প্যাচআল

প্যাচআল

আমি আর মামু

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯

জোবায়ের রাজু

ইকবাল মামা আমার ওপর বড্ড বিরক্ত। বিরক্ত হওয়ার কারণটাও খুব সাধারণ। আমার একটি বদরোগ আছে। এই বদরোগের নাম সেলফি তোলা রোগ। খাইতে, লইতে, শুইতে, বইতে অযথা সেলফি তোলা আমার পুরান স্বভাব। আমার আত্মীয়স্বজন অবশ্য আমার এই পুরনো স্বভাবে এখন আর আগের মতো বিরক্ত না হলেও ইকবাল মামার মধ্যে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন দেখা যায়নি। এই পরিবর্তন না দেখা যাওয়ার একটি কারণও আছে। কারণটি হলো ইকবাল মামার আইফোন। আইফোনে তুলনামূলকভাবে ছবি একটু ভালো ওঠে বলেই ইকবাল মামার আইফোন দিয়ে যখন তখন ছবি তোলার কৌতূহল আমার মধ্যে জেগে ওঠে।

তো সেদিন ইকবাল মামা বললেন, 'চল, আবিরপাড়া যাই। ওখানে আমার বন্ধুর বাড়ি।' আমি রাজি হলাম। মামু-ভাগ্নে দু'জনে মহানন্দে আবিরপাড়া যাচ্ছি। দুঃর্ভাগ্যবশত পথে কোনো যানবাহন পাওয়া যায়নি বলে দু'জনে হাঁটতে শুরু করেছি। হেঁটে আমরা চলে এসেছি অনেকখানি দূরের কোনো এক অচেনা গাঁয়ে। ছবির মতো সুন্দর এই অচিন গ্রাম। অবারিত ধানক্ষেত, পথের দু'ধারে তালগাছের সারি! পাশ দিয়ে বয়ে চলা খালের স্রোতস্বিনী পানি... আহা, মন আমার কবি হয়ে ওঠে। হঠাৎ মনে হলো এমন সুন্দর গাঁয়ে ছবি না তুললেই নয়।

'মামা, আইফোন দাও।'

'কেন?'

'সেলফি তুলব।'

'না, হবে না।'

'কেন হবে না?'

'আইফোনে চার্জ কম।'

'দাও তো। সেলফি তুলি।'

'না।'

'আমি কিন্তু অঘটন ঘটাই পালামু।'

'কী করবি?'

'ছেলেধরা বলে চিৎকার দিমু। জানো তো, চারদিকে এখন ছেলেধরা আতঙ্ক।'

'দে, চিৎকার দে।'

'সত্যি দিমু?'

'দে।'

এদিক-সেদিক তাকিয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগলাম, 'কে কোথায় আছ? হেল্প মি। এই ছেলেধরাটা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে।' অবাক করা কাণ্ড হলো আমার চেঁচামেচির দুই মিনিটের মাথায় কতগুলো ইয়ং ছেলে কোথা থেকে উড়ে এসে ইকবাল মামাকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুসি মারতে শুরু করল। ছেলেধরা নামক ভুল সন্দেহে ইকবাল মামা কিল-ঘুষি খেতে খেতে নাজেহাল হয়ে বলল, 'আমি ছেলেধরা নই। বিশ্বাস করো তোমরা। আর মেরো না। অহ... আহ...।' ইকবাল মামার কোনো আকুতি ছেলেগুলো পাত্তা দিচ্ছে না। ওরা বলল, 'মাইনষের পোলাপান নিয়া পালাস? আজ তোরে পিটিয়ে তক্তা বানাব।'

আপাদমস্তক কিল খাওয়া ইকবাল মামাকে দেখে আমার খারাপ লাগতে শুরু করল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়াবে, ভাবিনি। তাই ছেলেগুলোকে বাধা দিয়ে বললাম, 'থামো, তোমরা থামো। উনি ছেলেধরা না। আমার মামা। আমি ঠাট্টা করেছি।' আমার বক্তব্য শোনে ছেলেগুলো হাঁ করে তাকিয়ে রইল। মোটা মিসমিসে ম্যাঁচে কালো যে ছেলেটি এতক্ষণে ইকবাল মামাকে বাপের নাম ভুলে কিল-ঘুষি মেরেছে, সে রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল-

'সত্যি এই লোক ছেলেধরা না?'

'না। উনি আমার মামা।'

'তাহলে এতক্ষণ এই নাটক করে আমাদেরকে কষ্ট দিলি কেন হারামজাদা?'

বলেই ছেলেটি তেড়ে এসে আমাকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে লাগল। যেমন করে এতক্ষণ ইকবাল মামার পেটে-পিঠে আর গালে হাল্ক্কা-পাতলা উত্তম-মধ্যম দিয়েছে। ওরা চলে যেতে যেতে বলল, 'শালা, আর কারও সঙ্গে এমন ফাজলামো করবি না।'

ইকবাল মামা আর আমি, দু'জনেই কিল-ঘুষি খেয়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছি।

'মামা, ব্যথায় তো সারা শরীর ফেটে যাচ্ছে।'

'চল, কোনো ওষুধের দোকান খুঁজি। বাতের বড়ি কিনতে হবে। এমন পাগলামি না করলেও পারতি।'

মামা-ভাগ্নে অহেতুক মার খেয়ে ব্যথা কমাতে আশপাশে কোনো ওষুধের দোকান খুঁজতে মনোযোগী হয়ে হাঁটতে শুরু করেছি।