শমী হাসান চৌধুরী ও রিজভী আরেফিন। তাদের সামাজিক সংগঠন 'অ্যাওয়ারনেস ৩৬০'। ২০২১ সালে এই দুই তরুণ পেয়েছেন ফোর্বসের স্বীকৃতি। কমিউনিটি সেবায় অবদানের জন্য পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। তাদের 'অ্যাওয়ারনেস ৩৬০'-এর উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হয়েছেন কিংবদন্তি বাস্কেটবল রেফারি বব ডিলানি, রয়্যাল চ্যারিটি ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডের প্রধান নির্বাহী টেসি ওজো এবং জনপ্রিয় ব্রিটিশ অভিনেতা কেল স্পেলম্যান। তারা অ্যাওয়ারনেস ৩৬০কে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে কাজ করবেন। বিশ্বের ২৩ দেশের ১৬ থেকে ২৭ বছর বয়সী প্রায় ১ হাজার ৫০০ তরুণ স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে নিজেদের উদ্যোগ পরিচালনা করছেন শমী ও রিজভী। তাদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন  কৌশিক শুভ্র

একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক। ২০১৪ সালের কথা। মানুষ তখন ভুগছিল ডায়রিয়ায়। একদিন না পেরোতেই মৃত্যু! সেই মৃত্যুর মিছিলের একজন আশরাফুন নেসা। তার এমন আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি পরিবারের কেউই। এমন মৃত্যুর কথা ভাবতেও পারেনি আশরাফুন নেসারই বড় মেয়ে শমী। এটি যে তারই মা। সেদিন থেকে বদলে যেতে থাকে তার মানসিকতা। এই ডায়রিয়া সচেতনতায় নেমে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তা-ই করলেন। বর্তমানে এসে এই মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে চোখ টলমল করে শমীর। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে গরম জল। শমী বলেন, 'ডায়রিয়া প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কিন্তু এতে বিশ্বের অগণিত মানুষের মৃত্যু মেনে নেওয়া সত্যিই কষ্টকর। মা হারানো এই শোক সত্যিই আমাকে নাড়িয়ে দেয়। ডায়রিয়া প্রতিরোধে কাজ করার লক্ষ্যটা মনের মধ্যে ধারণ করি তখনই। তবে অবাকও হতাম এই ভেবে, ২০১৪ সালে এসেও মানুষ ডায়রিয়ায় মারা যেতে পারে!'

মায়ের মৃত্যুর চার দিন পর সচেতনতার পথে...

শমী ভাবেন, তার পরিবার শিক্ষিত ও সচেতন। অথচ তার পরিবারে এমন হলে যারা স্বল্প শিক্ষত, যাদের শিক্ষা নেই, টয়লেট নেই, সচেতনতা নেই- সেসব পরিবারের কী হবে? এসব ভেবেই ঠিক করেন, তার মতো আর কেউ যেন মা-হারা না হন। শুরু করেন নিরাপদ পানি, পয়োনিস্কাশন ও পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার কাজ। মায়ের মৃত্যুর মাত্র চার দিন পরই ময়মনসিংহের হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে হাজির হন শমী। তাদের শোনালেন ছোট্ট ভুলে মাকে হারানোর সেই কষ্টের কথা। লক্ষ্য একটাই, যেন মানুষ সচেতন হন।

অ্যাওয়ারনেস ৩৬০-এর যাত্রা

চলছে পড়াশোনাও। ভর্তি হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে এসে খোঁজ পেলেন নিজের ভাবনার সঙ্গে মিল- এমন অন্য আরেক তরুণ রিজভী আরেফিনের। সাতপাঁচ না ভেবে ২০১৪ সালের অক্টোবরে রিজভীসহ শুরু করলেন সেবামূলক সংস্থা 'অ্যাওয়ারনেস ৩৬০'। শুরুটা পানি ও স্যানিটেশনের প্রচারণা দিয়ে হলেও পরবর্তী সময়ে এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে স্বাস্থ্য ভালো রাখাসহ বস্তিতে থাকা যেসব মানুষের কাছে সাধারণত কেউ যেতে চায় না তাদের আচার, ব্যবহার, সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। কখনও এই গ্রাম, কখনও আরেক গ্রাম, সচেতনতার বার্তা নিয়ে বস্তিসহ বিভিন্ন স্থানে ছুটেছেন তারা। দেখেছেন স্বাস্থ্যবিধির প্রাথমিক ধাপগুলোও জানা নেই অধিকাংশের। বস্তির লোকও তাদের দেখে ভাবত, কেনই বা এই তরুণরা তাদের জন্য কাজ করছে!

২০৩০ সালের বৈশ্বিক এজেন্ডা

ডায়রিয়ায় প্রাণ হারানো মানুষের পরিসংখ্যানের বিপরীতে মানুষকে শুনিয়েছেন নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা। তাই তো নিজেদের কাজ দিয়ে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে তাদের কুয়ালালামপুরভিত্তিক এই এনজিও প্রতিষ্ঠান 'অ্যাওয়ারনেস ৩৬০'-এর কার্যক্রম। ২০৩০ সালের বৈশ্বিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে অবদান রাখার লক্ষ্য নিয়ে বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। রিজভী বলেন, 'আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, সেই তরুণদের জন্য পরিবর্তন তৈরির পথ সুগম করা, যারা তাদের দেশের জন্য কিছু করতে চায়। অনেকেই জানে না, একা তারা কীভাবে শুরু করবে। এর জন্য প্রয়োজন নির্দেশনা এবং রিসোর্সের; যা দেওয়ার জন্য আমরা কাজ করছি'- বললেন কমিউনিটি সেবার ক্ষেত্রে তরুণদের বাধার কথাও।

২৩ দেশের ১৫০০ স্বেচ্ছাসেবক

বর্তমানে ২৩ দেশের ১৬ থেকে ২৭ বছর বয়সী প্রায় ১ হাজার ৫০০ তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে নিজেদের উদ্যোগ পরিচালনা করছে অ্যাওয়ারনেস ৩৬০। নিজেদের অবস্থান দেশে হলেও ভার্চুয়াল দুনিয়ার সাহায্যে একত্র করেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্বেচ্ছাসেবককে। নিয়মিত ভার্চুয়ালি সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। পড়াশোনার কথা জানতে চাইলে রিজভী বলেন, 'শুরুতে কিছুদিন দেশে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে পরে অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনায় স্নাতক করেছি ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া থেকে। সেখানে আমরা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধিও করেছি।'

পুরস্কার-সম্মাননা

তাদের এই যাত্রার সময়টা খুব বেশি দীর্ঘ না হলেও নিজেদের কাজের মাধ্যমে অর্জন করেছেন অসংখ্য স্বীকৃতি।

কমিউনিটি সেবায় অবদানের জন্য গ্লোবাল সিটিজেন এবং গ্লোবাল চেঞ্জমেকার্সের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন সম্মাননা। এ ছাড়া সম্মাননার তালিকায় আছে দ্য ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড, ইউএনডিপি, দ্য ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং দ্য কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সম্মাননা। পেয়েছেন খ্যাতিমান বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে স্বীকৃতি। পেয়েছেন ফোর্বসের স্বীকৃতিও। তাদের দু'জনকে উল্লেখ করা হয়েছে 'ফিচারড অনারারি' হিসেবে।

যুক্ত হয়েছেন বব, ওজো এবং কেল স্পেলম্যান

সম্প্রতি অ্যাওয়ারনেস ৩৬০-এর উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হয়েছেন বিশ্বের ৩ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তারা হচ্ছেন- কিংবদন্তি বাস্কেটবল রেফারি বব ডিলানি, রয়্যাল চ্যারিটি ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডের প্রধান নির্বাহী টেসি ওজো এবং জনপ্রিয় ব্রিটিশ অভিনেতা কেল স্পেলম্যান। অ্যাওয়ারনেস ৩৬০কে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে কাজ করবেন তারা। এক বিবৃতিতে তিনজন জানিয়েছেন নিজেদের অনুভূতির কথা। জানিয়েছেন, অ্যাওয়ারনেস ৩৬০ হয়ে কাজ করার কথা। সেই সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, এই সংগঠনের ওপর নিজেদের আস্থার কথাও। ২৪ বছর বয়সী শমী, রিজভী ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যুক্ত হওয়া তরুণ স্বেচ্ছাসেবীর স্বপ্ন দেখেন, একটি সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠবে আগামী প্রজন্ম। শান্তি বিরাজ করবে পৃথিবীতে।

মন্তব্য করুন