করোনার ভয়াল থাবায় পুরো পৃথিবী আজ বিপর্যস্ত। বিশ্বের প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহে নতুন সিনেমা মুক্তি অনিশ্চিত। এমন বাস্তবতায় নেটফ্লিক্স, আইফ্লিক্স, আমাজন প্রাইম, হইচই, বায়োস্কোপ, বঙ্গবিডির মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে মুক্তি পাচ্ছে নতুন নতুন সিরিজ ও সিনেমা। ফলে বলা যায়, এখন সময় বদলেছে। দর্শকরা এখন কাজের ফাঁকে মেতে থাকে ওয়েব সিরিজ বা ওয়েব ছবিতে। জানাচ্ছেন অনিন্দ্য মামুন

কেউ কোনোদিন ভেবেছিল, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এমন তারকাবহুল হয়ে উঠবে? হলিউড থেকে শুরু করে বলিউড, টালিউড, ঢালিউডের সিনেমার সঙ্গে জড়িত সবার এখন একমাত্র পছন্দ ওটিটি প্ল্যাটফর্ম! গত এক বছরে হলিউড ও বলিউডের প্রায় ১০০টি নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে বেশ কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে প্রতি সপ্তাহে হলিউড একাধিক ছবি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি দিচ্ছে। বলিউড প্রতি সপ্তাহে নতুন ছবি মুক্তি না দিলেও দুই সপ্তাহ পরপর নতুন ছবি নিয়ে হাজির হচ্ছে বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। কিন্তু সেই তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে। বিষয়টি নিয়ে দেশের বেশিরভাগ সিনেমাবোদ্ধা মনে করছেন, 'অনলাইনে নতুন ছবি মুক্তি সাময়িক একটি বিষয়। নতুন ছবি সিনেমা হলেই দেখতে ভালো লাগে। টিভিতে নয়।' আবার অনেকে মনে করছেন 'একজন প্রযোজকের কাছে ছয় মাস-এক বছরের জন্য ছবি জমে থাকা মানে বিরাট আর্থিক ক্ষতি। সে জায়গা থেকে কেউ যদি অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে ছবি মুক্তি দেয়, তা দোষের কিছু নয়। কিন্তু আমাদের দেশে একটা ছবি প্রথমে সিনেমা হলে দেখানো হয়, এরপর টিভি, তারপর ইউটিউবে। এই পদ্ধতিতে অভ্যস্ত থাকার কারণে ওটিটি নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। করোনার এই সময়ে হলের বিকল্প সিনেমা মুক্তি দিয়ে সাহস দেখিয়েছেন পরিচালক অনন্য মামুন। গত বছর মামুন শাকিব খান অভিনীত বিগ বাজেটের 'নবাব এলএলবি' আই থিয়েটার নামে নতুন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি দেন। এ বছর একই প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পায় তার 'মেকআপ'। আসছে ঈদেও নতুন একটি ছবি অনলাইনে মুক্তি দেবেন তিনি। মামুন জানালেন, 'কাউকে না কাউকে তো শুরু করতেই হবে। করোনার এই সময়ে অনেকেই সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখছেন না। তারা এখন ঘরে বসেই বিভিন্ন অনলাইন অ্যাপে সিনেমা দেখছেন। এ অবস্থায় সিনেমা হলের পরিবর্তে ওটিটিতেই ছবি মুক্তি দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। অনলাইন এখন সময়ের চাহিদা।' কিছুদিন আগে জি ফাইভে মুক্তি পায় অপূর্ব ও নুসরাত ফারিয়ার প্রথম চলচ্চিত্র 'যদি কিন্তু তবুও'। শিহাব শাহিনের পরিচালনায় এই ছবি নিয়েও বেশ আলোচনা ও সমালোচনা হয়।

আসছে ঈদুল ফিতরে মুক্তির তালিকায় ছিল পাঁচটি সিনেমা। এগুলো হলো- 'অন্তরাত্মা', 'মিশন এক্সট্রিম', 'বিদ্রোহী', 'শান' ও 'ক্যাসিনো'। এসব সিনেমা এবারের ঈদেও মুক্তি পাবে কিনা, সেটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তাহলে কি বিকল্পভাবে মুক্তি দেওয়া যায় না? বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও রয়েছে 'বায়োস্কোপ', 'বঙ্গবিডি', 'টফি', 'সিনেস্পট', 'বিঞ্জ'সহ আরও কয়েকটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এগুলোতে দেশের তারকাবহুল চলচ্চিত্র মুক্তির খবর মিলছে না। এগুলোতে ওয়েব সিরিজ কিংবা উৎসবকে কেন্দ্র করে নির্মিত নাটকই বেশি দেখানো হচ্ছে। নির্মাতারা বলছেন, সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকির কথাও মাথায় রাখতে হচ্ছে তাদের। চলচ্চিত্র পরিচালক মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, 'আমাদের সিনেমা নেটফ্লিক্সের মতো বড় প্ল্যাটফর্ম কিনছে না। যে কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সিনেমা মুক্তি দিলে ছবির মেজাজটাও অন্যরকম লাগে। আমরা সেভাবে এখনও তৈরি হতে পারিনি।' প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার সিইও আলিমুল্লাহ খোকন বলেন, 'অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো সবার জন্যই উন্মুক্ত। চাইলেই যে কেউ ছবি মুক্তি দিতে পারেন। কিন্তু আমরা সাহস করছি না। তবে করোনাকালে অনেকে ঝুঁকছেন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দিকে। এই সময় অনলাইনে ছবি মুক্তি দিয়ে সিনেমার বাজার চাঙ্গা রাখা সম্ভব। এখন আমরাও আমাদের ছবি অনলাইনে মুক্তির চিন্তা-ভাবনা করছি।'এখন তো 'ওয়েব সিরিজ'-এর জমানা। কর্মব্যস্ত বাঙালি এখন কাজের ফাঁকে মেতে আছে ওয়েব সিরিজে। অফিসে যাওয়ার পথে কিংবা কাজের ফাঁকে। শুধু মোবাইল ফোন বের করার অপেক্ষা। নাটক, সিনেমার পর গল্প উপস্থাপনার অভিনব এই মাধ্যম স্বল্পসময়ে কেড়ে নিয়েছে অগণিত দর্শকের মনোযোগ। অনির্দিষ্ট বাজেট এবং নির্মাণে আলাদা নীতিমালা না থাকায় ওয়েব সিরিজে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন অনেকে। একই সঙ্গে কাজের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের অনেকেই পা বাড়িয়েছেন বিনোদনের নতুন এই ভুবনে। তাই তো ওয়েব সিরিজ সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিতে খুব একটা সময় নেয়নি। সৃষ্টির নেশা আর পেশাদারির এক নতুন পথ তৈরি করতে অন্যান্য দেশের মতো এদেশের নির্মাতা, শিল্পী, প্রযোজক, প্রকাশকরাও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বিনোদনের পাশাপাশি ওয়েব সিরিজ হয়ে উঠেছে উপার্জনেরও অন্যতম এক মাধ্যম। যে কারণে বেড়েছে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি আর নির্মাতা, শিল্পী ও প্রযোজকদের দর্শক আকৃষ্ট করার নানা কৌশল। কেউ কেউ অভিনব নির্মাণ, ভিন্ন ধারার গল্প দিয়ে দর্শকের মনোযোগ ও প্রশংসা কুড়িয়েছেন। অন্যদিকে দর্শক আকৃষ্ট করতে কেউ কেউ ওয়েব সিরিজে অশালীনভাবে উপস্থাপন করেছেন গল্প ও ঘটনা। বরেণ্য অভিনেতা ও নির্মাতা আফজাল হোসেনের কথায়, ওয়েব প্ল্যাটফর্ম হতে পারে আগামী দিনের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু সেন্সর না থাকার কারণে অবাধ স্বাধীনতায় নির্মাতাদের কাজের মান নিয়ে একটা ঝুঁকি থাকেই। কিন্তু এটাও সত্যি, এই মাধ্যমে যত নিরীক্ষা চালানো সম্ভব, তা আর কোথাও সম্ভব নয়। ওয়েবই হতে পারে সৃষ্টির বড় একটি মাধ্যম। তাই এদেশের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজগুলোর ভুল-ত্রুটি শুধরে নিয়ে শ্রেষ্ঠ কাজ তুলে ধরার চেষ্টা করা উচিত। তাহলে কাজের মধ্য দিয়ে তৈরি হবে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হওয়ার পথ।

মন্তব্য করুন