জীবনের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় নানা চড়াই-উতরাইয়ের ভেতর পাড়ি দিতে হয়েছে। সময়ের দোলাচলে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। জীবনে চলার পদযাত্রা স্থবির নয়। সুতরাং শেখারও শেষ নেই। পথচলা ও শেখার বিষয়টি পারস্পরিক সম্পর্কিত। শেখার ক্ষেত্রে উঁচু-নিচু কোনো পদসোপান নেই। বড়দের কাছ থেকে যেমন শেখা যায়, তেমনি শেখা যায় ছোটদের কাছ থেকেও। বিভিন্ন ক্ষেত্রে শেখার পরিব্যাপ্তি থাকলেও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রিয় শিক্ষকের স্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছাত্রজীবনে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকের ভূমিকা যে রূপে আবির্ভূত হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সে রূপটি আসে না। প্রাথমিক স্কুলের প্রিয় শিক্ষক, উচ্চ মাধ্যমিকের প্রিয় শিক্ষক আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রিয় শিক্ষকের অবয়ব একই গতিপথে চলাচল করে না। প্রিয় শব্দটির একটি অন্তর্নিহিত অর্থ আপেক্ষিকভাবে উৎসারিত হয়। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কতগুলো প্রিয় ব্যক্তিত্বের মুখ প্রায়ই নয়ন সম্মুখে স্থান করে নেয়। অনেক প্রিয় শিক্ষকের কথা মনে হলেও এই মুহূর্তে একজন প্রিয় শিক্ষকের কথা মনে পড়ছে। হয়তো সেই প্রিয় শিক্ষকের ছোঁয়া না পেলে জীবনটা হয়তো অন্য ধারায় প্রবাহিত হতো।

ছোটবেলা থেকেই আমার অঙ্কের প্রতি অসম্ভব ভীতি কাজ করত। গৃহশিক্ষক, বড় ভাই বা বাবার স্নেহ শাসনের মধ্যে সেই ভীতি কিছুতেই উতরে যেতে পারছিলাম না। সব বিষয়ে প্রথম শ্রেণির নম্বর পাওয়ার পরও অঙ্কের জন্য প্রথম শ্রেণি না পেয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণি পেলে কী হবে- এ ভাবনায় আতঙ্কিত হয়ে উঠতাম। অঙ্ক শিখতে চাইতাম না কিংবা বুঝতে পারতাম না। এমনি এক সন্ধিক্ষণে সাক্ষাৎ পাই আমার নিজের জেলা বা স্থানের নয়, ভিন্ন জেলার এক স্কুলশিক্ষকের। পাবনা জিলা স্কুলের গণিতের এক শিক্ষক আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন। ছয় মাস তার সংস্পর্শে আমার অঙ্ক ভীতি নয়, রীতিমতো লেটার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করি। সেই প্রিয় অঙ্ক স্যার কী সুন্দরভাবে পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি শুধু বুঝিয়ে নয়, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আমাকে যোগ্য করে তোলেন। এখনও যোগ-বিয়োগ কিংবা চলতি নিয়মের কথা এবং হিসাব-নিকাশের সম্মুখীন হলেই সেই প্রিয় স্যারের মুখটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আসলে ভয় কিংবা শাসনের মধ্যে নয়, স্নেহ-ভালোবাসার মধ্য দিয়েও যে কঠিন বিষয় সহজ করে শেখানো যায়, সেটা অঙ্ক স্যারের কাছ থেকে শেখা হয়েছিল। দিকহারা শিক্ষার্থীকে কীভাবে সহজে সঠিক পথটি ধরিয়ে দেওয়া যায়, অঙ্ক স্যার ছিলেন তার অনুকরণীয়। এখনও আমার সেই প্রিয় অঙ্ক স্যারের কথা বারবার মনে পড়ে। প্রিয় শিক্ষকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমার সেই প্রিয় অঙ্ক স্যারের প্রতি বিনম্র সালাম এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

মন্তব্য করুন