীতির প্রকৃত দৃশ্যপট নিয়েও গান করেছে দলটি। এ ছাড়াও মাটিঘেঁষা মানুষের কথা বলেছে গানে গানে। আদিবাসীদের কথা, সুরের ভিন্ন আঙ্গিকের গানের পরিবেশনাও ছিল চতুর্থ অ্যালবামে। যে জন্য রেনেসাঁর গান শুধু মুগ্ধতার আবেশে শ্রোতাদের ভরিয়ে রাখেনি; যাপিত জীবন, দেশ এবং সমকালীন বাস্তবতা নিয়েও ভাবিয়েছে। যে জন্য আমরা আশা করতেই পারি, তাদের পঞ্চম অ্যালবামেও থাকবে ভিন্ন ধাঁচের গান। যার জন্য শ্রোতারা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রতীক্ষায় আছেন। রেনেসাঁর গান নতুন প্রজন্মের সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে ছাপ ফেলবে- এমন আশা করা ভুল হবে না।