২০০৬ সালে বাংলা চ্যানেল আবিস্কারের পর এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি ডবল ক্রস বা দু'বার পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড গড়েন। সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ হয়ে ফের সেন্টমার্টিন আসাকেই বলা হয় ডবল ক্রস। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলা চ্যানেল ডবল ক্রসের রেকর্ড গড়লেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম রাসেল। বাংলা চ্যানেল জয়ী এই তরুণ ইংলিশ চ্যানেল জয়ের স্বপ্ন দেখতেই পারেন। কেননা, দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত বাংলা চ্যানেল ডবল ক্রসের রেকর্ডটি তারই। উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে খেলা করতে করতে এগিয়ে চলা রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগ থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। গত ২৯ মার্চ ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে ডবল ক্রসের লক্ষ্যে সাঁতার শুরু করেন রাসেল। সঙ্গে ছিলেন আরও চারজন। তারা হচ্ছেন- মনিরুজ্জামান, শামসুজ্জামান আরাফাত, এরশাদ খান মুর্শেদ ও রাব্বি রহমান। সবাই সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে টেকনাফ পেঁৗঁছানোর পর ১০ মিনিট বিরতি নিয়ে ফের সাঁতার শুরু করেন। বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে সেন্টমার্টিন তীরে পৌঁছে একমাত্র রাসেলই দেশের ইতিহাসে প্রথম ডবল ক্রসের রেকর্ড গড়েন। রাসেল তার এই জয় নিয়ে বলেন, 'আমি সাঁতার প্রশিক্ষক। সামনের দিনেও সাঁতার নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা। এ ছাড়া সাঁতার নিয়ে মানুষের মধ্যে যে ভীতি আছে, তা দূর করতে চাই। সেই সঙ্গে বিশ্বের কঠিনতম ইংলিশ চ্যানেলসহ সাতটা চ্যানেল পাড়ি দিতে চাই।'

নোনা পানিতে ১০ ঘণ্টা ১৪ মিনিট

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে 'ষড়জ অ্যাডভেঞ্চার ও এক্সট্রিম বাংলা' এই বাংলা চ্যানেল ডবল ক্রস সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। রাসেল (১৭.৫+১৭.৫=৩৫ কিলোমিটার) ১০ ঘণ্টা ১৪ মিনিটে সম্পূর্ণ পথ অতিক্রম করেন। এর আগে তিনবার বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে ৩ ঘণ্টা ৮ মিনিট ৭ সেকেন্ড সময় নিয়ে দ্রুততম সময়ে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড গড়েন। যদিও এই রেকর্ড বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পরের বছরই সাঁতারু সাজ্জাদ ২ ঘণ্টা ৫৯ মিনিট সময় নিয়ে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিয়ে রাসেলের রেকর্ড ভেঙে দেন।

আয়োজকদের ভাষায়

বাংলা চ্যানেল সাঁতারের নিয়মিত আয়োজক ষড়জ অ্যাডভেঞ্চার ও এক্সট্রিম বাংলা। ষড়জ অ্যাডভেঞ্চারের প্রধান নির্বাহী সাঁতারু লিপটন সরকার বলেন, 'এবারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপ থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত সমুদ্রপথ দুইবার বা ডবল ক্রস পাড়ি দিতে নামা পাঁচজনের মধ্যে শুধু সাইফুল ইসলাম রাসেলই তা সম্পন্ন করতে পেরেছেন। ২০০৬ সালে বাংলা চ্যানেল আবিস্কারের পর এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি ডবল ক্রস সম্পন্ন করলেন। এর আগে পৃথকভাবে দুই ভারতীয় সাঁতারু এখানে ডবল ক্রস করেছেন। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডসের একজন সাঁতারু এবং আমি (পড়ূন লিপটন সরকার) ডবল ক্রস করতে নেমে সিঙ্গেল ক্রস শেষ করার পর দ্বিতীয় দফায় মাঝপথে গিয়ে ক্ষান্ত দিই।'

আন্তঃস্কুল থেকে জাতীয় পর্যায়ে

বরগুনার ছেলে রাসেল। তার বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বিষখালী নদীর শাখা খাকধান। এই শাখা নদীতেই তার সাঁতারের হাতেখড়ি। ব্যবসায়ী বাবা নুরুল ইসলাম আর গৃহিণী মা রহিমা বেগম। এই খাকধান থেকে তুলে নিয়েই রাসেলকে ভর্তি করা হয় স্কুলে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়েই আন্তঃস্কুল সাঁতারে প্রথম স্থান অর্জন করেন রাসেল। একে একে থানা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পান। সাঁতার ছাড়াও রাসেল খুব ভালো ফুটবল খেলতেন। ২০০৬ সালে বয়সভিত্তিক জাতীয় ফুটবল ক্যাম্পে ডাকও পেয়েছিলেন। তবে রাসেলের ফলাফল দেখে কোচ পড়াশোনাতেই মনোযোগ দিতে বলেন। কেননা, ক্লাসের পড়ায়ও বড্ড মনোযোগী ছিলেন রাসেল।

চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সাঁতারে

তবে বিরতি আসে পড়াশোনায়। একবার নয়, বারবার। রাজ্যের পিছুটান তাকে যেন টেনে ধরে! তবু নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞানে ভর্তি হন রাসেল। কিছুদিন আগে প্রথম শ্রেণি নিয়ে স্নাতকোত্তর পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ২০১৫ সালে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন রাসেল। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের আয়োজনে সাঁতারে প্রতিভা বা 'ট্যালেন্ট হান্ট'-এর ঘোষণা আসে। দেশের ২৫ হাজার সাঁতারুর মধ্য থেকে ১ হাজার ১০০ জন নির্বাচিত হন। তাদের মধ্যে ১৬০ জন ডাক পান প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। রাসেল এই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ডাক পাওয়াদের একজন। ক্যাম্পে দেশি-বিদেশি কোচদের কাছ থেকে রাসেল শেখেন সাঁতারের কলাকৌশল।

প্রশিক্ষক রাসেল

প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৮ সাল থেকে বাংলা চ্যানেল সাঁতারে অংশ নেওয়া শুরু করেন রাসেল। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলে টানা পাঁচবারের দ্রুততম মানবও নির্বাচিত হন রাসেল। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাঁতার দল এবং ওয়াটার পোলো দলেরও অধিনায়ক তিনি। রাসেলের সাঁতার দক্ষতা নিয়ে ষড়জ অ্যাডভেঞ্চারের প্রধান লিপটন সরকার বলেন, '২০০৬ থেকে ২১ সাল পর্যন্ত টানা ১৭ বার বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিয়েছি। তবু রাসেলের কাছ থেকে সাঁতারের কলাকৌশল শিখি। আমরা তার কাছে সাঁতারের অনুশীলন করি।'

আগামীর স্বপ্ন

রাসেলের কাছে তার স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে এমন অর্জন আমার জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। এই অনুপ্রেরণা কাজে লাগিয়েই জয় করতে চাই ইংলিশ চ্যানেল। নোনা পানির গায়ে উড়াতে চাই লাল-সবুজের পতাকা। বিশ্বকে দেখাতে চাই আমাদের সাহস!' রাসেলের চোখে-মুখে যেন ভেসে উঠেছে ব্রজেন দাশের ছায়া। তার চোখে চোখ রেখে আমরা এই স্বপ্ন দেখতেই পারি- ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া প্রথম বাঙালি ব্রজেন দাশের মতো তিনিও ইতিহাসে জায়গা করে নেবেন। নোনা পানির বুকে উড়িয়ে দেবেন লাল-সবুজের পতাকা! হ

মন্তব্য করুন