আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় জেলা রাঙামাটি। অথচ এখানে রক্ত সংরক্ষণের স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই দুর্গম উপজেলা থেকে আসা রোগীরা পড়ত চরম বিপাকে। এই সমস্যা নিরসনের জন্য সাজিদ বিন জাহিদ ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে গড়ে তোলেন রক্তদানভিত্তিক সামাজিক সংগঠন 'জীবন'।

জীবন তার কার্যক্রম পরিচালনার পর থেকে এই পর্যন্ত প্রায় দশ হাজারের বেশি ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বর্তমানে সংগঠনটির ১৫০০ নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী ও ৫০০০-এর বেশি স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা আছেন। এ ছাড়া ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে সংগঠনটি। এ পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি নারীকে মাসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন করেছে। পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনপদের মানুষকে প্রযুক্তির মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা বেশ চ্যালেঞ্জিং বটে। এই বিষয়ে জানতে চাইলে জাহিদ বলেন, 'এই ধরনের কার্যক্রম পাহাড়ে নেই বললেই চলে। এ ছাড়া পাহাড়ের সর্বত্র নেটওয়ার্ক তেমন কাজ না করায় যথাযথ কাজ করাও হয়ে ওঠে চ্যালেঞ্জিং। তবু আমরা কাজ করেছি নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে।'

করোনার সময়ের শুরু থেকেই তৎপর ছিল জীবন-এর গ্রিন আর্মি টিম। তারা স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে করোনা সচেতনতা বিষয়ক কর্মশালা ও মাঠপর্যায়ে প্রচারণা চালিয়েছে। মাস্ক বিতরণ, স্যানিটাইজার তৈরি ও জনগণের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া, রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাতে জীবনের স্বেচ্ছাসেবীরা নিয়মিত কাজ করেছে।

জীবন তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে পেয়েছে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড। এ ছাড়া ব্যক্তিগত ক্যাটাগরিতে বিওয়াইএলসি ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন জাহিদ। এসব অর্জনের মাঝেও জাহিদের কাছে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসাটাই বড় অর্জন বলে মনে হয়।

জাহিদ রাঙামাটিরই ছেলে। রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং রাঙামাটি সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে বর্তমানে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। জাহিদের সংগঠন মূলত জরুরি রক্তের প্রয়োজনে রক্তদাতা ও রক্তগ্রহীতার মাঝে সংযোগ স্থাপন করিয়ে দেয়। এজন্য সংগঠনটির রয়েছে নিজস্ব ডাটাবেজ। কারও রক্তের প্রয়োজন হলে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতারা সশরীরে গিয়ে রক্তদান করে থাকেন। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের মাধ্যমেই প্রায় দশ বছর নিয়মিত কাজ করছে জীবন। রক্তদানের জন্য কাজ শুরু করলেও সংগঠনটি বর্তমানে সমাজের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও তরুণদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার লক্ষ্যেও কাজ করছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক প্রোগ্রাম পরিচালনা করা এবং নারী স্বাস্থ্য; বিশেষ করে প্রজনন স্বাস্থ্য, মাসিক স্বাস্থ্য ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতনতামূলক বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালনা করছে জীবন।

সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করা এবং তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যেও কাজ করতে চান জাহিদ। জাহিদ মনে করেন, যে কোনো ভালো কাজের পেছনে আবেগ থাকতে হবে। অনেকেই বলেন, আবেগের বশবর্তী হয়ে কাজ করা যাবে না। তবে আবেগ ছাড়াও কাজ করা সম্ভব নয়। দেশের তরুণদের মধ্যে যে সম্ভাবনা ও উদ্যম রয়েছে তা কাজে লাগাতে হবে। যে কোনো পদক্ষেপ, তা যদি ভালোর জন্য হয় তবে তা নিয়ে লেগে থাকতে হবে, এমনটাই মনে করেন এই তরুণ সংগঠক। া

মন্তব্য করুন