কভিড-১৯ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় একই হারে নারী ও শিশু পাচার হয়ে আসছে পার্শ্ববর্তী দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে। আমাদের দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দরিদ্র নারী ও শিশুরা পাচারকারী চক্রের জালে ধরা পড়ে উন্নত জীবন এবং অর্থ আয়ের প্রলোভনে। অপহৃত হয়েও পাচারের শিকার হন অনেকে। সুখী ও উন্নত জীবনের প্রলোভনে পড়ে আশ্রয়হীন; অসহায় ও হতাশাগ্রস্ত শহরমুখী নারী ও শিশুরাও পাচারের কবলে পড়ে থাকে...

বর্তমান আধুনিক বিশ্বে 'মানব পাচার' অন্যতম জঘন্য অপরাধ হিসেবে পরিগণিত। বাংলাদেশের মতো দারিদ্রপীড়িত রাষ্ট্রে এই সমস্যা সমাজের বেশ গভীরে প্রোথিত। ইতিহাসের তথ্য মতে, ১২০০ শতক থেকেই পুর্তগিজদের হাত ধরে আফ্রিকান কালো মানুষদের জোরপূর্বক সে দেশে নিয়ে আসা হতো দাস বানিয়ে। ধীরে ধীরে এই প্রথা ইউরোপ-আমেরিকার অন্যান্য দেশও গ্রহণ করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিভিন্ন মাধ্যমে, নানা নামে বিগত প্রায় হাজার বছর ধরেই আমাদের সভ্যতায় মানব পাচারের প্রথা এখনও চলমান।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৯৪ সালের অনুষ্ঠিত এক সভায় মানব পাচার বলতে উন্নয়নশীল ও দ্রুততম অর্থনৈতিক পরিবর্তনশীল দেশগুলোর জাতীয় সীমানার বাইরে পাচারকারী, নিয়োগকারী ও অপরাধচক্র কর্তৃক মুনাফার জন্য নারী ও শিশুদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে এবং জোরপূর্বক অর্থনৈতিক ও যৌন উৎপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডে- যেমন জোরপূর্বক গৃহভৃত্যের কাজ, বিবাহ, দত্তক এবং গোপন কাজে নিয়োগের জন্য ব্যক্তির অবৈধ গোপনীয় স্থানান্তরকে বুঝায়।

কভিড-১৯ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় একই হারে নারী ও শিশু পাচার হয়ে আসছে পার্শ্ববর্তী দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে। আমাদের দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দরিদ্র নারী ও শিশুরা পাচারকারী চক্রের জালে ধরা পড়ে উন্নত জীবন এবং অর্থ আয়ের প্রলোভনে। অপহৃত হয়েও পাচারের শিকার হন অনেকে। সুখী ও উন্নত জীবনের প্রলোভনে পড়ে আশ্রয়হীন; অসহায় ও হতাশাগ্রস্ত শহরমুখী নারী ও শিশুরাও পাচারের কবলে পড়ে থাকে। একশ্রেণির মুনাফালোভী ব্যবসায়ী চক্র নারী ও শিশুদের চাকরি, বিবাহ, ভালোবাসা বা নানা কিছুর প্রলোভন দেখিয়ে তাদের বিদেশে পাচার করে চলেছে। বছরের পর বছর এসব পাচারকৃত নারী ও শিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতন সহ্য করছে এবং ব্যবহূত হচ্ছে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। নারী ও শিশু পাচারের প্রায় অধিকাংশই ঘটে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে। শ্রমিক, যৌনদাসী, ভিক্ষুক, উটের জকি হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রতি বছর কয়েক লাখ নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

র‌্যাবের দেওয়া তথ্য মতে, আমাদের দেশ থেকে গত দেড় বছরে ড্যান্স ক্লাবের আড়ালে বিভিন্ন দেশে সহস্রাধিক নারী পাচারের শিকার হয়েছেন। সম্প্রতি একটি মানব পাচারকারী দালাল চক্রের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করার পর জানা যায়, পাচারকারী চক্রটি নারায়ণগঞ্জে একটি নাচের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলে বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির মালিকের সঙ্গে যোগসাজশে সহস্রাধিক নারী পাচার করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে এই চক্রের ছয়জন গ্রেপ্তার হওয়ার পর তারা পাচারের কৌশল পাল্টে ফেলেন। আগে তারা সরাসরি দুবাই ও মালয়েশিয়ায় নারীদের পাচার করতেন এবং এখন সেটি না করে আরও কয়েকটি দেশকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করেন। এ ছাড়া ঢাকার কামরাঙ্গীরচর ও মুগদা এলাকা থেকে সম্প্রতি একটি মানব পাচার চক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১১, যাদের মধ্যে একজন নারী। তাদের কবল থেকে উদ্ধার করা হয় পাচারের জন্য নিয়ে আসা দুই তরুণীকেও। র‌্যাব জানায়, চক্রটির সঙ্গে এজেন্ট, পাসপোর্টের দালাল, ড্যান্স বারের মালিক, ট্রাভেল এজেন্সি ও অসাধু ব্যক্তিরা যুক্ত। চক্রের এজেন্টরা নিম্নবিত্ত পরিবার, পোশাকশিল্প এবং ডিভোর্সি সুন্দরী তরুণীদের টার্গেট করে থাকে।

মানব পাচার সংকট মোকাবিলার উপায়, রাষ্ট্র ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের কর্মপন্থা সম্পর্কে জানাতে আইক্যান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সম্প্রতি শেষ হওয়া এক ভার্চুয়াল সম্মেলনে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) জেন্ডার এক্সপার্ট বীথিকা হাসান জানালেন এক উদ্বেগজনক তথ্য। তার দেওয়া তথ্য মতে, বিশ্বজুড়ে মানব পাচারের শিকার ৭০ শতাংশই নারী এবং চারজনের মধ্যে তিনজনই যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

পাচারকারীরা বাংলাদেশঘেঁষা ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত ব্যবহার করে পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে নারী ও শিশুদের পাচার করে থাকে। দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সীমান্ত পথ দিয়ে পণ্যসামগ্রী পাচারের পাশাপাশি নারী ও শিশু পাচার হয়ে থাকে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৩০৩ জন নারী ও ৫২ জন শিশুকে পাচারকালে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়াও পুরুষ পাচারকালে আটক করা হয়েছে ৫৭৭ জনকে। এই সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মাত্র একজনকে এবং মামলা করা হয়েছে ২৯৪টি।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে নারী ও শিশু পাচার রোধে কঠিন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের ৫ ও ৬ ধারায় পাচারকারীর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী কোনো শিশুর অঙ্গহানি করলে বা অঙ্গ বিনষ্ট করলে যে ব্যক্তি এ রকম করেছে, তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানাও হতে পারে। নারী বা শিশু অপহরণ বিষয়ে বলা হয়েছে, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি ৩৬২ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২ (খ) ধারা মতে, যদি কোনো ব্যক্তি নারী ও শিশু পাচারের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কোনো নারী বা শিশুকে জোরপূর্বক কোনো স্থান থেকে গমন করার জন্য বাধ্য করে বা কোনো প্রতারণামূলক উপায়ে ফুসলিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে বা ভীতি প্রদর্শন করে প্রলুব্ধ করে, তবে সেই ব্যক্তি উক্ত নারী বা শিশুকে অপহরণ করেছে বলে গণ্য হবে। এই আইনের ধারা ৭ অনুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে অপহরণ করে, তবে ওই ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা কমপক্ষে চৌদ্দ বছরের জেল ও জরিমানা। ২০১২ সালে দেশে 'মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২' নামে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। এ আইনের ৬ ধারায় মানব পাচার নিষিদ্ধ করে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়। গত আট বছরে এ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ৫ হাজার ৭১৬। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ৯ হাজার ৬৯২ জন এবং সাজা হয়েছে মাত্র ৫৪ জনের। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৪৭টি মামলার, যার হার মাত্র ৪ শতাংশ।

নারী ও শিশু পাচার এবং মানব পাচার রোধে কঠিন আইন থাকলেও এই আইনের সুফল পাচারের শিকার হওয়া নারী ও শিশুরা কতটা পাচ্ছে- এ প্রশ্ন থেকেই যায় এবং শাস্তির বিধান থাকলেও উল্লেখজনক হারে পাচারকারীদের শাস্তি না হওয়ায় নারী ও শিশু পাচার দিন দিন বাড়ছেই এবং পাচারকারীদের মূল হোতারা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই চক্রের যেন শেষ নেই। সরকার, প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আরও বেশি আন্তরিকতাই পারে নারী ও শিশু পাচারের মতো জঘন্যতম অপরাধ নির্মূল করতে।

মন্তব্য করুন