যে গীতিকথা আর সুরে মিশে আছে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, সেই লোকগান থেকে শিল্পী ও সাধকরা নিজেদের কখনও দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি। সময়ের পালাবদলে সংগীত পরিবেশনার ধরন বদলেছে। যে জন্য লোকগানের ফিউশনের মধ্য দিয়ে শিল্পী ও সাধকরা শ্রোতার প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শতসহস্র বছরেও যে গানের আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি, অধুনিক সংগীতায়োজনে তার পরিবেশনা কতটা সাড়া ফেলছে, তা নিয়েই এই আয়োজন-

শিকড়ের টান যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি যায় না বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ভুলে থাকা। সে কারণেই শিল্পী আর সংগীত সাধকদের আমরা বারবার দেখি লোকগানের মূর্ছনায় মেতে উঠতে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংগীত পরিবেশনার ধরন বদলেছে। যে জন্য লোকগানের পরিবেশনায় যোগ হয়েছে ফিউশন ঘরানার সংগীত। শিকড়কে চিনতে, নিজেকে জানতে, শিল্পীসত্তাকে তৃপ্ত করতে আর শ্রোতার প্রত্যাশা পূরণে তাই শিল্পী ও সাধকরা লোকগানের ফিউশন করে যাচ্ছেন নিয়মিত। যার ফলে শহরের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি বিদেশের মাটিতেও তারা পৌঁছে গেছেন মাটির গানের অনিন্দ্য পরিবেশনা তুলে ধরতে। আশির দশকে মডার্ন ফোক নামে পাশ্চাত্য সংগীতের মিশেলে লোকগানের যে পরিবেশনা শুরু হয়েছিল, তা শ্রোতার মাঝে আলোড়ন তুলতেও সময় লাগেনি। যদিও তারও আগে অনেকে নিরীক্ষাধর্মী কাজের প্রয়াসে লোকগানের ফিউশন শুরু করেছিলেন। কিন্তু তা নিয়মিত বিষয় হয়ে উঠতে আরও বেশ কিছুদিন সময় লেগেছে। আর নব্বই দশক থেকে লোকগানের ফিউশন হয়ে উঠেছে প্রত্যাশা পূরণের অন্যতম মাধ্যম।

মেহের আফরোজ শাওন ও চঞ্চল চৌধুরী

ফিডব্যাকের 'দেহঘড়ি', 'বাউলিয়ানা', দিলরুবা খানের 'পাগল মন', পলাশের 'আজ পাশা খেলবো', ডলি সায়ন্তনীর 'কালিয়া' অ্যালবামগুলো ছাড়াও সিরিজ মিশ্র অ্যালবাম 'রঙ্গমেলা', 'তিন পাগলের মেলা' ছিল নব্বই দশকের সবচেয়ে আলোচিত আয়োজন। পরবর্তী দশকে হাবিব-কায়ার 'কৃষ্ণ', 'মায়া', বাংলা ব্যান্ডের 'কিংবর্তব্যবিমূঢ়', 'প্রত্যুৎপন্নমতিত্ত', লালন ব্যান্ডের 'বিপ্রতীপ', 'ক্ষ্যাপা', 'পাগল'সহ অসংখ্য ফোক-ফিউশন অ্যালবাম শ্রোতার মনোযোগ কেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের ফোক-ফিউশন একক ও দ্বৈত গানগুলো সংগীতপ্রেমীদের মনে অনুরণন তুলে যাচ্ছে। চঞ্চল চৌধুরী ও মেহের আফরোজ শাওনের 'সর্বত মঙ্গল রাধে'সহ ঐশী, সালমা, কিশোর পলাশ ও বিভিন্ন শিল্পীর বেশ কিছু গান সাড়া ফেলেছে শ্রোতার মাঝে। স্পষ্ট আধুনিক সংগীয়োজনের মাধ্যমে পরিবেশিত হলেও এতে লোকগানের আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি। এখন প্রশ্ন হলো, আধুনিক ও পাশ্চাত্য ঘরানার গান গেয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরও শিল্পীদের অনেকে কেন ফোক-ফিউশনের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন? এর জবাবে শিল্পী ও সংগীত পরিচালক হাবিব ওয়াহিদ বলেন, 'আমাদের লোকগান এতটা সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী যে, এই গানের মাধ্যমে আমরা বিশ্বের যেকোনো ভাষাভাষীর শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করতে পারি। আমাদের লোকগান জীবন সম্পর্কে ভিন্ন এক উপলব্ধি এনে দিতে পারে- এর প্রমাণ বহুবার পাওয়া গেছে। তাই ফোক গানের মায়াজালে বন্দি থাকে সবসময়। এটা ঠিক যে, সময়ের সঙ্গে সংগীতায়োজন ভিন্ন বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে। তাই ফিউশনের জন্য লোকগানকেই অবলম্বন হিসেবে বেছে নেওয়া। হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন শিল্পী ও সংগীত পরিচালক বাপ্পা মজুমদার। বন্ধুদের নিয়ে তিনি 'বেনানন্দ' নামের ফোক ফিউশন অ্যালবাম প্রকাশ করে অনেকের মানোযোগ কেড়েছেন। তার আগে এই শিল্পীর কণ্ঠে আমরা নানা ধরনের গান শুনেছি। যেগুলো শ্রোতার প্রিয় গানের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এরপরও ফোক ফিউশনের দিকে কেন ঝুঁকে পড়া? সেই প্রশ্নে বাপ্পা মজুমদার বলেন, 'আত্মপরিচয় যেমন ভুলে থাকা সম্ভব নয়, তেমনি গানের বিষয়েও ভুলে থাকা সম্ভব নয় ইতিহাস-ঐতিহ্যকে।

তাই শিকড়ের টানে লোকগান কণ্ঠে তুলে নেওয়া।' বাপ্পার মতো একই চিন্তাধারার প্রকাশ গত কয়েক দশকের অনেক শিল্পী ও সংগীতায়োজকের ছিল। যে জন্য মমতাজ, বেবী নাজনীন, ডলি সায়ন্তনী, সেলিম চৌধুরী, কৃষ্ণকলি, ব্যান্ডশিল্পী মাকসুদ, আনুশেহ, হাবিব, অর্ণব, রিংকু, সালমা, বিউটি, পলাশ, ঐশী, মিজান, নিশিতা, তানজীবসহ অনেকের আয়োজনে ফোক-ফিউশন প্রাধান্য পেয়েছে। প্রথম সারির পাশাপাশি নতুন ব্যান্ডগুলো ফোক-ফিউশন থেকে পিছিয়ে থাকেনি। ফিডব্যাক, সোলস, ওয়ারফেজ, অর্থহীন, চাইম, প্রমিথিউস, লালন, জলের গান, দলছুট, শূন্যসহ অনেকে ব্যান্ড ফোক-ফিউশনের আয়োজন করে শ্রোতার প্রশংসা কুড়িয়েছে। এমনকি বরেণ্য শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী, এন্ড্রু কিশোর, সুবীর নন্দী, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরীর মতো খ্যাতিমান শিল্পীরাও বিভিন্ন সময় লোকগানের নানা ধরনের সংকলন প্রকাশ করেছেন। এক কথায় বাউল, বৈষ্ণব ছাড়াও দেশের প্রতিটি শিল্পী ও ব্যান্ড বিভিন্ন সময় ফোকগানের পরিবেশনা দিয়ে শিকড়কে চেনানোর চেষ্টা করেছেন। কেউ সময়ের চাহিদা পূরণে, কেউ আত্মতৃপ্তির জন্য গান করে যাচ্ছেন। যেখানে ঘুরেফিরে লোকগানই প্রাধান্য পাচ্ছে। ক্লাসিক্যাল দিয়ে সংগীতচর্চা শুরু হলেও আজ লালনগীতির অনবদ্য শিল্পী হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিত ফরিদা পারভীন। পরিচিতি বদলে দিয়ে যিনি সবসময় লোকগানের মহিমা তুলে ধরেছেন। জানিয়েছেন, লালন সাঁইয়ের অনবদ্য সৃষ্টি সবার মাঝে তুলে ধরার কারণেই শিল্পী জীবনের বাঁক বদলে গেছে। কারণ তার গানের দর্শন ধর্ম, বর্ণ, জাত ভুলে মানব পরিচয়কেই বড় করে দেখতে শেখায়। নিজেকে ভেতরের মানুষটিকে চিনতে সাহায্য করে। এককথায় তার গান সাধনার পর্যায়ে নিয়ে যায়। তাই লোকগানের বিশেষ করে লালন সাঁইয়ের গান গাওয়া শুরু করার পর কখনও থেমে থাকেননি। তবে ফিউশনের বিষয়ে তার কথা হলো, 'লোকগানের মূল কথা, সুর অবিকৃত রেখে আধুনিক সংগীতায়োজনে তা পরিবেশনায় দোষ নেই। কিন্তু ফিউশনের নামে লোকগানের বিকৃতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না। তাই এ বিষয়ে সবাইকে নজর দিতে হবে।' তার এ কথার সমর্থন করেছেন অনেকে। যাদের কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, নিরীক্ষা এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংগীতে নতুন কিছু করা যেতেই পারে। কিন্তু লোকগানের মূল কথা, সুর যদি বিকৃত হয়, তাহলে অনেকেই জানবে না আমাদের মাটির গান কতটা সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী। তাই ফিউশনে মূল গানের প্রকৃত নির্যাস না রাখলেই নয়। া

মন্তব্য করুন