আইয়ুব বাচ্চুর চলে যাওয়ার খবরটা ছিল আপন ভাই হারানোর মতো কষ্টের। গানের ভুবনে দীর্ঘ পথ আমরা একসঙ্গে পাড়ি দিয়েছি। সেই সুবাদে মনে জমেছে বহু স্মৃতি, ক্ষণে ক্ষণে যা এখনও চোখে ভাসে। মোটরসাইকেলের পিছে বসা, পিঠে গিটার ঝোলানো এক তরুণের ছুটে যাওয়ার দৃশ্য কখনও ভুলতে পারি না। কেননা, সেই তরুণই একদিন আমাকে বলেছিল, 'তপনদা, আমি আপনার সঙ্গে মিউজিক করতে চাই।' এ শুধু মুখে বলা নয়, সত্যি সে আমার সঙ্গে গানের ভুবনে পথচলা শুরু করেছিল। শুরুতে স্পাইডার; এর পর ফিলিংস ব্যান্ডে সদস্য হিসেবে মিউজিক করেছে বাচ্চু। এর পর যোগ দিয়েছিল সোলসে। সেটা ছিল ১৯৭৮ সাল। সে বছর সোলসের গিটারিস্ট ব্যান্ড ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তাই আমরা একজন গিটারিস্ট খোঁজা শুরু করেছিলাম। তখনকার সোলসের সদস্য নকীব খান, সুব্রত বড়ূয়া রনি, পিলু খানসহ আরও যারা ছিল, সবাই মিলে আমরা ঠিক করি, আইয়ুব বাচ্চুকে দলে নেব।

ততদিনে বাচ্চু আমাদের সবার কাছেই পরিচিত ভালো গিটার শিল্পী হিসেবে। একই সঙ্গে সে গান গাইতে ও ভালো হারমোনাইজ করতে পারে। তাই গিটারিস্ট খুব একটা বাছ-বিচার করতে হয়নি। সবাই যখন তার বিষয়ে একমত হলো, তখন বাচ্চু সানন্দে যোগ দিয়েছিল সোলসে। এর পর নতুন করে শুরু হয়েছিল আমাদের সংগীতযুদ্ধ। সৃষ্টির নেশায় মেতে উঠি আমরা। একে একে প্রকাশ সোলসের 'সুপার সোলস', 'কলেজের করিডোরে', 'মানুষ মাটির কাছাকাছি', 'ইস্ট ওয়েস্ট' অ্যালবাম। যার গানগুলোতে আইয়ুব বাচ্চু রেখেছে তার অনিন্দ্য গিটার বাদনের ছাপ। গানও গেয়েছিল সোলসে, 'ভেবে মনে ব্যথা পাই' শিরোনামে। আজ এতদিন পর এই গানই হয়েছে অনুভূতি প্রকাশের শিরোনাম। এ এক বিস্ময় আর কষ্টের শিরোনাম। সংগীত পেশা হিসেবে নেওয়া যে দেশে চ্যালেঞ্জিং বিষয়, সেই দেশেই আইয়ুব বাচ্চু পেশাদার শিল্পী ও মিউজিশিয়ান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছে। দেশের সেরা গিটারশিল্পী হিসেবে তার নাম উঠে আসে সবার আগে।

আমার জন্য ভালো লাগার বিষয় এটাই যে, একদিকে আমি যেমন ছিলাম তার পরিবারের সদস্যের মতো, অন্যদিকে সংগীতাঙ্গনের অন্যতম সহযোদ্ধা। স্বনামে প্রকাশিত আমার প্রথম অ্যালবামের গানগুলোর সুর ও সংগীতায়োজন করেছিল বাচ্চু। পরে তৃতীয় একক অ্যালবামেও কাজ করেছে। আমার গাওয়া 'মনে করো তুমি আমি', 'অনাবিল আশ্বাসে', 'আলো ভেবে যারে আমি', 'আমার গল্প শুনে', 'ডায়েরির পাতাগুলো', 'পাথর কালো রাত'সহ অনেক গানের সুরকার সে। সোলস ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও আমাদের হৃদয়তা এতটুকু কমেনি। এলআরবিতে থাকাকালীন তার সুর-সংগীতে মিক্সড অ্যালবামেও গেয়েছি। এভাবেই আমাদের বন্ধন জুড়ে ছিল গানের মাধ্যমে। শুধু শিল্পী বা সংগীতস্রষ্টা হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও বাচ্চু ছিল বড় মনের। জীবনে যাদের যে সহযোগিতা পেয়েছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেও কার্পণ্য করেনি। বাচ্চু সবার কাছেই বলত, তার শিল্পী হয়ে গড়ে ওঠার পেছনে আমার ভূমিকা আছে- শুনে গর্বে আমার বুক ভরে যেত। শুধু গানের মধ্য দিয়ে নয়; হৃদয়ের অলিগলিতে আপন মানুষ হিসেবেই তার বিচরণ থেকে যাবে চিরকাল।

মন্তব্য করুন