৫৪ দেশের আন্তর্জাতিক জোট কমনওয়েলথ। বিশ্বের প্রভাবশালী রাজনৈতিক এই জোট তরুণ উদ্ভাবক, অধিকারকর্মী এবং সেরা উদ্যোক্তাদের প্রদান করে ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড। ১০ মার্চ ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে কমনওয়েলথ এ পুরস্কার ঘোষণা দেয়। এ বছর কমনওয়েলথ ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বাংলাদেশের ফয়সাল ইসলাম। শুধু তাই নয়, তিনি 'কমনওয়েলথ ইয়ং পারসন অব দ্য ইয়ার'ও নির্বাচিত হয়েছেন। প্রান্তিক মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ফয়সাল ইসলাম শুরু করেন তিন চাকার অ্যাম্বুলেন্স সেবা 'সেইফহুইল'। এই প্রতিষ্ঠান ও তার কারিগর ফয়সাল ইসলামের কথা শুনি চলুন...


প্রিয় বন্ধুর বিদায় ও নতুন আইডিয়া

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে জীবনের সঙ্গে লড়ে শেষ পর্যন্ত মারা যান ফয়সালের একান্ত প্রিয় বন্ধু। শুধু একটি অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে সঠিক সময়ে বন্ধুকে হাসপাতালে নিতে পারেননি। দিতে পারেননি চিকিৎসাসেবা। এমন ঘটনায় মুষড়ে পড়েন ফয়সাল ইসলাম। কাছ থেকে দেখেন প্রিয়জন হারানো পরিবারের কষ্ট। আর এই দুর্ঘটনা থেকেই তার মাথায় আসে নতুন আইডিয়া। গড়ে তোলেন 'সেইফহুইল' নামের প্রতিষ্ঠান। নামমাত্র খরচে বর্তমানে সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি মেডিকেল সেবাও দিচ্ছে সেইফহুইল। মূলত প্রান্তিক মানুষের সেবার জন্য শুরু করেন তিন চাকার এই অ্যাম্বুলেন্স সেবা।

গ্রামীণ জনপদে তিন চাকার অ্যাম্বুলেন্স

তিন চাকার এই অ্যাম্বুলেন্সে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আলোচনায় আসেন ফয়সাল ইসলাম। গ্রামীণ জনপদে হাজারও মানুষকে নামমাত্র মূল্যে সেবা দিচ্ছে তার প্রতিষ্ঠান সেইফহুইল। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ১০টি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে এই স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। নিজের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চাইলে ফয়সাল ইসলাম বলেন, '২০১৮ সালের নভেম্বরে হাল্টপ্রাইজে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে সেইফহুইলের যাত্রা। শুরু থেকেই আমরা নামমাত্র খরচে অ্যাম্বুলেন্স সেবা দিয়ে আসছি। বর্তমানে সেইফহুইল ফেনীতে চলমান থাকলেও সামনে অন্যান্য জেলাকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। সেদিন বেশি দূরে নয়; আমরা দেশজুড়ে কম খরচে প্রান্তিক মানুষকে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারব।'

সেরাদের সেরা

৫৪ দেশের আন্তর্জাতিক জোট কমনওয়েলথ। চলতি বছর এই পুরস্কারের জন্য কমনওয়েলথভুক্ত ৫৪ দেশের ৪৩ দেশ থেকে এক হাজার আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে পাঁচ অঞ্চল থেকে ২০ জনকে চূড়ান্ত করে কর্তৃপক্ষ। ২০ জনের মধ্যে আবার আফ্রিকা, ক্যারিবীয়, ইউরোপ, কানাডা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাঁচ ক্যাটাগরিতে পাঁচজনকে আঞ্চলিক বিজয়ী ঘোষণা করে কমনওয়েলথ। নির্বাচিত পাঁচজনের মধ্যে একজনকে এ বছরের সেরা সম্মাননা 'কমনওয়েলথ ইয়ং পারসন অব দ্য ইয়ার' প্রদান করা হয়। এশিয়া অঞ্চল থেকে আঞ্চলিক বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সেইফহুইলের প্রতিষ্ঠাতা ফয়সাল ইসলাম। এখানেই শেষ নয়; ফয়সাল একই সঙ্গে চলতি বছরে সেরাদের সেরা বা 'কমনওয়েলথ ইয়ং পারসন অব দ্য ইয়ার' হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছেন।

যারা হলেন সেরা

এ ছাড়া এশিয়া অঞ্চল থেকে পুরস্কার পেয়েছেন ভারতের এলিনা আলম, পাকিস্তানের সৈয়দ ওমর আমির এবং মালয়েশিয়ার মোগেশ সাবাবাথির। ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে আঞ্চলিক বিজয়ীরা হচ্ছেন- গ্রানাডার শ্যাডেল চার্লস, বার্বাডোসের তাহির বুলবুলিয়া, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর ডাউসের চার্লস ও গায়ানার জুবিলান্তে কাটিং। ইউরোপ ও কানাডা অঞ্চল থেকে অটিস্টিক শিশুদের প্রতি স্কুল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তনে অবদান রাখার জন্য এ বছর আঞ্চলিক বিজয়ী হয়েছেন যুক্তরাজ্যের সিয়েনা ক্যাস্টেলন। এ অঞ্চল থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন- সাইপ্রাসের দিয়াগো আরমান্দো অ্যাপ্রিকিও, যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডলি হেসলপ এবং ইলেনর ম্যাকলনটোশ। আফ্রিকা অঞ্চল থেকে আঞ্চলিক বিজয়ী হয়েছেন সিয়েরা লিওনের জেরেমিথ থোরনকা। এ অঞ্চল থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত অন্যরা হচ্ছেন- আব্দুল রেহমান আলুই, নাইজেরিয়ার ওয়াদি বেন এবং জাম্বিয়ার নাওয়া জোই সিলসহেবো। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য অধিকার ও সুযোগের পক্ষে প্রচার চালানো কর্মসূচির জন্য আঞ্চলিক বিজয়ী হয়েছেন সামেয়ার মাসেলিনা ইয়ুটা। এ অঞ্চল থেকে পুরস্কারপ্রাপ্তরা হচ্ছেন- টোঙার ইলায়সেন লোলোহিয়া মানু, ফিজির শানাল সিভান ও অস্ট্রেলিয়ার টিম লো সুর্ডো।

পুরস্কারের টাকা ও আগামীর স্বপ্ন

পুরস্কারপ্রাপ্ত ২০ জনের প্রত্যেকেই পাচ্ছেন ট্রফি, সনদপত্র ও এক হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড। আঞ্চলিক বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে ৩ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড। আর সেরাদের সেরা মানে কমনওয়েলথ ইয়ং পারসন অব দ্য ইয়ার জয়ী বাংলাদেশের ফয়সাল ইসলাম পাচ্ছেন ৫ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড। এই অর্জন সম্পর্কে ফয়সাল বলেন, 'এই স্বীকৃতির জন্য মনোনীত সবাই নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই তালিকায় উঠে এসেছেন। আর কমনওয়েলথের এমন মর্যাদাপূর্ণ পদক জয়ীদের সেরা হওয়ায় আমি খুবই সম্মানিত বোধ করছি। আশা করি, এই অর্জন কাজে লাগবে সেইফহুইলের প্রসারের ক্ষেত্রে। ৫ হাজার পাউন্ড দিয়ে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাবে সেইফহুইল।' স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে ফয়সাল বলেন, 'দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দেশে প্রায় ১ হাজার ২০০ অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে; যা ৮৮ হাজার লোকের জন্য একটি। ভাবা যায়? এমন পরিসংখ্যান জানার পর আমি অবাক হয়ে যাই। তাও শহরের মানুষ এর মোটামুটি সেবা পেলেও গ্রামের মানুষ প্রায় অবহেলিত। তাই গ্রামীণ জনগণের জন্য সাশ্রয়ী জরুরি পরিষেবা প্রদানকারী একটি মিনি অ্যাম্বুলেন্স বানিয়েছি। এটি গতানুগতিক অ্যাম্বুলেন্সের চেয়ে অন্যরকম। সহজে গ্রামে চলাচল যোগ্য। এ ছাড়া এটি সাশ্রয়ী মূল্যের ও সহজলভ্য। সামনে এই তিন চাকার অ্যাম্বুলেন্স সেবা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়াই আমার স্বপ্ন। শুধু আমার কেন, সেইফহুইলের সঙ্গে আমরা যারা আছি সবাই এই স্বপ্ন দেখি।' দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জরুরি পরিষেবার জন্য সেইফহুইলে ভরসা পাবে। এমন স্বপ্ন আমরা দেখতেই পারি। 

মন্তব্য করুন