অনিক সরকার। কাজ করছেন বিশ্ব কাঁপানো টেক জায়ান্ট গুগলে। ২০১৪ সালে বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে আলোচনায় আসেন অনিক। বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে অবস্থিত গুগলের ইউরোপিয়ান হেডকোয়ার্টারে কাজ করছেন। কীভাবে যোগ দিলেন গুগলে এবং কী কাজ করছেন তিনি; এসব নিয়ে কথা বলেছেন সাহসের সঙ্গে। শুনেছেন কৌশিক শুভ্র



অনিকের জন্ম চট্টগ্রামে। শৈশবও কেটেছে প্রাণের এই শহরে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে। যেখানে জড়িয়ে আছে কৈশোরের অসংখ্য স্মৃতি। মায়ের সঙ্গে স্কুলে যাওয়া। লাল দালানের বিল্ডিং। বিশাল বড় দুটো মাঠ। একগাদা বন্ধু; বলতে থাকেন অনিক। তার চোখ যেন ঝাপসা হয়ে আসে! বলেন, 'কিছুতেই ভুলতে পারি না আমার শেকড়।' ভোলার কথাও নয়! অনেক কিছু মনে করিয়ে দেয় কলেজিয়েটের প্রিয় জাহিদ স্যার, প্রয়াত আবছার স্যার, প্রধান শিক্ষক আজিজ স্যারদের কথা। অনিক মনে করেন, তার অনুপ্রেরণা, সাহস সবকিছুর শুরুটা এই চট্টগ্রাম আর এই কলেজিয়েট স্কুল থেকেই। স্যাররা প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়েছেন। প্রয়োজনে রাঙিয়েছেন চোখ। কলেজিয়েট-পরবর্তী গন্তব্য চট্টগ্রাম কলেজ। স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ক্যাম্পাসেও। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনিক বলেন, 'চট্টগ্রাম কলেজের মোজাম্মেল স্যার, হাসান স্যার, প্রদীপ স্যারদের রাজ্যের প্রশ্ন করতাম। স্যাররা বিরক্ত হয়ে যেতেন। তবু তারা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের পাণ্ডিত্য দেখেও অবাক হতাম। আমি আসলেই কৃতজ্ঞ যে তারা আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতেন প্রচণ্ড ধৈর্য আর ভালোবাসা নিয়ে।'

শৈশবের অনিকের কথা কল্পনা করে অনেকেই ভেবে বসেন, ছেলেটা হয়তো রাতদিন এক করে পড়াশোনা করতো। এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল আমার মাথায়ও। তাই প্রশ্নটা করতেই অনিক হেসে উঠে বলেন, 'রাতদিন নয় বরং প্রয়োজনমতোই পড়েছি। তবে কেবল পাঠ্যবই নয়। বিভিন্ন বিষয় এবং বিভিন্ন বইয়ে ছিল আমার আগ্রহ। তাই অনেক বিষয়ের বই পড়া হয়েছে।'

বুয়েট সেরার মুকুট

কলেজ শেষ হতে না হতেই অন্য আট দশজনের মতো ভাবনায় পড়েন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি নিয়ে। ২০১৪ সালের কথা। অনিককে মনে করিয়ে দিতেই তিনি বলেন, 'জীবনের গুরুত্বপূর্ণ, চ্যালেঞ্জিং এবং স্বপ্নের মতো একটি বছর ২০১৪। তবে বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার পর নিজের প্রতি একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।' এই আত্মবিশ্বাসের জোর আর পরিশ্রমের ফল পেয়েছিলেন অনিক। সবাইকে তাক লাগিয়ে দখল করে নিলেন বুয়েটের প্রথম স্থান।

স্বপ্ন দেখার শুরু...

বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে অনিক ভর্তি হন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। বুয়েটের কথা আসতেই অনিক বলেন, 'বুয়েট এক কথায় আমার জন্য এক নতুন দুনিয়ার প্রবেশদ্বার। চুপচাপ প্রকৃতির এই আমি মানুষের সঙ্গে তখন প্রাণ খুলে মিশতে শিখি। যেন এখানেই আমার নতুন জন্ম হয়েছে!' নতুন স্বপ্ন, নতুন চ্যালেঞ্জ ভালোই নিয়েছেন তখন অনিক। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে থাকেন।

নিজেকে তুলে ধরতে শিখেছেন বিভিন্ন শীর্ষ প্ল্যাটফর্মে। বুয়েট অধ্যায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, 'বুয়েটের রঙিন গল্প বলতে শুরু করলে তা আর শেষ হবে না।' অনিক তখন পড়াশোনার পাশাপাশি কম্পিটেটিভ প্রোগ্রামিং থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বড় বড় শহরে প্রচুর প্রোগ্রামিং কনটেস্টে অংশ নেন। সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন সংগঠক হিসেবেও। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, টাকা-পয়সার হিসাব রাখা, প্রকাশনীর কাজকর্ম, আরও কত অভিজ্ঞতা যে আছে বুয়েট দিনের ঝুলিতে। টুকটাক গানও গাইতেন তখন অনিক। সোচ্চার ছিলেন বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডেও।

যখন শিক্ষক ছিলেন

নিজে শেখার চেয়েও অনিকের আগ্রহের জায়গা মানুষকে শেখানোয়। নিজের জানা বিষয় অন্যদের শেখাতে ভালোবাসেন। তাই তো তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকতার তকমাটিও। কাজ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং নিয়ে কাজ করা দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান 'উদ্ভাস'-এর সঙ্গে। বিভিন্ন বিষয়ে লেকচার দিয়েছেন ভার্চুয়াল শিক্ষা কার্যক্রম অন্যরকম পাঠশালাতেও। গেস্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে প্রোগ্রামিং ট্রেইনার হিসেবে এক বছরেরও বেশি সময় কাজ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনিকের কাছে এই শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা এখনও যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়। এই কাজ করতে গিয়ে শেখানোর চেয়ে শিখেছেন অনেক বেশি- এটাই মনে করেন তিনি।

অনিকের গুগল অধ্যায়

বুয়েট থেকে স্নাতকোত্তর শেষে অনিকের বর্তমান অধ্যায় গুগলের সঙ্গে। বুয়েটে থাকাকালে কম্পিটেটিভ প্রোগ্রামিং করতেন। ফলে ভালো ছিলেন এলগরিদম প্রবলেম সলভিং স্কিলে। অন্যদিকে টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানের খোঁজ থাকে এই স্কিলের কর্মীদের। মিলে যায় অনিকের সঙ্গে। স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয় বিশ্ব কাঁপানো টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান গুগলের সঙ্গে। গুগলে যোগদানের প্রক্রিয়া কেমন ছিল তা জানতে চাইলে অনিক বলেন, 'গুগলে আবেদনের পর তাদের টিম আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রথমে একটা ফোন কোডিং ইন্টারভিউ হয়। যেটাতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর পাঁচটি অনসাইট ইন্টারভিউ হয়। ভার্চুয়ালি এই অনসাইট রাউন্ড উত্তীর্ণ হওয়ার পর টিম ম্যাচিং ইন্টারভিউ; এসব ঠিকঠাক শেষ করার পর গুগলের কাছ থেকে সেই কাঙ্ক্ষিত অফার লেটার হাতে আসে।'

এরপর কাজ শুরু করেন গুগলের ইউরোপিয়ান হেডকোয়ার্টার আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে গুগল ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম পার্সিস্টেন্ট ডিস্ক এসআরই টিমের সঙ্গে। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল বিশ্ব কাঁপিয়ে রাখা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। কিন্তু এখনও পেলেন না অভিযোগ করার মতো কোনো বিষয়। বাবা জীবেন্দ্রনাথ সরকার এবং মা অর্চনা সরকারের একমাত্র সন্তান অনিকের ভাষায়, 'কাজের কোয়ালিটি, কাজ-ব্যক্তিগত জীবনের ব্যালান্স, টিমওয়ার্ক ইত্যাদিই বলে দেয় গুগলে কেন আজ এই পর্যায়ে।'

দেশ থেকে দূরে কাজ করলেও অনিকের কাছে দেশই আগে। কখনোই ভুলতে চান না নিজের শেকড়। ফিরে আসতে চান লাল-সবুজের বাংলাদেশে। তার গুগল অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে হয়তো দেশের উন্নয়নে।

মন্তব্য করুন