নন্দন

নন্দন

প্রচ্ছদ

যত দূরে থাকো...

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২০

যত দূরে থাকো...

ন্যান্সি

অনিন্দ্য কণ্ঠ আর অনবদ্য গায়কী দিয়ে ন্যান্সি জয় করেছেন গানের ভুবন। ভক্তরা তাই প্রতিনিয়ত প্রতীক্ষায় থাকেন তার নতুন গানের। ন্যান্সির শিল্পীজীবনের নতুন অধ্যায় নিয়ে এ আয়োজন। লিখেছেন রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

ক্যারিয়ারের কথা ভেবে অনেকে রাজধানীতে গড়ে নিয়েছেন নতুন ঠিকানা। কিন্তু নন্দিত শিল্পী ন্যান্সি বেছে নিয়েছেন উল্টো পথ। রাজধানী নয়, বসবাসের জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন ময়মনসিংহকে। যখন গানের রেকর্ডিং থাকে তখনই শুধু ছুটে আসেন ঢাকায়। এতে তার ক্যারিয়ার যে বাধার মুখে পড়েছে তা বলা যাবে না। নিজের কাজ নিয়ে ন্যান্সি এতটাই সচেতন যে, দূর-দূরান্তের পথ পেরিয়ে এসেও ঠিক সময়ে নিজের কাজটি করে যাচ্ছেন। কোনো ক্লান্তির ছাপ তার চোখেমুখে খুঁজে পাওয়া যায় না। এটা সত্যি অবাক করা বিষয়। শুরুতেই তাই ন্যান্সির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ঢাকা টু ময়মনসিংহ, ময়মনসিংহ টু ঢাকা- এভাবে কাজ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী? এর জবাবে ন্যান্সি বলেন, 'ক্যারিয়ারই সব নয়, ঘর-সংসারের কথাও তো ভাবতে হবে। পেশার কারণে আমার স্বামীকে ময়মনসিংহে থাকতে হয়ে, স্থানীয় সিটি করপোরেশনে যাবতীয় কাজ, সেজন্য চাইলেও ঢাকায় তার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। আমার কাজটা ঢাকায় না থাকলে যে থেমে থাকবে, তা তো নয়। ঢাকা-ময়মনসিংহ যাওয়া-আসার মধ্য দিয়েই আমার কাজগুলো বাধাহীনভাবে করে যেতে পারছি। সবদিক সামাল দিয়ে যদি এভাবে গান করে যেতে পারি, তাহলে ক্ষতি কী? এজন্য ঢাকায় থাকতেই হবে, এটা মনে করি না।' ঘর-সংসার সামলে এতটা দূরত্ব অতিক্রম করে, ঠিক সময়ে স্টুডিওতে পৌঁছে যান- এটা সম্ভব হয়? ন্যান্সি বলেন, 'সময় জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিস, যার অপচয় কোনোভাবেই করা উচিত বলে মনে করি না। এই ভাবনা আমার শুরু থেকেই ছিল। যে জন্য প্রতিটি কাজের জন্য সময় নির্ধারণ করে নিই। আমার যদি রেকর্ডিং থাকে ৩টায়, তাহলে আমি নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগে হলেও স্টুডিওতে গিয়ে বসে থাকি। যাতে কেউ টেনশনে না থাকেন। আমি মনে করি, এটা চাইলে সবার পক্ষেই করা সম্ভব, শুধু মনের ইচ্ছা জোরালো হতে হবে।' ন্যান্সির এ কথা যে মিথ্যা নয়, তার বহু উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। তাই ন্যান্সির বারবার রাজধানীতে এসে নতুন গানের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠা। নন্দিত এই শিল্পীর কাছে তাই জানতে চাওয়া হয়েছিল, লকডাউনের পর নতুন কী কাজ নিয়ে এখন ব্যস্ত? ন্যান্সি জানালেন, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অনুপমের দশটি রিমেক গানের একটি সিরিজের কাজ চলছে। এর মধ্যে একটি গানের রেকর্ড হয়েছে। বাকি নয়টি একে একে রেকর্ড করা হবে। পাশাপাশি মৌলিক গানের কাজ তো চলছেই। কিছুদিন আগে সিএমভির ব্যানারে 'এমন একটা মন' শিরোনামের গানে কণ্ঠ দিয়েছি। এরপর শফিক তুহিনের সুরে আরেকটি গান করেছি। সামনে আরও কিছু গান করব। লকডাউনের সময় অনেকের মতো আমিও ঘর ছেড়ে বাইরে যাইনি, নতুন গানও রেকর্ড করা হয়নি। এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় আবার কাজ শুরু করেছি।' হঠাৎ রিমেক গান কেন? এর জাবাবে ন্যান্সি বলেন, 'সিনেমার পুরোনো অনেক গান আছে যেগুলো এখনও শ্রোতারা শুনতে চান। নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে গানগুলো নতুন করে তুলে ধরতে পারলে, ভালো লাগবে বলে আমার বিশ্বাস। পুরোনো শ্রোতাদের ভালো লাগানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের জন্য রিমেক গান করছি। তবে মৌলিক গান থেকে কখনও দূরে থাকিনি, এটা ধারাবাহিকভাবে করে যাব। কারণ, আমার শিল্পী পরিচিতি গড়ে উঠেছে মৌলিক গানের মাধ্যমে। মৌলিক গান ছাড়া শিল্পী সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন বলেই আমি মনে করি। তাই একক গান বা অ্যালবামের পাশাপাশি সিনেমা, নাটকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মৌলিক গানকেই গুরুত্ব দিই।' ন্যান্সির এই কথায় স্পষ্ট, শিল্পী হিসেবে তিনি নিজস্ব পরিকল্পনা নিয়েই কাজ করেন। এমন কি গানের ভিডিও এবং স্টেজ শো নিয়েও তার ভাবনার জগৎ অনেকের চেয়ে আলাদা।

তিনি বলেন, 'আমি কিন্তু প্লেব্যাক ও অ্যালবামে গান গাওয়া শুরু করার পরও কয়েক বছর স্টেজ শো করিনি। ২০০৯ সাল থেকে আমার স্টেজ পারফরমেন্স শুরু হয়েছিল। নিয়মিত স্টেজ শো করতেই হবে, এটাও মনে করি না। প্রকাশ মাধ্যম যেটাই হোক, শ্রোতা সবসময় আমার গান শুনতে চেয়েছেন। স্টেজ ছাড়া আমার গান শুনবেন না- এটা কখনও মনে হয়নি। গানের ভিডিও প্রসঙ্গে শুরু থেকেই আমার কিছুটা অনীহা ছিল। একটি গানের সঙ্গে ভিডিওতে কিছু গল্প জুড়ে দিয়ে তা প্রকাশ করা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয় না। কারণ, গান হলো অনুভবের বিষয়। যখন কোনো গান কারও ভালো লাগে, তখন কিছু দৃশ্যপট মনের পর্দায় আপনা-আপনি ভেসে ওঠে। এর জন্য আলাদা করে ভিডিও নির্মাণ করার প্রয়োজন পড়ে না। তবে সিনেমার বিষয়টা আলাদা। সেখানে চরিত্র ও গল্পের ওপর ভিত্তি করে গান তৈরি হয়। যেজন্য গান এবং দৃশ্য দুটোই গুরুত্ব পায়। অ্যালবাম বা একক গানের জন্য এটা জরুরি বলে মনে করি না।' তার এই কথার সঙ্গে হয়তো অনেকে একমত হবেন। একটি বিষয়ে হয়তো দ্বিমত থাকতে পারে, তাহলো জুটিপ্রথা। গানের জন্য জুটি গড়া জরুরি? এর উত্তরে ন্যান্সি বলেন, 'এটা নির্ভর করে শ্রোতার ভালো লাগার ওপর। হাবিবের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া অনেক গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শ্রোতা বারবার আমাদের কণ্ঠে দ্বৈত গান শুনতে চান। এর কারণ আমার কাছে মনে হয়, শুরুতেই জুটি হিসেবে আমরা শ্রোতার মনে ছাপ ফেলতে পেরেছিলাম। যেজন্য গীতিকার, সুরকার, সংগীতায়োজক থেকে শুরু করে অডিও প্রযোজক ও সিনেমা নির্মাতারা চেয়েছেন, আমরা যেন একসঙ্গে আরও গান করি। তাদের চাওয়া থেকেই একের পর এক গান গেয়ে যাওয়া।' তার এ কথায় বোঝা গেল হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে জুটি গড়ে ওঠার কারণ। এখন কথা হলো, যার সঙ্গে এত গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তার সঙ্গে অনেকদিন কোনো কাজ না করার কারণ কী? এ নিয়ে ন্যান্সি বলেন, 'আমরা একসঙ্গে কাজ করব না- এমন তো কোনো ঘোষণা কেউ দিইনি। তাছাড়া ক'দিন পরপরই আমাদের একসঙ্গে গান তৈরি হবে- এটা ভাবারও মানে নেই। যে যার কাজে ব্যস্ত থাকার কারণেই মাঝে অনেকদিন কোনো গান করা হয়ে ওঠেনি। এটা স্বাভাবিক ঘটনা। এর মধ্যে আবার হাবিব ওয়াহিদের সুরে নতুন একটি গান করেছি। কাজের বিষয়ে শুরু থেকেই আমাদের বোঝাপড়া ভালো, তার ছাপ এবারের গানেও পাওয়া যাবে বলে আমার ধারণা।'

গান নিয়ে অনেক কথা হলো। এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। হঠাৎ মেয়ে রোদেলার সঙ্গে আপনাকে একটি ফ্যাশন হাউসের মডেল হিসেবে দেখা গেল। কেমন ছিল সে অভিজ্ঞতা? এর উত্তরে ন্যান্সি হেসে বলেন, 'মডেল আমি নই, রোদেলা। ওর জন্যই দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশ্বরঙ ফ্যাশন হাউসের ফটোশুটে অংশ নিয়েছি। আমি তো আগেও ফটোশুট করেছি, কিন্তু রোদেলার সঙ্গে এই প্রথম। অভিজ্ঞতা মন্দ নয়। বলতে পারেন, রোদেলার সঙ্গে বোনাস মডেল হিসেবে আমাকে নেওয়া।' গানের বাইরে এমন আরও কিছু আয়োজনে আপনাদের দেখা যাবে? এ প্রশ্নে ন্যান্সি বলেন, 'এখনই এ নিয়ে কিছু বলা যাবে না। সময়ের সঙ্গে চলতে গিয়ে আমরা অনেকে অনেক কিছুই করি। তাই ভবিষ্যৎ বলা কঠিন। তবে এটা ঠিক যে আমরা যারা গানের মানুষ, তারা গানের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়েই অন্য সব বিষয় নিয়ে ভাবি। আমৃত্যু গাইতে চাই- এটা সত্যি। সেইসঙ্গে চাই একান্ত কাছের মানুষ আর দেশের অগণিত মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকতে।'