বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনকে আমরা পহেলা বৈশাখ বলি। আক্ষরিক বা আভিধানিক অর্থে এটা একটা তারিখ, যা একটা নতুন বছরের প্রারম্ভকে চিহ্নিত করে। তবে বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণে পহেলা বৈশাখের তাৎপর্য অনেক গভীর। কথিত আছে, বাংলার কৃষকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে, তাদের ফসল বোনা এবং সেই ফসল ঘরে তোলার সময়কালের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাজনা আদায়ের নতুন নিয়ম প্রবর্তন করে মোগল আমলে, বাংলা নতুন বছরের আইন প্রচলন করা হয়, যার উল্লেখ আছে আবুল ফজলের আকবরনামা ও আইন এ আকবরী গ্রন্থে। খাজনা আদায়ের পাশাপাশি চলত উৎসব, নাচ-গান, বিনোদনমূলক খেলাধুলা ইত্যাদি। আধুনিক বাংলায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করার চর্চা এখনও চলমান আছে বাঙালির প্রাণের শান্তিনিকেতনে। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ষাটের দশকে পাকিস্তানি স্বৈর শাসকদের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল বাংলা বর্ষবরণ উৎসব। আমার মতো স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের কাছে তাই বাংলা নববর্ষ শুধুই একটা উৎসব না, এটা একটা উপলক্ষ্য- নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি, উত্তরাধিকার ও আত্মপরিচয়ের বোধকে শানিত করার। তাই শিল্পী হিসেবে নববর্ষে যখন কোনো অনুষ্ঠানে নিজের পরিবেশনা তুলে ধরার সুযোগ আসে, তখন সেটা শুধুই পরিবেশনা থাকে না, এর সঙ্গে জুড়ে যায় আমাদের আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা সবকিছু, যার মধ্য দিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা আমাদের নিজস্বতাকে আরও পাকাপোক্তভাবে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে নতুন করে ঝালিয়ে নেই। সোনা যেভাবে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়, ঠিক সেভাবেই আমাদের বাঙালি জাতিসত্তাও নববর্ষে নতুন করে প্রাণ পায়।

আমার শিল্পী জীবনে গত বছর ১৪২৭ ছাড়া প্রায় প্রতিটি নববর্ষই কেটেছে মঞ্চে পারফর্ম করে। মার্চ অর্থাৎ বাংলা চৈত্র মাসের গোড়া থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। বাংলাদেশের লোক সংস্কৃতির উপাদানের ওপর ভিত্তি করে নাচের নতুন নতুন ভঙ্গিমা নির্মাণের পাশাপাশি চলতে থাকে মুখোশ, পাখা ইত্যাদি প্রপস, সেট, পোশাক নির্মাণের কাজ। গতবছর এই দিনে পুরো পৃথিবী করোনা মহামারির থাবায় অবরুদ্ধ ছিল। সকাল থেকেই ভাবছিলাম এই বছর আর পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হবে না। তবে বাস্তবে হয়েছে ঠিক এর বিপরীত। সাদা-লাল শাড়ি পরেছি, বাড়িতে বাঙালি ঐতিহ্যের খাবার রান্না হয়েছে, বাড়ির মূল দরজার সামনে আঁকা হয়েছে আলপনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবার সঙ্গে দিনভর চলেছে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময়, অনলাইনে অংশ নিয়েছি নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে- ঘরে থাকলেও প্রতিটি মুহূর্তেই বাঙালিয়ানা উদযাপন করেছি আমরা। দিন শেষে এক নতুন উপলব্ধির মুখোমুখি হয়েছি। অস্তিত্ব জুড়ে যার বাস, তাকে আলাদা করে উদযাপন করার উদ্যোগ নিতে হয় না; বরং তা নিজে থেকেই ঘটে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে। পহেলা বৈশাখ আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। বৈশ্বিক মহামারির কারণে এর উদযাপনের ধরন পাল্টেছে মাত্র, আমাদের আনুষ্ঠানিক উদযাপনের যাত্রায় এটা একটা বিরতি হতে পারে; কিন্তু বিলুপ্তি নয়। নতুন বাংলা বছর ১৪২৮ সবার জন্য শুভ হোক। শুভ নববর্ষ।

মন্তব্য করুন