নন্দন

নন্দন

আমি তোমাদেরই লোক

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২০

আমি তোমাদেরই লোক

ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস, ছবি ::রফিকুল ইসলাম রাফ

ফারুক মাহফুজ আনাম। যিনি জেমস নামেই পরিচিত। ভক্তদের কাছে গুরু। জেমস মানেই তারুণ্যের উন্মাদনা। তার বাবরি দোলানো গানের তালে মেতে ওঠে যুবক মন। তার কনসার্টগুলোতে জেগে ওঠে ভালোবাসার উদ্দীপনা। আগামীকাল খ্যাতিমান এই শিল্পীর জন্মদিন। তাকে নিয়ে লিখেছেন মীর সামী

প্রেমিকার কাছ থেকে চিঠি এসেছে বলে যিনি যমদূতকে ফিরিয়ে দিতে পারেন! সেই তিনিই আবার হারানো প্রিয়াকে জানিয়ে দেন, পথে দেখা হলে যেন প্রশ্ন না করে, কেমন আছ? আবার দুঃখিনীকে দুঃখ করতে বারণও করেন। হৃদয়ের আবেগ নিয়ে এ রকম অসংখ্য গান গেয়ে কোটি মানুষের মন কেড়েছেন জেমস। তাই তো পপসম্রাট আজম খানের পর ভক্তরা ভালোবেসে গুরুর আসনটি তাকে দিয়েছেন। জেমস মানেই তারুণ্যের উন্মাদনা। তার বাবরি দোলানো গানের তালে মেতে ওঠে যুবক মন। তার কনসার্টগুলোতে জেগে ওঠে ভালোবাসার উদ্দীপনা। জেমস এমনই। জেমস মানে উন্মাতাল সুর। আমাদের নগরবাউল আর ভক্তদের কাছে 'গুরু'। তাইতো তিনি ভক্তদের গানে গানে বলেছেন, 'আমি তোমাদেরই লোক'। তিনি যখন মঞ্চে ওঠেন তখন তাকে যতটা কাছের মনে হয়, মঞ্চ ছাড়তেই হয়ে যান ততটা দূরের। কেমন আছেন এদেশের রক লিজেন্ড জেমস জানতে চাইলে বলেন, 'আমি ভালো আছি।'

করোনার এই সময়ে ঢাকার নিজস্ব ফ্ল্যাটেই সময় কাটাচ্ছেন জেমস। হোম স্টুডিওতে নিয়মিত জ্যামিং করছেন। অপেক্ষায় আছেন আবারও মঞ্চে ওঠার। বেশ কয়েক বছর ধরে নতুন গান প্রকাশ থেকে জেমস নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। তারপরও দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত, জনপ্রিয় আর দামি মঞ্চতারকা হিসেবে নিজের অবস্থান অটুট রেখেছেন তিনি। নতুন গান প্রকাশ না করলেও গত মাসে নিজের ফেসবুক পেজে নিজের নতুন লুকের ছবি প্রকাশ করে ভক্তদের চমকে দিয়েছেন জেমস। রফিকুল ইসলাম রাফের তোলা নতুন লুকের এ ছবিটি প্রকাশের সূত্র ধরে অনেকেই জল্পনা করছেন জেমসের নতুন গানের প্রচ্ছদের চমক হিসেবে। জানালেন, 'এমন লুকের একটাই কারণ, চলমান ঘরবন্দি জীবনের একটা প্রতিচ্ছবি টাইমলাইনে ধরে রাখা। এর বেশি কিছু নয়।' অনেক দিন হলো আপনার নতুন গান নেই? জবাবে জেমস বললেন, 'করোনাকাল শেষ হলে নতুন গান প্রকাশ হবে অবশ্যই।'

জেমসের গান আর ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি কথাই যেন ভক্তের জন্য এক একটি বাণী। ভক্তদের নিয়ে জেমস বলেন, 'এক জীবনে অগণিত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। ভালোবাসা পেতে কার না ভালো লাগে! এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। এটাও ঠিক, এই ভালোবাসা পাওয়ার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। অনেক ওঠানামা ছিল। কিন্তু হাল ছাড়িনি। গান করেছি, এটাই ছিল আমার আনন্দ, এটাই ছিল আমার ভালো লাগা-ভালোবাসা। তারপর কী হয়েছে, না হয়েছে তা নিয়ে ভাবিনি। কিছু না হলেও গানই গাইতাম।' ভক্তরা যখন 'গুরু' বলে চিৎকার করে, তখনকার অনুভূতি কী? জবাবে তিনি বলেন, 'তখন আরও উৎসাহ আর অনুপ্রেরণা পাই। তাদের এই চিৎকার অসীম শক্তি জোগায়। তারা আছে বলেই তো আমি আছি। ওরা না থাকলে আমি কিছুই না।'

জেমসের জীবনকাহিনি যেন এক চলচ্চিত্রের গল্প। বোহেমিয়ান জীবন, খ্যাতি, প্রেম, বিচ্ছেদ, আপামর মানুষের আইকন হয়ে ওঠা। তাইতো তার কাছে জানতে চাই জীবনের সংজ্ঞাটা কী? কিছুটা সময় চুপ থেকে বলেন, 'সত্যিই তো জীবন মানে কী? জীবনের সংজ্ঞা এখনও খুঁজে ফিরছি এই আমি।'

এই জীবনের সংজ্ঞা খোঁজার তাগিদেই একটা সময় প্রিয় শহর চট্টগ্রামের মায়া ত্যাগ করে ১৯৮৬ সালে ঢাকায় এসে প্রথম ব্যান্ড অ্যালবাম 'স্টেশন রোড' প্রকাশ করেন। এরপর 'অনন্যা' [১৯৮৭]। তারপর 'জেল থেকে বলছি'। ১৯৯৫ সালের 'পালাবে কোথায়' অ্যালবামটি জেমসকে যেন আরও রহস্যময় করে তোলে। তখন থেকেই জেমস এক উন্মাদনার নাম হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালে 'মান্নান মিয়ার তিতাস মলম' অথবা কবি শামসুর রাহমানের 'সুন্দরীতমা আমার'। 'দুঃখিনী দুঃখ করোনা' অ্যালবামটি এতটাই শ্রোতাপ্রিয়তা পায় যে দেশের আপামর প্রেমিক-প্রেমিকার মনে জেমস স্থায়ীভাবে স্থান করে নেন। স্থান করে নেন পাড়ার আড্ডাবাজদের মনে। সেই সময়ের সেরা সব গীতিকার জেমসের জন্য আলাদাভাবে গান লিখতেন। কেননা জেমসের গান শুধু সুরনির্ভর নয়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি কাব্যনির্ভর। গানের কথায় গভীরতা ছিল বলেই জেমস অনন্য, জেমস অন্যদের চেয়ে আলাদা।

আগামীকাল খ্যাতিমান এই কণ্ঠশিল্পীর জন্মদিন। প্রতি বছরেই এ দিনটি জেমসের শুরু হয় ভক্তদের শুভেচ্ছা, ভালোবাসা আর উপহার পাওয়ার মধ্যে দিয়ে। নগর বাউলের ভক্ত-অনুরাগীরা তার জন্মদিনে কখনও বিলবোর্ড বানিয়ে, ট্রাকভর্তি কেক নিয়ে রাজধানী চষে বেড়িয়েছেন। ব্যানার, পোস্টার আর শত শত প্রতিকৃতি বানিয়েও দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন ব্যান্ডসংগীতের গুরুখ্যাত এই শিল্পীর জন্মদিনের খবর। ভক্তদের এসব আয়োজন কখনও পাগলামি, আবার কখনও বাড়াবাড়ি বলেও মনে করেন জেমস। বরাবরের মতো এবারের জন্মদিনেও নিজ থেকে কোনো আয়োজন করছেন না জেমস। তিনি বলেন, 'বরাবারের মতো এবারেও জন্মদিনে কোনো আয়োজন করছি না। তারপরও সবার ভালোবাসা আর শুভেচ্ছায় দিনটি কাটে।' নওগাঁয় জেমসের জন্ম হলেও তার শৈশব কেটেছে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে। তার পরিবারের কেউ কখনও গানের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ফলে বড় ছেলে জেমসের গায়কজীবন চাননি বাবা ড. মোজাম্মেল হক আর মা জাহানারা খাতুন। তাইতো অভিমানী জেমস ঘর ছেড়ে, পথে নেমেছিলেন নতুন কিছুর আশায়। সেই সময় তার নতুন ঠিকানা হয় 'আজিজ বোর্ডিং'। চট্টগ্রামের কদমতলীর পাঠানটুলি রোডে মতিয়ার পুলের আজিজ বোর্ডিংয়ের 'বারো বাই বারো'র একটি ছোট্ট ঘরে চলে তার সংগ্রামী জীবন। বোর্ডিংয়ের সামনের এক ছোট্ট রেস্তোরাঁয় খাওয়া আর সন্ধ্যায় হোটেল আগ্রাবাদের নাইট ক্লাবে গানবাজনা। আজিজ বোর্ডিং নিয়ে এখনও স্মৃতিকাতর হন জেমস। তার ভাষায় 'গানের টানে, প্রাণের টানেই ঠাঁই হয়েছিল সেখানে। গান, আড্ডা আর যা-ই হোক না কেন সব ওখানেই। আজিজ বোর্ডিংয়ের দিনগুলো কখনও ভুলব না।'

২০০৬ সালে বলিউডের 'গ্যাংস্টার' ছবির 'ভিগি ভিগি' গান দিয়ে হয়েছেন ভারতের কোটি মানুষের প্রিয় শিল্পী। হয়েছেন ভারতের একমাত্র মুসলিম রকস্টার। এরপর 'ওহ লামহে' [লাইফ ইন এ মেট্রো] ছবিতেও কণ্ঠ দিয়ে চমকে দিয়েছেন পুরো ভারতবাসীকে। সর্বশেষ 'ওয়ার্নিং' সিনেমায় টাইটেল সং 'বেবাসি' ধারাবাহিকতা ঠিক রাখার সঙ্গে নিজের জনপ্রিয়তাকেও ঊর্ধ্বমুখী করছেন।

অন্য আট-দশজন মানুষের মতো করেই জেমস তার অবসর সময় কাটান। তার ভাষায়, 'অবসরে সবাই যা করে আমিও তাই করি। টেলিভিশন দেখি, বই পড়ি, ছবি তোলার একটা নেশা আছে। যখন সময় পাই ছবি তুলি- এভাবেই কেটে যায় সময়।' ভক্তরা খুব ভালো করেই জানেন আলোকচিত্রী হিসেবেও দারুণ জেমস। ফেসবুকে রয়েছে তার তোলা অনেক ছবি। তার ফটোগ্রাফির বিষয় 'মডেল, নাগরিক জীবন ও প্রকৃতি'। তিনি বলেন, 'অনেক সময় অবসরে কিছু করার থাকে না। তখন ক্যামেরা নিয়ে নেমে পড়ি মাঠে। ছবি তোলার একটা অদ্ভুত নেশা আছে। যা শুধু যারা ছবি তোলেন তার ভালো বলতে পারবেন।' নিজের ফেলে আসা জীবনকে জেমস কীভাবে দেখেন? জেমস বললেন, 'ঘুরে তাকানোর মতো সময় নেই। আরও অনেক কাজ করতে চাই। তবে হ্যাঁ, কোনো একসময় নিশ্চয়ই এই চলার পথে একবার ঘুরে দেখব জীবনটাকে। যে জার্নিটা করেছি, চলার পথের স্ট্রাগল ফিরে দেখতে চাই। নাইট ক্লাবে গাইতাম, আবার বিয়ের অনুষ্ঠানেও গাইতে হতো। এই এক জীবনে সবই আনন্দের সঙ্গে করেছি।' পরিশেষে গানের মতো 'তারায় তারায় রটে' যাক জেমসের জীবনের সফলতা। সেই সঙ্গে তার হাত ধরেই বাংলা ব্যান্ড গান রটে যাক বিশ্বজুড়ে।