মুনজেরিন শহীদ। পড়ছেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। পাশাপাশি দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম ১০ মিনিট স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। তার ভিডিও লেকচার প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছেছে। মুনজেরিনের আইইএলটিএস স্কোর ৮.৫। পড়াশোনা, শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ১০ মিনিট স্কুলের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান নির্বাহী হিসেবেও কাজ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ফুল স্কলারশিপ নিয়ে বর্তমানে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুয়েস্টিক অ্যান্ড সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছেন মুনজেরিন। অনলাইনে আলোচিত এবং জনপ্রিয় এই ইংরেজি শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন আশিক মুস্তাফা

২০২০ সালের এপ্রিলের কথা। দেশে শুরু হয়েছে লকডাউন। সবার মধ্যে তীব্র আতঙ্ক। সেই আতঙ্ক কাজ করে তার ভেতরেও। আর এ আতঙ্ক থেকে হতাশাও যেন ঘিরে ধরে মুনজেরিনকে। ভালো লাগে না কিছুই। ওলটপালট হয়ে যায় মানসিকতাও। এই হতাশা কাটাতে বন্ধুদের কাছে পরামর্শ চান মুনজেরিন। তাদের পরামর্শে শুরু করেন ভিডিও তৈরির কাজ। শুরুতে ভিডিও করার জন্য তার কাছে ছিল না ট্রাইপড। টেবিলের বইয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোন হেলান দিয়ে রেখে বানিয়েছিলেন প্রথম ভিডিও। এপ্রিলের ১৭ তারিখে তিনি প্রথম ভিডিও আপলোড করেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। সে ভিডিও দেওয়ার পর বুক ঢিপঢিপ করে। ভেবেছিলেন, হয়তো কেউ দেখবেনই না তার ভিডিও। আর দু-একজন দেখলেও করবেন হাসাহাসি। কিন্তু না। পেতে থাকেন প্রশংসা। দু'দিনের মধ্যে এক মিলিয়ন ভিউ হয়ে যায়। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, ইংরেজি শেখা ও শেখানোর বড় একটা চাহিদা আছে মানুষের মাঝে। তাই নিয়মিত ভিডিও দেওয়া শুরু করেন। গত এক বছরে প্রায় প্রতিদিনই তিনি নতুন একটা কন্টেন্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই যে ধারাবাহিকতা, সেটাই মুনজেরিনকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন তিনি।

ফেসবুক ইউটিউবে মুনজেরিন

২০২০ সালের এপ্রিলে ইউটিউব চ্যানেলের পাশাপাশি নিজের ফেসবুক পেজও খুলেছিলেন মুনজেরিন। বর্তমানে তার ফেসবুক পেজের অনুসারী প্রায় ১০ লাখ। আর ইউটিউবে তার ভিডিওগুলো ২০ লাখের বেশিবার দেখা হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, ফেসবুকে তার নামে আছে অসংখ্য গ্রুপ। প্রায় দেড় লাখ মানুষ এসব গ্রুপের সদস্য। যদিও এসব গ্রুপ খুলেছেন তার অনুসারীরা।

ডাক্তার না হয়ে ইংরেজির শিক্ষক

মুনজেরিনের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের দেওয়ানবাজারে। ব্যবসায়ী বাবা শহীদ উদ্দিন এবং গৃহিণী মা মনোয়ারা শহীদের দ্বিতীয় মেয়ে মুনজেরিন। ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে মুনজেরিন বলেন, 'আসলে আমাকে দেখে যতটা শান্ত মনে হয়, মোটেও শান্ত ছিলাম না ছোটবেলায়। রাজ্যের দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করত মাথায়। কখনও ঠিকঠাক হোমওয়ার্ক করতাম না। এ নিয়ে কোনো ভয়ও কাজ করত না মনে। দুষ্টুমির জন্য অসংখ্যবার ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছেন স্যার। ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। এতে আরও ভালো লাগত আমার। বারান্দায় দাঁড়িয়েও দুষ্টুমি করতাম। আসলে ক্লাসে দুষ্টুমি করতাম বারান্দায় বের করে দেওয়ার জন্যই। আর বারান্দায় এলে বেড়ে যেত দুষ্টুমির মাত্রা। শুধু স্কুলে নয়; ঘরেও অনেক দুষ্টুমি করতাম। বাবা-মা অতিষ্ঠ হয়ে যেতেন। এখন ভাবতেও অবাক লাগে!'

অন্য আট-দশজনের মতো দুষ্টু-মিষ্ট মুনজেরিন ছোটবেলায় কত কী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন! তবে কখনও ভাবেননি শিক্ষক হবেন। যদিও তখন এইম ইন লাইফ দাবার ঘুঁটির মতো নির্দিষ্ট কোনো ঘরে স্থির থাকত না। একেক সময়ে একেক ধরনের এইম ইন লাইফ ছিল। একেবারে ছোটবেলায় ডাক্তার হতে চাইতেন। কিন্তু যখনই মেডিকেলের গাইডবুক চোখে পড়ে তখন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে আর্কিটেকচারে মন দেন। এর মাঝে বেশ কিছুদিন পাইলট হয়ে আকাশে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্নেও বিভোর ছিলেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় টিকে যাওয়ার পর ইংরেজিতে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্কুল থেকেই ইংরেজি পড়তে ভালো লাগত তার।

মুনজেরিন বলেন, 'স্কুল থেকেই ইংরেজি পড়তে-পড়াতে এবং গল্পের বই ভালো লাগত। তাই ভাবলাম, এই বিষয়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। কারণ সব সময় চাইতাম, এমন কিছু পড়ব, যেটাতে আমি ভালো, যেটা উপভোগ করি। তাই ইংরেজিতে পড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অক্সফোর্ড

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ইংরেজি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন মুনজেরিন। স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। এর পর সম্পূর্ণ স্কলারশিপ নিয়ে পাড়ি দেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। বর্তমানে সেখানে অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুয়েস্টিক অ্যান্ড সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। সেই সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম ১০ মিনিট স্কুলে করছেন শিক্ষকতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই তিনি যুক্ত হন ১০ মিনিট স্কুলের সঙ্গে। কীভাবে যুক্ত হলেন ১০ মিনিট স্কুলের সঙ্গে- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় জানতে পারি, কয়েকজন বন্ধু ১০ মিনিট স্কুলে কাজ করছে। মূলত তাদের কাছেই ১০ মিনিট স্কুল সম্পর্কে জানতে পারি। তখন আমি টুকটাক লিখতাম। সেই লেখালেখির প্রতিভা কাজে লাগিয়ে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করি। শুরুতে এডুকেশনাল ব্লগ লিখতাম ১০ মিনিট স্কুলে। পরে অন্যান্য কাজে যুক্ত হই। সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট, কুইজ ম্যানেজমেন্ট হয়ে এইচআর বা মানবসম্পদ বিভাগে এসে থিতু হই। বর্তমানে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার পাশাপাশি ১০ মিনিট স্কুলের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান নির্বাহী হিসেবেও কাজ করছি।'

প্রকাশিত বই

মুনজেরিনের ভিডিও লেসন আলোচনায় আসতেই ২০২০ সালের জুলাই মাসে অনলাইনে 'ঘরে বসে স্পোকেন ইংলিশ' বইটি প্রকাশ করেন। প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড গড়ে বইটি। প্রায় ৪০ হাজার কপি বিক্রি হয়। এর পর চলতি বছরের শুরুর দিকে 'সবার জন্য ভোকাবুলারি' শিরোনামে দ্বিতীয় বই প্রকাশ করেন। তাও গড়ে বিক্রির রেকর্ড। পাঠকপ্রিয়তা দেখে দুটি বই অমর একুশে বইমেলায়ও প্রকাশ করা হয়। বই দুটির পাঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে মুনজেরিন বলেন, 'শিক্ষার্থীরাই আমার বড় পাঠক। এ ছাড়া চাকরিজীবী, গৃহিণীদের কাছ থেকেও সাড়া পেয়েছি। তাই বলতে পারেন, সবাই পাঠক।'

দেশে ফিরছেন মুনজেরিন

মুনজেরিনের এত পাঠক বা শিক্ষার্থীর মূল রহস্য নিজস্বতা। সেই সঙ্গে আছে সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানোর যোগ্যতা। তিনি রাজ্যের নিয়মকানুন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের মতো সহজ একটা কৌশল তৈরি করতে পেরেছেন। উদাহরণটাও দেন আশপাশ থেকেই। ফলে সবাই খুব সহজেই আয়ত্ত করতে পারেন। আর চলার পথে তিনি নিজে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেসব মাথায় রেখেই তার পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করেন। অক্টোবরে দেশে ফিরছেন মুনজেরিন। তার পর ফের বন্ধুদের সঙ্গে জমাবেন আড্ডা। নতুন করে আরও বড় পরিসরে ইংলিশ লার্নিং নিয়ে কাজ শুরু করবেন। কাজ করবেন আইইএলটিএস নিয়েও। আগামী মাসেই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার আইইএলটিএসের বই। ইংরেজিভীতি সবার মধ্যেই কাজ করে। এই ভয় নামের ভূত তাড়াতেই নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে চান মুনজেরিন। আমরাও সেই প্রতীক্ষার দিন গুনি।

মন্তব্য করুন