মেরি কুরি এবং জেন গুডালের মতো বিখ্যাত নারী বিজ্ঞানীরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদানের জন্য সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তবে ইতিহাসে এমন কীর্তিমান আরও অনেক নারী বিজ্ঞানী আছেন, যাদের গবেষণা আলোকিত করেছে পৃথিবীকে। শুধু নারী হওয়ার কারণে অবহেলিত থেকেছেন, জীবিত অবস্থায় পাননি কাজের স্বীকৃতি। লিখেছেন আব্দুর রাজ্জাক সরকার

অ্যালিস বল।। রসায়নবিদ

১৮৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে জন্মগ্রহণ করা অ্যালিস বল ২৪ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে অনেক বাধা ভেঙে ছিলেন। তিনি হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের প্রথম নারী অধ্যাপক। এ ছাড়া কৃষ্ণাঙ্গ নারী আমেরিকানদের মধ্যে তিনিই প্রথম রসায়নের অধ্যাপক।

অ্যালিস বল কুষ্ঠরোগের প্রতিষেধক হিসেবে প্রথম তেল ব্যবহার করে তরল ওষুধ আবিস্কার করেছিলেন, যা সে সময় কুষ্ঠরোগের চিকিৎসায় বিপ্লব এনেছিল। কিন্তু এই আবিস্কারের কিছু দিন পর মাত্র ২৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি। অন্য আরেকজন বিজ্ঞানী তার গবেষণার কৃতিত্ব নিয়েছিলেন। অ্যালিসের মৃত্যুর প্রায় ৯০ বছর পর হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে তার বৈজ্ঞানিক অবদানকে স্বীকৃতি দেয় এবং ২৯ ফেব্রুয়ারিকে 'অ্যালিস বল দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে।

মারিয়া মেরিয়ান।। প্রকৃতিবিদ ও বৈজ্ঞানিক চিত্রকর

১৬৪৭ সালে জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করা মারিয়া মেরিয়ান একজন পতঙ্গবিজ্ঞানী এবং বৈজ্ঞানিক অঙ্কনশিল্পী। তিনি পোকামাকড় নিয়ে গবেষণার জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে প্রজাপতি নিয়ে তার ছিল অসীম আগ্রহ। কিন্তু সে সময় পোকামাকড় নিয়ে গবেষণা তো দূরের কথা, পড়াশোনা করাও ঘৃণিত কাজ হিসেবে গণ্য হতো। পোকার রূপান্তর সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য আবিস্কার থাকা সত্ত্বেও তার গবেষণাগুলো বিজ্ঞানীরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এ ছাড়া মারিয়া মেরিয়ান পোকামাকড় নিয়ে তার গবেষণাগুলো লাতিন ভাষার পরিবর্তে জার্মান ভাষায় লেখায় কোথাও স্বীকৃতি পাননি। মেরিয়ানের বৈজ্ঞানিক আবিস্কার এবং প্রাকৃতিক জগতের চিত্রগুলো তাকে তার জীবদ্দশায় শীর্ষস্থানীয় পতঙ্গবিজ্ঞানী এবং বৈজ্ঞানিক অঙ্কনশিল্পীতে পরিণত করে। বিভিন্ন পোকার বৈজ্ঞানিক নাম এবং শ্রেণিবিন্যাস এখনও তার দেওয়া নামেই পড়ানো হয়।

মেরি অ্যানিং।। জীবাশ্ম গবেষক

মেরি অ্যানিংয়ের জন্ম ও মৃত্যু ইংল্যান্ডের লাইম রেজিসে। ১৭৯৯ সালের ২১ মে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম ফসিল অনুসন্ধানকারী তিনি। দরিদ্র, নিম্নবিত্ত শ্রেণির নারী হয়েও তিনি লন্ডনের উঁচু শ্রেণির পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় সবার দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন। নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণার ধারাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

জীবাশ্ম নিয়ে মেরির গবেষণা ডারউইনের বিবর্তনবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছিল বলে মনে করা হয়। ইউরোপ এবং আমেরিকার অনেক বিজ্ঞানী জীবাশ্ম সম্পর্কিত বিষয়ে মেরির পরামর্শ নিতেন। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে তিনি বিজ্ঞানকে তার পেশা হিসেবে নিতে পারেননি এবং লন্ডনের জিওলজিক্যাল সোসাইটিতে তাকে সদস্যও করা হয়নি। মেরি অ্যানিংয়ের মৃত্যুর দীর্ঘদিন পর ১৮৪৭ সালে তিনি তার কাজের স্বীকৃতি পান।

নেটি মারিয়া স্টিভেন্স।। জিনতত্ত্ববিদ

১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণকারী আমেরিকান জিনতত্ত্ববিদ মারিয়া স্টিভেন্স তার জীবন গুবরে পোকা নিয়ে গবেষণায় ব্যয় করেছেন। ১৯০৫ সালে তিনি পর্যবেক্ষণ করেন পুরুষ পোকা দুই ধরনের শুক্রাণু তৈরি করে। একটি বড় ক্রোমোজোম, অন্যটি ছোট ক্রোমোজোম। নারী পোকার ডিমে নিষিক্ত হওয়ার সময় বড় ক্রোমোজোম নারী সন্তান জন্ম দেয় এবং ছোট ক্রোমোজোম পুরুষ সন্তান জন্ম দেয়।

এই ক্রোমোজোম পার্থক্যগুলো মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এভাবে স্টিভেন্স এক্সওয়াই ক্রোমোজোম ধারণার প্রবর্তন করেন। কিন্তু মারিয়া স্টিভেন্স নারী হওয়ার কারণে কোনো স্বীকৃতি পাননি, তার সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছিল। এক্সওয়াই ক্রোমোজোম ধারণার সব কৃতিত্ব পান উইলসন নামে আরেক বিজ্ঞানী।

হেনরিটা লেভিট।। জ্যোতির্বিদ

১৮৬৮ সালে ম্যাসাচুয়েটসে জন্মগ্রহণকারী হেনরিটা লেভিট হার্ভার্ড কলেজে একজন 'মানব কম্পিউটার' হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তিনি কম্পিউটারের মতো বিভিন্ন তথ্য বিশ্নেষণ করতে পারতেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরিটা লেভিট পরিবর্তনশীল নক্ষত্রের চিত্র চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি কেফেইড নামে ভেরিয়েবল নক্ষত্র আবিস্কার করেছিলেন, যা নক্ষত্র ও পৃথিবীর দূরত্ব এবং মিল্ক্কিওয়ের আকার ও মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণে সাহায্য করেছিল। হেনরিটা লেভিটের মৃত্যুর অনেক বছর পর এডউইন হাবল তার গবেষণা তথ্য ব্যবহার করে 'হাবল'স ল' প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু লেভিটের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

লিজে মাইটনার।। পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানী

লিজে মাইটনার একজন অস্ট্রীয়-সুয়েডীয় পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি নিউক্লীয় বিভাজন প্রক্রিয়ার প্রথম সফল ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। বিংশ শতাব্দীর নারী বিজ্ঞানীদের মধ্যে মারি ক্যুরির পরই তার নাম উচ্চারিত হয়ে থাকে।

অবশ্য নোবেল পুরস্কার লাভের সৌভাগ্য তার হয়নি, যদিও তা তার প্রাপ্য ছিল। বিজ্ঞানী অটো হান এবং তিনি একসঙ্গেই প্রায় সব গবেষণা করেছিলেন। কিন্তু নোবেল পান অটো হান একা। ইহুদি হওয়ার কারণে তাকে জার্মানিও ছাড়তে হয়েছিল। বিজ্ঞানের প্রতি অবদানের তুলনায় স্বীকৃতি পেয়েছেন বেশ কম।

রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন।। রসায়নবিদ ও আণবিক জীববিজ্ঞানী

রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন ১৯২০ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভৌত রসায়নবিদ ও কেলাসবিজ্ঞানী। তিনি ডিএনএ-এর আণবিক কাঠামো আবিস্কারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এ ছাড়া ফ্র্যাঙ্কলিন ভাইরাস নামে অণুজীবের গঠন সম্পর্কেও নতুন তথ্য আবিস্কার করেন। ফ্র্যাঙ্কলিন ১৯৫৮ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যুর ৪ বছর পর ১৯৬২ সালে মরিস উইলকিন্স, জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক-কে ডিএনএ-এর কাঠামো আবিস্কারে অবদান রাখার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এই তিনজনের সঙ্গে গবেষণা করেছিলেন ফ্র্যাঙ্কলিন। কিন্তু তাকে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

এস্থার লেদারবার্গ।। মাইক্রোবায়োলজিস্ট

১৯২২ সালে আমেরিকার নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে জন্মগ্রহণকারী বিজ্ঞানী এস্থার লেদারবার্গ মাইক্রোবায়োলজি এবং জেনেটিক্সের ক্ষেত্রে তার অবদানের জন্য কখনও স্বীকৃতি পাননি। তার স্বীকৃতি না পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিলেন তার প্রথম স্বামী জোশুয়া লেদারবার্গ। এস্থার লেদারবার্গ এবং জোশুয়া লেদারবার্গ দু'জনে মিলে গবেষণা করেছিলেন। কিন্তু নোবলে পান শুধু জোশুয়া লেদারবার্গ। ১৯৫৮ সালে জোশুয়া যখন নোবেল পুরস্কার মঞ্চে উঠে পুরস্কার গ্রহণ করেন, সে সময় ধন্যবাদও জোটেনি এস্থারের কপালে।

মন্তব্য করুন