এসিআই, আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট। গত মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর মিশিগানের ফার্মিংটন হিলসে নিবন্ধিত বিশ্বের ২৫০ বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় 'এসিআই স্প্রিং কনভেনশন ২০২১'। অংশগ্রহণকারী ২৫০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তৃতীয় স্থান অর্জন করে বাংলাদেশের চুয়েটএক্স। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের আট শিক্ষার্থী দেখিয়েছেন সিমেন্টের পরিবর্তে শিল্পকারখানার বর্জ্য ও নির্মাণবর্জ্য ব্যবহার করেও কংক্রিট ব্লক বানানো সম্ভব। এটি নদীভাঙনে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব, স্থায়ী ও টেকসই সমাধান দেবে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে পুরকৌশলে দ্বিতীয় সেরার পুরস্কার জিতে নেওয়া আট শিক্ষার্থী কথা বলেছেন সাহসের সঙ্গে। তাদের পরিকল্পনা, স্বপ্ন ও বাস্তবতার কথা শুনেছেন সারোয়ার সুমন

কেবল বাংলাদেশ নয়; উন্নয়নশীল অসংখ্য দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা নদীভাঙন। এই সমস্যার সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব, স্থায়ী ও টেকসই সমাধান আজও পায়নি বিশ্ব! বালুর বস্তা ও কংক্রিট ব্লকেই ভরসা করতে হয় নদীশাসনে। প্রচলিত এসব কংক্রিট ব্লকে কংক্রিটের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয় সিমেন্ট; যা প্রকৃতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ বাড়িয়ে পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যার সমাধান হাজির করলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের আট শিক্ষার্থী। তারা দেখিয়েছেন সিমেন্টের পরিবর্তে শিল্পকারখানার বর্জ্য ও নির্মাণবর্জ্য ব্যবহার করেও কংক্রিট ব্লক বানানো সম্ভব। তাদের এই ধারণাকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক নির্মাণ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট বা এসিআই। গত ২৮ মার্চ প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর মিশিগানের ফার্মিংটন হিলসে নিবন্ধিত ২৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে এসিআই স্প্রিং কনভেনশন ২০২১ শুরু হয়। ৩০ মার্চ ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, এসিআইর নিবন্ধিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের দল চুয়েটএক্স।

দলের স্বপ্নবাজরা

চুয়েটএক্সের সদস্যরা হচ্ছেন- চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আনিকা ফারজানা ও লামইয়া ইসলাম, তৃতীয় বর্ষের তাহসিন মাহমুদ, সাফকাত আর রুম্মান, ইসরাত জাহান ও মোসাদ্দেক হামিম এবং দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহতাব ইশমাম ও মুমতাহিনা আলম। এদের সবাই পুরকৌশলের শিক্ষার্থী। এ ছাড়া অনুষদ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একই বিভাগের অধ্যাপক জিএম সাদিকুল ইসলাম। দলের সমন্বয়ক হিসেবে ছিলেন পুরকৌশলের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র শাহরিয়ার ইবনে বাশার।

প্রস্তুতি ও স্বপ্নের চারাগাছ

২০২১-এর শুরু থেকেই এসিআই স্প্রিং কনভেনশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল চুয়েট এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেরা দলটি পাঠানোর জন্য ১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে 'কংক্রিট

সলিউশন কম্পিটিশন' নামে


একটি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সেই প্রতিযোগিতা থেকেই উঠে আসে চুয়েটএক্স। এসিআইর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী তারা তাদের পুরো প্রকল্পের ধারণা ছয় মিনিটের একটি ভিডিও উপস্থাপনার মাধ্যমে গত ৭ মার্চ ইউটিউবে আপলোড করেছিলেন। ২৩ মার্চ প্রথমে সেরা ২০টি দলের মধ্যে জায়গা করে নেয় চুয়েটএক্স। ২৮ মার্চ অনলাইনে দলের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেন এসিআইর বিচারকরা। সবশেষে ৩০ মার্চ দ্বিতীয় রানারআপ হিসেবে ঘোষণা করা হয় চুয়েটএক্সের নাম।

এসিআই থেকে যা পাচ্ছে চুয়েটএক্স

এসিআই স্প্রিং কনভেনশন ২০২১ প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জনের পুরস্কার হিসেবে আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট বা এসিআই চুয়েটএক্সের প্রত্যেক সদস্যকে একটি সনদ ও দলীয়ভাবে ২৫০ ডলার দেবে। আর্থিকভাবে এটা অনেক বড় না হলেও অনেক সম্মানের বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রফিকুল আলম। তিনি বলেন, 'আমরা যে গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছি, এই পুরস্কার তারই প্রমাণ। চুয়েট পরিবার তাদের সাফল্যে অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।'




রিসাইকেলড জিওপলিমার কংক্রিট

তাদের এই গবেষণা কী এবং কীভাবে কাজ করবে, তা জেনে নিই চলুন; বর্তমানে কংক্রিট ও সিমেন্টের ব্যবহারে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্রমবর্ধমান হুমকির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিল্পকারখানাগুলো ক্রমেই তৈরি করে যাচ্ছে ফ্লাই অ্যাশ, স্ল্যাগ ও ডেমোলিশান ওয়েস্টের মতো অতিরিক্ত বর্জ্য, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুনর্ব্যবহার বা নিস্কাশন ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না। ফলে বেড়ে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ দুর্যোগের সম্ভাবনা। অন্যদিকে নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নির্ভরযোগ্য আর টেকসই সমাধানের দাবি রেখে পৃথিবীজুড়ে পৌঁছেছে চরম সীমায়। বালুর প্রাকৃতিক মজুদের অভাবের সঙ্গে স্বল্প ডিউরেবিলিটি, পুনঃব্যবহারের অযোগ্যতা এবং ডিসপোজ করার কঠিনতার জন্য বালুর বস্তার মতো প্রচলিত বাঁধ ব্যবস্থা এখন আর নির্ভরযোগ্য নয়। আবার তুলনামূলক ভালো সমাধান হিসেবে গৃহীত কংক্রিট ব্লক সিমেন্টের ব্যবহারে তৈরি হওয়ায় এতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়। আমরা জানি যে, পুরো পৃথিবীর মানবসৃষ্ট কার্বন ডাই-অক্সাইডের ৮ শতাংশ আসে এই সিমেন্ট শিল্প থেকে। পরিসংখ্যান বলছে, নগরায়ণের ক্রমবিকাশের কারণে এই সিমেন্ট উৎপাদন ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬.১ বিলিয়ন ম্যাট্রিক টনের কাছাকাছি যাবে। সুতরাং এর ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আনলে, ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ পরিণতি। অন্যদিকে নদীভাঙনের সমস্যাও থেমে নেই। প্রতিবছর প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ এর দ্বারা প্রভাবিত এবং ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় ২০ হাজার মানুষ এর কারণে হচ্ছে স্থানান্তরিত। এ ছাড়া পরিবেশগত ও আর্থ-সামাজিক প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে উর্বর আবাদযোগ্য জমির বিলীন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও বিভিন্ন দেশজুড়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সুতরাং এই বহুমাত্রিক সমস্যাগুলোর সমাধান দেওয়াই এ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য।

প্রশ্নের পিঠে উত্তর

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিও পলিমার কংক্রিট কীভাবে সমস্যাগুলোকে একত্র করে একটি কার্যকর সমাধান আনবে? এর সমাধানে আট তরুণের ব্যাখ্যা, 'পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিও পলিমার কংক্রিট নির্মাণ শিল্পকে ক্ষার সক্রিয়করণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্মাণ সামগ্রীগুলোকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে একটি টেকসই সমাধান সরবরাহ করে। এই প্রক্রিয়াতে শিল্প উপজাতগুলো থেকে প্রাপ্ত সিলিকা এবং অ্যালুমিনা এমন একটি বাঁধাই উপাদান হিসেবে কাজ করে, যেখানে পলিমারীকরণ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়; পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিও পলিমার কংক্রিট ব্লকগুলো নদীর তীরকে সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট শক্তি সরবরাহ করে। কারণ নদীভাঙন প্রতিরোধে কংক্রিট ব্লকগুলোর শক্তি কম হলেও চলে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুসারে, ফিলার ম্যাটেরিয়ালগুলোকে আংশিক অথবা পুরোপুরিভাবে নির্মাণ বর্জ্য যেমন রিসাইকেলড গ্লাস, সিরামিক বর্জ্য বা খনির বর্জ্য দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যাবে।'

নদীতীর রক্ষায় আরজিপিসি

রিসাইকেলড জিওপলিমার কংক্রিট বা আরজিপিসির মাধ্যমে বহুমুখী সুবিধা পাওয়া সম্ভব। যেমন- ফ্লাই অ্যাশ, গ্রাউন্ড গ্র্যানুলেটেড ব্লাস্ট ফার্নেস স্ল্যাগ ও খনিজ বর্জ্যের মতো শিল্প বর্জ্যগুলোর পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করে। এ ছাড়া এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করতে সাহায্য করে। অরডিসারি পোর্টল্যান্ড সেমেন্ট বা ওপিসি কংক্রিট ব্লকের চেয়ে ভালো এব্রেশান রেজিস্ট্যান্ট বল সরবরাহ করে। অ্যাসিডিক ও নোনতা পরিবেশ উভয়ের মধ্যেই কাজ করার চমৎকার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ ছাড়া নদীর তীর রক্ষার জন্য ওপিসি কংক্রিট ব্লকের চেয়ে আরজিপিসি অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক।

আগামীর স্বপ্ন

চুয়েটএক্সের সদস্য মাহতাব ইশমাম বলেন, 'আমরা দেখিয়েছি পুনর্ব্যবহূত জিওপলিমার কংক্রিট নদীভাঙন সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি শিল্পজাত বর্জ্য এবং নির্মাণ বর্জ্যের টেকসই সমাধান দেবে। এ ছাড়া এটি প্রাকৃতিক পাথরের শোষণ, সিমেন্টের ব্যবহার এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনকে হ্রাস করে। আর এতে পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক সুবিধাও রয়েছে।' আগামীর পৃথিবীকে আরও সুন্দর এবং বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে নদীতীরগুলো সুরক্ষায় আরজিপিসি ব্যবহার করা হবে; এমন স্বপ্নই দেখেন চুয়েটএক্সের সদস্যরা। তাদের সেই স্বপ্নে আস্থা রাখতে পারি আমরাও।

মন্তব্য করুন