আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর মা-বাবাকে অসংখ্য প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অটিস্টিক শিশুর মায়েদের সংগ্রাম করতে হয় তার পরিবারের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে, এমনকি নিজের সঙ্গেও। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা অবহেলা, উপেক্ষা ও করুণার চোখে দেখে থাকেন ওই শিশুটিকে এবং সেই সঙ্গে তার পরিবারকে। তখন সেই সন্তানকে নিয়ে মাকে জীবনের এক বিবর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয়।

সারাদিন মুখ দিয়ে লালা পড়ে ১৮ বছর বয়সী মিমের। থাকে কল্যাণপুর বস্তিতে। মিম কথা বলতে পারে না, খেতেও পারে না নিজের হাতে। জন্মের পাঁচ মাসের মধ্যে শনাক্ত হয় তার শারীরিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা। সেই থেকে সরকারি চিকিৎসা আর পারিবারিক যত্নে কোনোক্রমে টিকে ছিল মিম। মা জ্যোৎস্না জানান, শরীরের অবস্থা আরও খারাপ ছিল। কিছু চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় এখন সে কিছুটা সুস্থ। সরকারি মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে কিছু ওষুধ বিনামূল্যে পান, বাকিটা কিনতে হয়। করোনার কারণে জীবিকা হারিয়ে এই অর্থের জোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। করোনার আগে মিমের মা কয়েক বাড়িতে কাজ করতেন, বাবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। করোনা আসায় দু'জনেরই কাজ কমে গেছে। জ্যোৎস্না বলেন, 'আগে যেখানে আমাদের মাসিক পারিবারিক আয় ছিল সাত-আট হাজার টাকা, তা এখন এসে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার টাকায়।' বস্তির আরেক কিশোর ১৫ বছর বয়সী হাসিব। মিমের মতো বাকপ্রতিবন্ধী না হলেও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধকতা রয়েছে তারও। দুই ছেলেকে নিয়ে হাসিবের মা তাসলিমা একা থাকেন কল্যাণপুর বস্তিতে। স্বামী তাকে ছেড়ে গেছেন হাসিবের এক বছর বয়সে। নিজে বাসাবাড়ির কাজ করে সংসার চালান। তাসলিমা বলেন, 'অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছি প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে কাগজও জমা দিয়ে এসেছি, কোনো সাড়া পাইনি। এভাবেই ছেলেকে নিয়ে টিকে আছি। জানি না সামনে কী করব!'

বাঁধনের মা রোজিনা জানান তার যুদ্ধ করে সমাজে বেঁচে থাকার কথা। তিনি বলেন, 'বাঁধনের জন্মের কয়েক মাস পর অস্বাভাবিক আচরণ আমাদের চোখে পড়ে। আমাদের জানা ছিল না অটিজম শিশুর ব্যবহার কেমন হয়। অস্বাভাবিক আচরণ দেখে ডাক্তার দেখাই। জানতে পারলাম, বাঁধন অটিজমে আক্রান্ত। তখন আমার মাথার ওপর মনে হয় আকাশ ভেঙে পড়ে। ব্যাপারটি বাড়িতে জানাজানি হলে সবাই আমাদের কাছ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যেতে থাকে। বাঁধনকে নিয়ে কোথাও গেলে সবাই হাসাহাসি করে। পড়াশোনা করাতে গেলে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বাঁধন যখন খাবার খেত, আশপাশে যে থাকত তার দিকে খাবার নিক্ষেপ করত। কারণে-অকারণে তার সব শক্তি দিয়ে আমাদের আঘাত করত। লাফালাফি করা, ফ্লোরে শুয়ে পড়া, নিজেকে আঘাত করা ছিল তার প্রতিদিনের রুটিন। কোনো আত্মীয়ের বাসায় গেলেও সে সমানভাবে করে যেত এই আচরণ। মানুষের কাছে থেকে লজ্জা পেয়েছি, কখনও হতে হয়েছে অপমানিত। এভাবেই একাকিত্ব প্রতিনিয়ত চার দেয়ালের মধ্যে দুঃখে-কষ্টে কেটে যাচ্ছে আমাদের দিন। আমরা এতটা অবহেলার পাত্র হয়ে গেছি কেউ কখনও জানার চেষ্টা করে না আমরা কেমন আছি। এভাবেই দিন যাচ্ছে সমাজের মানুষের অবহেলা নিয়ে।'

বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের প্রতি, তাদের পরিবারের প্রতি আমরা যেন কখনোই অবজ্ঞা আর অবহেলার দৃষ্টিতে না তাকাই- তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আসুক পরিবর্তন।

মন্তব্য করুন