সাইবার স্পেসে শুধু নারী ভিকটিমদের সহায়তার জন্য গত বছর 'পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন' নামের একটি ইউনিট সেবা চালু করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী ৬৮ শতাংশ নারী সাইবার অপরাধের শিকার হন। এই ভিকটিমদের বয়স ১৬ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। এখন হয়রানির বিচার পেতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ তৈরি হওয়াতে অপরাধের পরিমাণ কমে আসবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ...

একই অফিসে কর্মরত পুরুষ সহকর্মী প্রায়ই ইনবক্সে খুদেবার্তা দেন। 'আজ সুন্দর লাগছে', 'আজকের পোশাকটা বেশ মানিয়েছে'- এ ধরনের অনেক প্রস্তাব। চাকরি রক্ষায়, গণ্ডগোলে জড়ানোর শঙ্কায় সরল মনে একবার-দু'বার সাড়া দিয়ে ফেললে শুরু হয় প্রস্তাবের দ্বিতীয় পর্ব। তারপর ইনবক্স করা শুরু হয় অফিস টাইমের পরও। এমনকি মধ্যরাতেও বলতে শুরু করেন ওই নারী সহকর্মীর কোন কোন বিষয় তার ভালো লাগে ইত্যাদি। শুরুতে সহকর্মী ভেবে চুপ থাকেন নারী সহকর্মীটি। কিন্তু এই চুপ থাকাকে দুর্বলতা ভেবে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে হয়রানির মাত্রা। একসময় পুরুষ সহকর্মীটিকে 'ব্লক' করতে বাধ্য হন ওই নারী। তারপরও চলে ফেক আইডির দৌরাত্ম্য। অফিসে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করলেও অনেক সময় ফল হয় উল্টো। অন্য সহকর্মীদের হাসির পাত্রও হতে হয়েছে তাকে।

বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাজমা (ছদ্মনাম)। কাজের সুবাদে ফেসবুকে যুক্ত হন আরাফাত (ছদ্মনাম) নামের এক ছেলের সঙ্গে। এর মধ্যে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করলে দেশে গত বছরের মার্চ থেকে লকডাউনে আরও কড়াকড়ি বাড়ানো হয়। তখন থেকে হোম অফিস করতে হয়েছে নাজমাকে। ফলে বেশিরভাগ সময় মোবাইল আর ল্যাপটপ ব্যবহারে অফিসের কাজ করতে হয়েছে। ওই সময়ই তাদের মধ্যে ইনবক্সে কথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হলে নাজমা ছেলেটিকে অনেক গোপন তথ্য দেয়। পরে তার প্রতি আরাফাতের ভিন্ন উদ্দেশ্য টের পেলে ব্লক করে দেয় নাজমা। এতে ছেলেটি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরে নাজমার ফেসবুকের বন্ধু তালিকায় থাকা অন্যদের ইনবক্সে তাদের কথোপকথনের স্কিনশট দিতে থাকে ছেলেটি। এবং তার সম্বন্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়াতে থাকে। পরিবারকে বিষয়টি জানালে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহযোগিতায় আরাফাতকে শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের মধ্যকার সময়ের বিভ্রান্তি ও হয়রানিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন নাজমা। একপর্যায়ে ফেসবুক বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণী জানিয়েছেন, তার প্রেমিক তার নগ্ন একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। তরুণী এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রেমিক জানায়, এই ছবি দেখে সব পুরুষ মেয়েটিকে কামনা করবে কিন্তু পাবে না। কারণ তরুণী কেবল প্রেমিকের এ কথায় আশ্বস্ত হলেও পরে তার উপলব্ধি হয়, তাকে ছেলেটি যৌনকর্মীর পর্যায়ে নামিয়েছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী গত বছর থেকেই বিভিন্ন সময়ে ঘরে থাকছে অধিকাংশ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তাদের বেশিরভাগ সময় কাটছে। এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সাইবার অপরাধীরাও। ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার ও টুইটার-অনলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী অনেক নারী জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়েই নানা হয়রানির শিকার হন তারা। করোনাকালে এ নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়েছে। এসব ঘটনায় কখনও কোনো কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, কখনও চুপ থাকেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোথায় অভিযোগ করবেন এবং কতদিনে বিচার পাবেন, এসব ভেবে অনেকেই এগোতে চান না। নম্বর বদলে ও আইডি বন্ধ করেই বাঁচতে চান।

একটি নারী অধিকার সংস্থা জানায়, সব বয়সী নারীরাই এ ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন, বাদ যায়নি আট বছরের মেয়েও। প্রতি পাঁচজন নারীর একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছেন বা ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। সংস্থাটির এক জরিপে এক-চতুর্থাংশ নারী জানিয়েছেন, তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ইউএন উইমেন জানিয়েছে, করোনা সংক্রমণের পর নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা এত বেড়েছে যে, আগের তুলনায় সাহায্য চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি ফোন এসেছে তাদের কাছে। শুধু তাই নয়, সাবেক প্রেমিক এবং হ্যাকাররা নারীদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দিচ্ছে অনলাইনে।

এমনই এক পরিস্থিতিতে সাইবার স্পেসে শুধু নারী ভিকটিমদের সহায়তার জন্য গত বছর 'পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন' নামের একটি ইউনিট সেবা চালু করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী ৬৮ শতাংশ নারী সাইবার অপরাধের শিকার হন। এই ভিকটিমদের বয়স ১৬ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। এখন হয়রানির বিচার পেতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ তৈরি হওয়াতে অপরাধের পরিমাণ কমে আসবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, ২০২০ সাল পর্যন্ত সাইবার অ্যাক্টে ৬ হাজার ৯৯টি মামলা হয়েছে। এই অপরাধগুলো নিয়ে ডিএমপি, ডিবি, সিআইডি, পিবিআই কাজ করছে। পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিটটি টেকনিক্যাল সহযোগিতা ও করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দিতে কাজ করবে উল্লেখ করে কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল যৌন হয়রানি নয়, সাইবার জগতের সব ধরনের হয়রানির শিকার নারীদের আমরা সেবা দেব।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ইন্টারনেটে একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি-ভিডিও ছড়ানোর মাধ্যমে যৌন নিপীড়নে ভুক্তভোগীদের ৬৯ দশমিক ৪৮ শতাংশই আপনজনদের হাতে শিকার হন। এর মধ্যে ৩৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও অপরাধীর মধ্যে প্রেমঘটিত সম্পর্কের তথ্য উঠে এসেছে এবং ৩৫ দশমিক ৭১ শতাংশ ঘটনায় অপরাধী ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচিত। প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বিষয়ে দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা না হলে এই সামাজিক ব্যাধি মারাত্মক আকার ধারণ করবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন কর্তৃক 'বাংলাদেশে প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে যৌন নিপীড়ন' শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাইবার স্পেসে যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে ৯২ দশমিক ২০ শতাংশ ভুক্তভোগীই নারী। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়স্ক ভুক্তভোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৫৬.৪৯ শতাংশ এবং ৩২.৪৭ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরের নিচে)। জেন্ডারভিত্তিক ভুক্তভোগীর বয়স বিশ্নেষণে দেখা গেছে ১৮ থেকে ৩০ বছর এবং ১৮ বছরের নিচে পুরুষের তুলনায় নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু ৩০ বছরের বেশি বয়স্ক ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে পুরুষের সংখ্যা বেশি।

অঞ্চলভেদে ভুক্তভোগীর সংখ্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যৌন নিপীড়নের সংবাদ পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে, যার পরিমাণ ৩৩.১২%। এর পরেই ১৬.৮৮% নিয়েই অবস্থান করছে চট্টগ্রাম। এ ছাড়া জেলা অনুযায়ী যৌন নিপীড়নের অধিকাংশ ঘটনা বিভাগীয় শহরে ঘটছে।

এ ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও প্রচারের ভয় দেখিয়ে যৌন নিপীড়নমূলক অপরাধপ্রবণতার মধ্যে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, আত্মহত্যার চেষ্টা, যৌনপণ, হত্যা-চেষ্টার মতো ঘটনাগুলোকে পরিসংখ্যানমূলক বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, হয়রানিমূলক যৌন নিপীড়নের সংখ্যা শতকরা ৬২ দশমিক ৯৯ শতাংশ, যা সর্বাপেক্ষা বেশি। অন্যদিকে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর সংখ্যা শতকরা ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যৌনপণ ১৩.৬৪ %, আত্মহত্যা ৩.২৫%, আত্মহত্যার চেষ্টা ১.৯৫%, খুনের চেষ্টা ০.৬৫ % এবং অন্যান্য ১.৯৫%।

এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কিশোর বয়স থেকে সন্তানদের মধ্যে যথাযথ প্যারেন্টিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। পিতামাতা দু'জনেই চাকরিজীবী হলে সন্তানদের মনিটরিং করা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। তরুণ-তরুণীদের স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ধারাবাহিক যথাযথ সেক্স এডুকেশন খুব প্রয়োজন। একই সঙ্গে ধর্মীয়-সামাজিক শিক্ষা ও সময়ের যথাযথ ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত কাজ দিতে হবে তরুণদের।

ঢাবির অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, 'অপরাধের মাত্রায় বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে ভিন্নতা দেখা যায়। বর্তমানে কভিড পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারণে অনলাইন কার্যক্রম বেড়েছে। ফলে এ ধরনের অপরাধ করার জন্য সময় বেশি পাচ্ছে। এ জন্য অপরাধ প্রতিরোধে বেশি বেশি সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন।' কম্পিউটার নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, 'অপরাধের শিকার হওয়ার পর ভুক্তভোগীরা বেশিরভাগই সামাজিক কারণে আপনজনদের সঙ্গে আলোচনা করে না। এটি একদমই উচিত নয়। ঘটনার শুরুতেই কাউকে না জানালে পরে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে যায়। এটি সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিজ নিজ জায়গা থেকে অপরাধ প্রতিরোধে আওয়াজ তুলতে হবে, তাহলে অপরাধের প্রবণতা কমবে।'

মন্তব্য করুন