প্যাচআল

প্যাচআল

হাবুলের হাবলামি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯

অয়েজুল হক

সীমা মেয়েটার হঠাৎ বিয়ে হয়ে যাওয়ায় প্রচণ্ড মেধাবী হাবুল হাবলা হয়ে পড়ে। দীর্ঘ তেরো বছরের সম্পর্ক। তেরো হাজার ফেসবুক পোস্ট, তেতাল্লিশ হাজার কমেন্ট, তেরো লাখ লাইক, ইনবক্সে মেসেজের পর মেসেজ। ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রেমালাপ! সব জলাঞ্জলি দিয়ে সীমা অন্যের গলায় ঝুলে পড়বে! ব্যথা বেদনা আর ভাবনা তিন মিলে এক মাসের মধ্যে মেধাবী হাবুল হয়ে যায় হাবলা হাবুল। পাগলা হাবুল। বাড়ির ভেতর প্রথম বিষয়টা জানতে পারে তার ভাবি নিলুফা। সকালের রান্না চড়াতে যাবে, ঠিক সে সময় হাবুল পেছনে এসে দাঁড়ায়। হাবুলকে দেখে নিলুফা মুখে হাসি নিয়ে বলে, কী ব্যাপার ছোট ভাই? সাত সকালে ক্ষুধা লেগে গেল নাকি!

হাবুল নিরুত্তর। নিষ্প্রভ দৃষ্টি। একটু বাদেই ফ্যাকাসে গলায় বলে, সীমা! তুমি এখানে?

-এই, আমি তোমার ভাবি নিলুফা।

জোচ্চর মেয়েটাকে একটা শাস্তি দেওয়া দরকার। এতটা পথ পেরিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমার শ্বশুরবাড়ি এসেছে আর এখন সেই মেয়েটা বলছে সে তার বড় ভাবি! নিলুফা? হাবুল হাতের আঙুলগুলো শক্ত করে। সর্বশক্তি দিয়ে মেয়েটার মুখে থাপ্পড় কষে দেয়। থাপ্পড়ের সঙ্গে হাঁড়ি-পাতিলের ঝনঝনানি। মেয়েটা হুড়মুড় করে হাঁড়ি-পাতিল কড়াই, চাল, ডাল, মাছ, তরকারির ভেতর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। 'কে কে' শব্দের চিৎকার শোনা যায়। এখানে থাকা নিরাপদ নয়। হাবুল দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। বেশ কিছুটা পথ দৌড়ে পেরোবার পর হাঁটা শুরু। সকালটা মন্দ নয়। আকাশে মেঘ আছে। ভ্যাপসা গরমও আছে। গাছপালায় ঘেরা নালন্দা পার্ক। এখানে একটু সময় কাটানো যায়। পার্কে ঢুকেই চোখে পড়ে তার বয়সী একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। দাঁড়িয়ে। মেয়েটা আক্ষেপ নিয়ে বলে, জীবনটা ফ্যাকাসে, রঙহীন হয়ে গেছে।

-কেন, কী হয়েছে?

হঠাৎ পাশের কারও কথায় চমকে ওঠে দু'জন। হাবুলের দিকে বড় চোখে তাকায়। ছেলেটা রুক্ষ গলায় বলে, এটা আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।

সাত সকালে কী হলো কে জানে! মেয়েটার কথায় হাবুল বেশ মর্মাহত। বেচারি কত কষ্টে আছে! বাড়িঘরে সামান্য একটু রঙ চটে গেলে মানুষ রঙ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর এখানে জীবনের রঙ চটে গিয়ে একেবারে নাই হয়ে গেছে! ভীষণ ব্যাপার। জীবনের রঙ নাই। হাবুল বিড়বিড় করতে করতে সামনে পা বাড়ায়। কিছুদূর এগোতেই একটা বড় রঙের দোকান দেখে দাঁড়ায়।

-জীবনের রঙ আছে ভাই?

-সব আছে। রঙের ব্যবসা করি যদি রঙ না থাকে, তাহলে চলে!

-কী রঙ!

-লাল, নীল, সবুজ, হলুদ ও বেগুনি। আর কালার ব্যাংকে তো ইচ্ছামতো বানিয়ে নিতে পারবেন। হাবুলের চোখ ভিজে ওঠে। জীবনের এত রঙ আছে, জানলে কি এতটা বছর সীমা নামের মেয়েটির সঙ্গে প্রেম করে দুঃখ ঘাড়ে করতে হতো! রঙ করে কবেই নিজেকে ট্রাম্প বানিয়ে ফেলত। চোখ মুছতে মুছতে বলে, সবার জন্য চোখের পানি ফেলতে নেই।

দোকানি মুখে হাসি নিয়ে বলেন, একদম ঠিক কথা বাপ, হেইডা তো আর মাগনা পাওয়া যায় না।

হাবুলের মেজাজ খারাপ হয়। লাল চোখে বলে, অর্থ আর স্বার্থ ছাড়া কিছু না বোঝা লোকদের পেলেই আমি পেটাই।

-মানে!

-মানে আপনাকে আমি এখন আচ্ছামতো পেটাব।

উদ্বিগ্ন কণ্ঠে লোকটা জানতে চায়, কেন!

হাবুল লাফিয়ে দাপিয়ে ওঠে। হুঙ্কার ছেড়ে বলে, ওরে কেন! মাগনা পাওয়া যায় না... সব কিছুতে টাকা!

দোকানি মুহূর্তে দোকানের ঝাঁপ টেনে দেন। বাইরে হাবুলের চিৎকার, এই বের হ, সীমার বাপ কোথাকার।

কিছুক্ষণ চিৎকার করে হাবুল সামনের দিকে পা বাড়ায়। সে কোথায় যাবে, কেন যাবে, ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারে না।

দু'দিন বহু চেষ্টার পর হাবুলের খোঁজ মেলে শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে রেলস্টেশনের পাশে একটা গাছের নিচে। সেটাও রিয়াদ সাহেবের কল্যাণে। রিয়াদ সাহেব হাবুলের বাবার খুব কাছের মানুষ। ফোন করে বলেন, গতকাল থেকে আপনার ছেলেটা এখানে, আমি তিনতলায় দাঁড়িয়ে দেখছি।

-কোথায়?

-এই যে রেলস্টেশনের পাশে গাছতলায়। দু'দিন ধরে কথা বলছে।

-সে তো মোবাইল বাড়ি রেখে গেছে।

-কী জানি! আমি তো তাকালেই দেখছি কানে হাত চেপে মুখ নাড়াচ্ছে।

খবর শুনে হাবুলের বাবা জহির উদ্দিন ও তার বড় ভাই রাতুল মোটেও দেরি করেন না। দ্রুত বেরিয়ে পড়েন। হাবুলকে পেতে বেগ পেতে হয় না। সেখানেই, গাছতলায়। চেহারা উস্কখুস্ক। শুকনো মুখ। কাঠের ভাঙা একটা ডাল কানে দিয়ে বিড়বিড় করছে। জহির উদ্দিন মায়াভরা কণ্ঠে বলেন, ভাবিকে মেরেছিস তাই বলে বাড়ি ছেড়ে পালাতে হবে? বাড়ি চল।

হাবুল পিটপিট করে তাকায়। কার ভাবি, কিসের ভাবি কে জানে! শুধু বোঝে, তার বাড়ি যাওয়া দরকার।