ক্যাম্পাস

ক্যাম্পাস


নীল দরিয়ায়...

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২০      

নুসরাত জাহান

গত ৭ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ফিল্ড ট্যুর ছিল। আমাদের এই ট্যুরটি অন্য যে কোনো বিভাগের ট্যুরের থেকে আলাদা হয় সব সময়ই। বেশিরভাগ বিভাগ থেকেই আয়োজিত হয় প্লেজারট্রিপ, যেখানে উদ্দেশ্য থাকে শুধুই ঘোরাঘুরি; কিন্তু আমরা যাই প্রকৃতির সান্নিধ্যে। গত তিন বছরে যথাক্রমে বাংলাদেশের তিনটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অঞ্চল- দিনাজপুর, সুন্দরবন ও সিলেট এক্সপ্লোর করে এবার আমাদের স্নাতক সম্মানের শেষ ট্যুরটি ছিল টেকনাফ, কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন রিজিয়নে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আমরা ক্লাসের ৫৮ শিক্ষার্থী রওনা হই। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল টেকনাফ। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার বাসে রওনা হয়ে আমরা পরদিন ৮টার দিকে পৌঁছে যাই টেকনাফ। সেখান থেকে হালকা নাশতা সেরে ৯টার শিপে করে যাত্রা শুরু করি সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে। শিপে ওঠার পর স্বাভাবিকভাবেই সবার মধ্যে এক্সাইটমেন্টটা ছিল খুব বেশি। নিচে তাকালে অবিরাম নীল পানির ঢেউ আর উপরে তাকালে সীমাহীন নীল আসমান। এর মধ্যে ডানা ঝাপটে ঢেউয়ের সঙ্গে ওড়াউড়ি করছে হাজারো শঙ্খ চিল। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম সমুদ্রের কিনার ঘেঁষে টেকনাফ সমুদ্রসৈকত। এই সমুদ্রসৈকত তুলনামূলকভাবে কোলাহলমুক্ত। এরও বেশকিছু দূর যাওয়ার পর যখন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে শিপ হেলেদুলে যাচ্ছিল, তখন সমুদ্রের মাঝে সারি সারি জেলে নৌকা থেকে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেলাম। কত নির্ভয়েই না তারা এই ছোট নৌকা নিয়ে জীবিকার তাগিদে অবিরাম মাছ ধরে যান উত্তাল এই নীল দরিয়ায়। বেখেয়ালি মনে এসব চিন্তা আর মজা করতে করতে কখন যে তিন ঘণ্টা সময় চলে গেল, বুঝতেই পারলাম না। এক বন্ধু খুশিতে আত্মহারা হয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল- 'ওই তো দারুচিনি দ্বীপ। আমরা এসে গেছি।' এরপর জেটির ধারে এসে শিপ থামল।

শিপ থেকে নেমে এই প্রথম পা রাখলাম সেন্টমার্টিনের ভূমিতে। হ্যাঁ, আমরা পৌঁছে গেলাম বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে বা দারুচিনি দ্বীপ বা নারিকেল জিঞ্জিরা, যা কিছুই বলি না কেন। পরদিন ভোরে সবাই ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ি সূর্যোদয় দেখার উদ্দেশ্যে। সকালের শান্ত নিস্তব্ধ প্রতিবেশ দেখতে দেখতে যখন ভেজা বালুর ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল এ যেন স্বর্গ। ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ছিল তীরে। আসলে এই সৌন্দর্য প্রকাশের ভাষা যথেষ্ট নয়। আমার মনে হয়, আমাদের মতো করে কেউ সেন্টমার্টিন ঘোরেনি। সেন্টমার্টিনের সম্পূর্ণ কোলাহলহীন কোকোনাট কোরাল পয়েন্টে যেভাবে ফিনকি দিয়ে কোরালের ওপর ঢেউ আছড়ে পড়ে, কেওড়া বনের মাঝে পাওয়া যায় ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের ফ্লেভার- এমন আর কোথাও পাওয়া যায় না। একাডেমিক কাজ, সেন্টমার্টিনের নীল জলরাশির আছড়ে পড়া ঢেউ, ঢেউয়ের গর্জন, সমুদ্রের পাড় ধরে টংয়ের দোকানগুলোতে সামুদ্রিক মাছ ভাজার ছড়িয়ে পড়া গন্ধ আর পূর্ণিমার আলোয় সমুদ্র তীরের চিকচিক বালুর সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কেটে গেল প্রায় তিনটি দিন। আমাদের ট্যুর শিডিউল থেকে শেষ হয়ে গেল সেন্টমার্টিন। কক্সবাজার থেকে রাত ৯টায় আমরা রওনা হলাম আমাদের সেই পুরোনো ঠিকানায়, ক্যাম্পাসের উদ্দেশে। ফেরার সময় শুধু মনে মনে বারবার বলছিলাম, 'আমরা আবার আসব।' া