সমাজে তথাকথিত নিয়মের বাইরে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি গড়ে তোলা সহজ নয়। আর সে নিয়মের বাইরে গিয়ে সমাজে একজন নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছেন ড চিং চিং; যিনি 'ফিনারী'র স্বত্বাধিকারী। তবে তার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথটি মসৃণ ছিল না। অজস্র চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ তিনি সফল উদ্যোক্তা। চলুন তাহলে জেনে নিই তার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পেছনের গল্প।

গল্পের শুরুটা শৈশব থেকে। বান্দরবানের মেয়ে ড চিং চিং ছোটবেলা থেকেই আঁকিবুঁকি করতে ভালোবাসতেন, ঠিক তখনও তিনি জানতেন না তার এ ছোটবেলার প্রিয় অবসর বড় হয়ে তাকে উদ্যোক্তা হতে সাহায্য করবে। পড়াশোনা শেষ করে যখন সবাই চাকরির পেছনে ছোটেন, ঠিক তখন ড চিং চিং সামলাচ্ছেন 'ফিনারী'। তিনি বর্তমানে কাজ করছেন বাংলাদেশের ঐতিহ্য রিকশা পেইন্ট ও আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী কাপড় ও গহনা নিয়ে।

'ফিনারী' প্রতিষ্ঠার গল্পটা জানালেন ড চিং নিজে। খানিকটা হেসে তিনি বলেন, 'সময়টা ২০১৬- মাথায় একটা জিনিস কাজ করছিল, ব্যতিক্রমী কিছু করব। সে ভাবনা থেকেই ফিনারী প্রতিষ্ঠা করলাম।'

এত পেশা রেখে কেন উদ্যোক্তা হলেন- জানতে চাইলে ড চিং বলেন, 'আমি কখনও উদ্যোক্তা হবো বলে ভাবিনি, সেই ছোটবেলা থেকে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম; তবে হুট করে সে স্বপ্নের ছন্দপতনে হয়ে গেলাম উদ্যোক্তা। তবে পড়াশোনার পর চাকরি আমাকে কখনও টানেনি। মনে হতো সময়ের ছকে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে আমাকে আর উদ্যোক্তা তো স্বাধীন পেশা।'

উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পেছনে অনুপ্রেরণা কে- জানতে চাইলে ডং চিং বলেন, 'অবশ্যই আমার স্বামী। তিনিই সবসময় আমাকে ব্যতিক্রমী কিছু করতে সবসময় উদ্বুদ্ধ করতেন। এমনকি আমার পুরো পরিবার ও আশপাশের মানুষ আমাকে উৎসাহ দিয়েছে, তা না হলে এতদূর আসা সম্ভব ছিল না। তাদের কাছ থেকে অনেক ভালোবাসা পেয়েছি।'

ব্যবসার ক্ষেত্রে নারীদের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'অসংখ্য গল্প আছে এ প্রতিবন্ধকতা নিয়ে। নারী হয়ে ব্যবসা করাটা খুব সহজ নয়। কাজের ক্ষেত্রে মেয়েরা দক্ষ হয়ে উঠলেও মানুষের ভাবনার জায়গাটা ঠিক আগের মতোই আছে। যেমন আমি আদিবাসী মেয়ে হয়ে মানুষের কাছে উদ্যোক্তার পরিচয় দিই যখন, তারা জিজ্ঞেস করে পার্লারে কাজ করো? অধিকাংশ আদিবাসী সমতলে এসে পার্লারে চাকরি বা পার্লার ব্যবসার দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। তাই অনেক অধিবাসীকে নিয়ে এমন চিন্তা করে থাকে। এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আশা জরুরি।'

অনলাইন-অফলাইনে ব্যস্ত 'ফিনারী' অনলাইন ব্যবসা নিয়ে ড চিং জানান, অনলাইন ব্যবসা এখন আশীর্বাদস্বরূপ। বৈশ্বিক মহামারি করোনার পুরো সময়টা আমি ব্যস্ত সময় পার করেছি। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এটা সত্যি আশার আলো দেখার মতো।

রিকশার পেছনে আঁকা জীবন্ত ছবিগুলো আমাকে সবসময় নষ্টালজিক করে দিত। সেই ছোটবেলায় দেখা ছবিগুলোর নাম মনে পড়ে যেত লালুভুলু মহারাজ, নায়ক, রংবাজ, মেঘকন্যার মতো পুরস্কারপ্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য সিনেমার নামগুলো। সে শিল্পগুলো যখন দেখলাম, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী প্রজন্ম অবধি পৌঁছাচ্ছে না।

কথায় কথায় ড চিং বলেন, 'হ্যাঁ এখন অবধি নারী উদ্যোক্তারা অবহেলিত। ঋণ নেওয়ার প্রতিবন্ধকতা অনেক। তারা নারী উদ্যোক্তাদের মনে করে শুধু নামে মাত্র। এ ছাড়া অনলাইন উদ্যোক্তাদের তারা ভিত্তিহীন মনে করে। কিন্তু আমি দেখেছি অনলাইনের বাজারও অনেক বড়।'

ফিনারী নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে ড চিং চিং বলেন, 'দেশের ঐতিহ্য ধরে রাখার সর্বদা চেষ্টা করছি। এ ঐতিহ্যগুলো যেন হারিয়ে না যায়। এখন রিকশার পেছনে রিকশা পেইন্ট বলতে গেলে একেবারে বিলুপ্তির পথে শুধু প্রিন্ট পেইন্ট নেই আর সে কর্মের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরাও হারিয়ে যাচ্ছেন। আমি তাদের জন্য কিছু করতে চাই। আমি তাদের নিয়ে কাজ করছি। তাদের জীবনমান উন্নয়নে সাহায্য করছি; সে শিল্পীগুলো যেন সময়ের স্রোতে হারিয়ে না যায় আমি তাই চাই। তাই রিকশা পেইন্টকে ডাইভার্ড করে আধুনিকভাবে একে বাঁচিয়ে রাখতে একে সর্বসাধারণের হাতে তুলে দিতে চাচ্ছি এবং তুলে দিচ্ছি। আমি উদ্যোক্তা জীবনে এখনও শিখছি। মরণের আগ পর্যন্ত শিখে যাব। কাজ করি খুশি মনে, পরম ভালোবাসায়।'

মন্তব্য করুন