অটিজম বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা ব্যক্তিরা আমাদের সমাজে নতুন কেউ নয়। এমন হাজারো মানুষ আমাদের সমাজে বিদ্যমান। অন্যের সহায়তায় নানান মানসিক ও শারীরিক সমস্যা নিয়ে তারা দিনতিপাত করছেন। এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা ব্যক্তির সুরক্ষায় আছে আইন ও নানা প্রকল্প। কিন্তু কতটা বাস্তবায়িত হয় তাদের অধিকার সেটি প্রশ্ন সাপেক্ষ। ২ এপ্রিল ছিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। এ উপলক্ষে বিশেষ রচনা...

বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা সালেহ রহমান (ছদ্মনাম)। স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে বসবাস তার। কথা বলে জানা গেল, ছোট ছেলে অটিজমে আক্রান্ত। তার ছেলেকে সমাজের অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে অন্য অভিভাবকরা মিশতে দিতে চান না। স্কুলে ভর্তি করতে চাইলেও স্কুলেও সে সুযোগ পায়নি। এ অবস্থায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সালেহ রহমান।

ছোটবেলা থেকেই তানিয়া লাঞ্ছনার শিকার হতো। কেউ তাকে খেলায় নিতে চাইত না। স্কুলেও সহপাঠীরা কাছে বসত না। এসব কারণে বেশিদিন পড়াশোনা চালাতে পারেনি সে। এ রকম শত শত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে আমাদের আশপাশে। কিন্তু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর ক'জনেরই বা আমরা খোঁজখবর রাখি। ২ এপ্রিল ছিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। অটিজম বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়েছে। করোনাকালে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির কর্মক্ষেত্র ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, 'মহামারি-উত্তর বিশ্বে ঝুঁকি প্রশমন, কর্মক্ষেত্রে সুযোগ হবে প্রসারণ'। কিন্তু কথা হচ্ছে সমাজের সর্বক্ষেত্রে কি আসলেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের অধিকার আদায় হচ্ছে সঠিকভাবে? নাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ রয়ে যাচ্ছে।

এক সময় অটিজম ছিল একটি অবহেলিত জনস্বাস্থ্য ইস্যু। এ সম্পর্কে সমাজে নেতিবাচক ধারণা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নেতিবাচক ধারণা কিছুটা পরিবর্তন হলেও পুরোপুরি বদলে যায়নি বলেই মনে করেন এ নিয়ে কাজ করা সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

দীর্ঘদিন ধরে স্পেশাল চাইল্ড নিয়ে কাজ করা লেটস ব্রেক দ্য সাইলেন্সের প্রতিষ্ঠাতা জয়া করিম বলেন, 'সবার আগে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। তাহলেই এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে তেমন কোনো স্কুলেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ভর্তি নিতে চায় না। কারণ তাদের শিক্ষক এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত নয়। কীভাবে এই শিশুদের তারা সামলাবে। এসব বিষয়ে প্রশাসনের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।' তিনি আরও যোগ করেন, 'নতুন প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে শারীরিক-মানসিক প্রতিবন্ধিতা, অটিজম ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজটি আমরা করে যাচ্ছি দীর্ঘদিন ধরে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন বাংলা ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবং মাদ্রাসাতে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছি আমরা। আমরা অনেকেই জায়েদার গল্প জানি। গত বছর মার্চে আমরা জানতে পারি, কুমিল্লা সদর হাসপাতালে একজন ডাউন্স সিন্ড্রোম মেয়ে একটি সুস্থ ছেলেসন্তান জন্ম দিয়েছে। কে বা কারা মেয়েটার সঙ্গে এই জঘন্য অপরাধ করেছে সেটা খুঁজে বের করা খুব কঠিন; কারণ জায়েদা কথা বলতে পারে না। যারা কথা বলতে পারে, তাদের সঙ্গে অন্যায় হলেও অনেক সময় তার বিচার চেয়ে প্রেস ক্লাব কিংবা শাহবাগে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে হয় বিচার চাই, তারপরও বিচার হয় না। তাই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও খুবই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত।'

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সারাবিশ্ব যখন নাকাল, তখন অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুরা আরও বেশি নাজুক। এই সময়ে তাদের বিশেষ যত্ন ও সেবার প্রয়োজন। তাদের দিকে বেশি খেয়াল রাখা প্রয়োজন। অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (এএসডি) বা অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের লক্ষণ ও উপসর্গের মাত্রা বিচিত্র। একজনের সঙ্গে আরেকজনের হুবহু মিল নেই। কেউ সবাক, কেউ বা বাক্‌?শক্তি থাকা সত্ত্বেও কথা বলে না। কারও আচরণ অতি চঞ্চল, কেউ অতিরিক্ত গুটিয়ে থাকা স্বভাবের। অটিজম বিষয়ে অনেকের মধ্যে কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। সেসব ভ্রান্ত ধারণা দূর করার মাধ্যমে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনলেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব।

করোনাভাইরাস অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্যও নতুন একটা সংকট। কেননা অটিজম শিশুদের এখন ঘরেই থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থায় কোথাও বের হওয়া সম্ভব নয়। তাদের স্কুলেও যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় শিশুদের নানা বিষয়ে শেখানোর পাশাপাশি মানসিক বিকাশে অভিভাবকদের ভূমিকা রাখতে হবে। এই বিষয়ে জয়া করিম বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কাউন্সিলিংয়ের পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্যও কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন সূত্র তথ্য মতে, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় পরিচালিত ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে একটি করে অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী (এনডিডি) কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে অটিজম সমস্যাগ্রস্ত শিশু/ব্যক্তিদের বিভিন্ন সেবা প্রদান করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে অটিজম কোনো রোগ নয়। এটি একটি শিশুর মস্তিস্কের বিকাশজনিত সমস্যা। শিশুর জন্মের প্রথম দুই-তিন বছরের মধ্যেই এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। অটিজম এমন একটি বিকাশজনিত সমস্যা, যা হলে আক্রান্ত ব্যক্তির অন্য মানুষ বা বিষয়ের প্রতি কোনো আগ্রহ থাকে না। এ ছাড়া সামাজিক মিথস্ট্ক্রিয়া, ভাষা, আবেগীয় বিষয়গুলোও পরিলক্ষিত হয় না। এর মানে এই নয় যে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বোকা কিংবা অমেধাবী।

বেশিরভাগ শিশু অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হয়। প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে একজনের ছবি আঁকায়, গানে, গণিতে বা কম্পিউটারে খুবই দক্ষতা থাকে। ঠিকমতো পরিচর্যা করতে পারলে পরবর্তী সময়ে সে অনেক গুণী কেউ একজন হয়ে উঠতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কোনো শিশুর অটিজম নির্ণয় হলে অতিদ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের সবার সচেতনতাও বৃদ্ধি করতে হবে। শিশুটির সঙ্গে কথা বলার মাঝে, পড়ানোর সময়, সামাজিক বন্ধনে, খেলাধুলার মাঝেও বিভিন্ন বিষয় শেখাতে হবে। হাসি-খুশিতে রাখতে হবে সব সময়।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন এমন একজন সেভ দ্য চিলড্রেনের এডুকেশন অ্যাডভাইজর মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, 'বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা ব্যক্তিরা মেধাবী হয়ে থাকে। একটু পরিচর্যা করলে তারা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন সামাজিক, পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা। আমরা দেখি বেশিরভাগ স্থানেই অটিজমে আক্রান্ত মানুষের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা কিংবা উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু তাদের পটেনশিয়ালিটি নিয়ে কেউ কথা বলে না। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা ব্যক্তিরা মানসিক অবহেলার শিকার হয়। সেভ দ্য চিলড্রেন এ ক্ষেত্রে এ ধরনের শিশু বা ব্যক্তি পড়াশোনা যেন করতে পারে সে বিষয়ে স্কুলে আলোচনা করে। কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতার কাজটি করে যাই আমরা। এ ক্ষেত্রে অনেক ভালো কিছু উদাহরণ আমরা তৈরি করতে পেরেছি।'

ইউনিসেফের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, প্রতিবন্ধী শিশুর পরিস্থিতি বিশ্নেষণে (২০১৪) দেখা যায়, শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিশুরা বাংলাদেশে সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ৯৭ শতাংশ হলেও মাত্র ১১ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিশু যে কোনো ধরনের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে প্রতিবন্ধীত্বের ওপর বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। খানার আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১০ অনুযায়ী, অক্ষমতার হার মোট জনগোষ্ঠীর ৯.১ শতাংশ, যদিও ২০১১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী এ হার শতকরা ১.৭ শতাংশ। প্রতিবন্ধী শিশু মূল যে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয় সেটা তার বৈকল্য নয়, বরং সেটা হলো ব্যাপক বৈষম্য এবং কুসংস্কার।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ২০১০-১১ অর্থবছরে জনপ্রতি মাসিক ৩০০ টাকা এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা ২.৮৬ লাখ জন। বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১০২.৯৬ কোটি টাকা। অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকায় জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে অটিজম রিসোর্স সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে চালুকৃত অটিজম রিসোর্স সেন্টারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক/বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কাউন্সিলিং প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু সঠিকভাবে বাস্তবায়নের পথে মূল অন্তরায় হিসেবে মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে অটিজম বিষয়ে দক্ষ জনবলের অভাব।

মন্তব্য করুন