প্যাচআল

প্যাচআল

নিম পাতার রস

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯

ইসমত জাহান লিমা

ছোটবেলা থেকেই মিন্টু আর পিন্টু বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওদের দু'জনের গলায় গলায় ভাব। একসঙ্গে বেড়ে ওঠায় দু'জনের আচার ব্যবহারে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। পড়াশোনায় যথেষ্ট মেধাবী হলেও আড্ডা, ধোঁকাবাজি আর দুরন্তপনায় দু'জনের কেউ উনিশ-বিশ না। মাস ছয়েক আগে একদিন পিন্টু মিন্টুর কাছ থেকে অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে ৭০০ টাকা ধার চায়। মিন্টু আগেই জানত পিন্টুকে টাকা দিলে সে কোনোদিন ফেরত দেবে না। কিন্তু পিন্টুর জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত টাকা দিতে বাধ্য হয়।

এখন ওরা দু'জনেই ক্লাস নাইনে। কিছুদিন থেকেই মিন্টু পিন্টুর কাছ থেকে ধার দেওয়া টাকাটা চাচ্ছিল। কিন্তু পিন্টু আজ নয় কাল, কাল নয়, পরশু এভাবে সময় দিত। মিন্টু খুব করে বুঝল এর সবই পিন্টুর টাকা না দেওয়ার ধান্ধা। কিন্তু মিন্টুও তো এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার ছেলে নয়। কীভাবে পিন্টুর কাছ থেকে টাকা বের করা লাগবে অনেক ভেবেচিন্তে সে একটা বুদ্ধি বের করল।

সপ্তাহখানেক পর দূর থেকে পিন্টুকে আসতে দেখে তাড়াতাড়ি করে ওদের পাড়ার টংয়ের দোকানের সাইডে মিন্টু একটা ব্যানার টানিয়ে দিল। ব্যানারের নিচে দুটি চেয়ার রেখে একটা বোতল নিয়ে বসল। ব্যানারে মোটা সাইনপেন দিয়ে লেখা- 'এখানে মাত্র ৪০০ টাকার ভিজিটে সর্বপ্রকার রোগের চিকিৎসা করা হয়। ওষুধ সেবনমাত্রই সঙ্গে সঙ্গে রোগ হতে আরোগ্য লাভ এবং ওষুধে কাজ না হলে রোগীকে তৎক্ষণাৎ ১০০০ টাকা ফেরত দেওয়া হয়।'

মিন্টুর এমন অদ্ভুত কাণ্ড দেখে আশপাশের বেশ কিছু মানুষ জড়ো হলো। কাছাকাছি এসে ব্যানারের লেখা পড়ে পিন্টু মনে মনে মিটিমিটি করে হাসতে শুরু করল। ৪০০ টাকায় ১০০০ টাকা পাওয়া যাবে দেখে পিন্টুর আর লোভ সইল না। সে তাড়াতাড়ি একটা অসুখের নাম মনে করল।

ভিজিটের টোকেন হাতে নিয়ে সে বলল, 'ডক্টর সাব, কিছুদিন থেকে আমি কোনো খাবারের স্বাদ পাচ্ছি না। এমনকি ঈদে যে গোশত খেলাম সেটারও স্বাদ পাইনি। আমাকে ওষুধ দিন দেখি সঙ্গে সঙ্গে স্বাদ পাই কি-না।'

মিন্টু আগে থেকে জানত পিন্টু নিম পাতার রস খেতে পারে না। সে পিন্টুকে চোখ বন্ধ করতে বলে বোতল থেকে এক চামচ নিম পাতার রস মুখে দিল। সঙ্গে সঙ্গে পিন্টু ওয়াক ওয়াক করে ফেলে দিয়ে বলে, এটা কেমন ওষুধ! এ তো নিম পাতার রস।

এবার মিন্টু উপস্থিত সকলকে বলল, 'আপনারা দেখলেন তো, যে পিন্টু ঈদের গরুর কালা ভুনারও স্বাদ পেত না, সে আমার দুফোঁটা ওষুধে স্বাদ ফিরে পেয়েছে।'

সেদিনের মতো হতবাক হয়ে পিন্টু বাড়ি চলে গেল। মিন্টু যে ওকে এত বড় বোকা বানাবে তা ওর ধারণাই ছিল না। কিন্তু যে করেই হোক মিন্টুর পকেট থেকে ১০০০ টাকা বের করতে হবে। তাই বেশ ভেবেচিন্তে ক'দিন পর পিন্টু আবারও মিন্টুর দোকানে এলো।

এবার বলল, 'আমি অনেক পড়ি কিন্তু কিছু মনে থাকে না। একটু আগে কী দিয়ে ভাত খেয়েছি তাও মনে নেই।'

মিন্টু চোখ বন্ধ করতে বলে আবারও সেই নিম পাতার রস পিন্টুর মুখে ঢেলে দিল।

পিন্টু এবার লাফ দিয়ে উঠে বলল, 'এটা তো সেই নিম পাতার রস, যা তুই কদিন আগে দিছিলি।'

মিন্টু বলল, 'এখানে বললি কিছু মনে থাকে না। এই তো তোর সব কিছুই মনে আছে।'

পিন্টু আবারও হেরে গেল, সঙ্গে দু'বারের ভিজিটে ৮০০ টাকাও গচ্চা! এদিকে এতদিন পর এই অভিনব কৌশলে টাকা তুলতে পেরে মিন্টুও বেশ খুশি।

কিন্তু পিন্টু এত সহজে এমন অপমান হজম করে ছাড়ার ছেলে না। সে এবার যে কোনোভাবেই হোক টাকা তুলবে, সে ফন্দি করল। পরের দিন আবার মিন্টুর দোকানে এসে বলল, 'আমি বেশ কিছুদিন থেকে চোখে অন্ধকার দেখি। যে করেই হোক আমি স্বচ্ছ দেখতে চাই। ওষুধ দে!'

এ কথা শুনে মিন্টু কোনোরকমে হাসি চেপে রাখল। সে এবার পিন্টুকে চোখ বন্ধ করতে না বলেই ওর সামনেই সেই বোতল থেকে এক চামচ ওষুধ ঢালল। তা দেখে পিন্টু রেগে গড়গড় করে বলল, 'তুই আমাকে বাঁচতে দিবি কি-না বল, আবার আমাকে একই নিমের রস দিচ্ছিস!'

মিন্টু হো-হো করে হাসতে হাসতে বলল, 'তুই না চোখে দেখতে পাচ্ছিস না? আমি যে নিম পাতার রস দিচ্ছি, তা কীভাবে দেখতে পেলি?'

মিন্টু এমনভাবে ধোঁকা দেবে তা ভাবতেও পারেনি পিন্টু! সে আবারও হেরে গেল! সঙ্গে ১২০০ টাকার শোক আর নিজের লোভ, নির্বুদ্ধিতায় সত্যি সত্যি চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল।

আর এদিকে মিন্টু বুদ্ধি খাটিয়ে ওর টাকাটা উসুল করার সঙ্গে সঙ্গে ৫০০ টাকা অতিরিক্ত পাওয়ার খুশিতে লাফাতে শুরু করল।



হ হাবিপ্রবি, দিনাজপুর