আজম খান যেমন তার গানের মধ্য দিয়ে অগণিত মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে, তেমনি হাজারো স্মৃতি নিয়ে সে থাকবে আমার হৃদয়ে। বন্ধু ও সংগীত জগতের এই সহযাত্রীকে কোনোভাবেই ভুলে থাকা সম্ভব নয়। আজ মনে পড়ে, বিদায়ের পাঁচ দিন আগের কথা। দেশের বাইরে যাব বলে ফোন দিয়েছিলাম তাকে। আমার বাইরে যাওয়ার প্রসঙ্গ তোলার আগেই সে বলেছিল, 'ফেরদৌস, আমি এখন আর কাউকে বিশ্বাস করি না। গানের মাঠের অবস্থাও ভালো না। আমারও আর ফেরা হবে না। তুই কিন্তু অভিমান করে দূরে থাকিস না। গান চালিয়ে যা।' জানি না, তার এই কথার মধ্যে কোনো অভিমান লুকিয়ে ছিল কিনা। কাউকে বিশ্বাস না করার রহস্য আজও জানা হয়ে ওঠেনি। তারপরও ভেবেছিলাম, যে অভিমান থেকে এ কথা বলুক না কেন, গানের ভুবনে হয়তো ফিরবে। কিন্তু সে দিনের সে কথাই যে শেষ কথা, তা বুঝতে পারিনি। সে যে সত্যি আর গানের ভুবনে ফিরবে না- এটাও ছিল কল্পনার বাইরে। তাই যখনই আজম খানের কথা মনে পড়ে, মন বিষাদে ছেয়ে যায়।

বন্ধু আর শিল্পী আজম খানের মধ্যে ছিল আকাশ-পাতাল পার্থক্য। যখন সে বন্ধু হিসেবে কাছে থাকত, তখন ভুলে যেত শিল্পী আজম খানের পরিচয়। গল্প-হাসি-আড্ডায় আসর জমিয়ে রাখত। মাঝেমধ্যে ছেলেমানুষিও ভর করত ওর মধ্যে। একটা ঘটনা বলি। এক শোতে আমরা কয়েকজন শিল্পী অংশ নিয়েছি। দর্শক আজম খান, আজম খান বলে আওয়াজ তুলছে। এটা দেখে আমি ওকে বললাম মঞ্চে উঠে যেতে। ও হেসে বলল, 'তোরা আগে গান শোনাতে থাক। আমি ততক্ষণ ঘুমিয়ে আসি। ঘুম ভাঙলে তারপর গান শোনাব।' এই হলো আজম খান। পরিস্থিতি যেমনই হোক- সবকিছু সহজভাবে নিতে পারত। অনেকে যখন তারকাখ্যাতির অহমে অন্ধ, তখনও সে আট-দশটা মানুষ থেকে নিজেকে আলাদা ভাবত না। সে যে কত বড় মাপের তারকা, কেন তাকে গুরু বলে লোকে, কিংবদন্তি শিল্পী হিসেবে পরিচয় করায়- সেসব নিয়ে আদৌ কোনোদিন ভেবেছে কিনা জানি না। এতটাই সাদাসিধে মানুষ ছিল আজম খান।

আজম খানের সঙ্গে যখন আমার পরিচয়, তখনও বাংলা গান গাওয়া শুরু করিনি। আজম খানের অভিনব পরিবেশনা দেখেই বাংলা গান করার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের কথা। তখন ইশতিয়াক, ল্যারি, ইদুসহ বেশ কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে একটি গানের দল করেছিলাম। আমরা মূলত হোটেল কন্টিনেন্টালে ইংরেজি গান করতাম। একদিন আমাদের আরেক বন্ধু শিল্পী ফিরোজ সাঁই এসে আমাকে জানায়, তার পরিচিত একজন ছেলে আছে, নাম আজম খান। ভালো গায়। তাকে নিয়ে বাংলা গান করা যেতে পারে; কিন্তু আমাদের দলের কেউ বাংলা গান করার পক্ষে ছিল না। তার পরও আমি ফিরোজ সাঁইকে বলি, আজম খানের সঙ্গে দেখা করার কথা। এরপর ফিরোজ সাঁইয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয় আজম খানের সঙ্গে। পরিচয়ের প্রথম দিনেই তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে যায়। তার গায়কীও আমাকে মুগ্ধ করে। যেজন্য গান রেকর্ড করারও পরিকল্পনা করি আমরা। বন্ধু শামীম ও রুমির সঙ্গে আড়াইশ টাকা দিয়ে ইন্দিরা রোডের ঢাকা রেকর্ডিং স্টুডিওতে এক শিফট ভাড়া করি। এরপর আজম খান ও আমি দু'জনে মিলে রেকর্ড করি চারটি গান। আজম খানের তুমুল জনপ্রিয় দুই গান 'ওরে সালেকা ওরে মালেকা' ও 'হাইকোর্টের মাজারে' সেদিন রেকর্ড করা হয়েছিল।

আমি রেকর্ড করেছিলাম 'চাঁদ জাগে তারা জাগে' ও 'দুনিয়াটা কত যে মজার' গান দুটি। এই গানগুলো শোনার পর স্টুডিওর মালিকের এতটাই ভালো লেগেছিল যে, তিনি আমাদের গান রেকর্ড আকারে প্রকাশ করারও দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। সেই গানগুলো সুপারভিশন করে দিলেন আজম খানের বড় ভাই খ্যাতিমান সংগীত পরিচালক আলম খান। স্টুডিওর মালিক তার কথা রাখতেও খুব একটা দেরি করেননি। প্রথম আজম খানের দুটি গান রেকর্ড আকারে প্রকাশ করা হয়। প্রকাশের পরপরই গান দুটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। জনপ্রিয়তার সেই রেশ ধরেই একসময় আমরা গড়ে তুলি বাংলা পপ গানের ব্যান্ড 'উচ্চারণ'। এরপর উচ্চারণের সঙ্গে শুরু হয় নতুন করে পথচলা। যে পথ পাড়ি দিতে গিয়েই আজম খান হয়ে উঠেছে তার কালের অনন্য এক শিল্পী। ব্যান্ডের জগতে পেয়েছে গুরুখ্যাতি। তার কালকে জয় করে জায়গা করে নিয়েছে কিংবদন্তিদের কাতারে। তাই আজম খান চলে গেলেও অমরত্ব লাভ করেছে তার কালজয়ী গানের মধ্য দিয়ে।

মন্তব্য করুন