তামাক ব্যবহারের ফলে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রাণ হারান প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশেই বছরে এক লাখ ২৬ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন তামাক ব্যবহারজনিত রোগে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারকারী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। পুরুষদের চেয়ে প্রান্তিক গ্রামীণ নারীরা ধোঁয়াবিহীন ও চর্বণযোগ্য তামাক পণ্যে বেশি আসক্ত। আগামীকাল ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। দিবসটি উপলক্ষে লিখেছেন গোলাম কিবরিয়া

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তমা (ছদ্মনাম)। নিয়মিত ক্লাস করেন। প্রাণবন্ত, উচ্ছল তমা হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। আশঙ্কাগ্রস্ত মা-বাবা তমাকে নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে জানতে পারেন, তাদের মেয়ে অতিমাত্রায় ধূমপানে আসক্ত। মা-বাবার কাছে তমার সরল স্বীকারোক্তি, নিছক আকর্ষণের বশে বন্ধুদের সঙ্গে ধূমপানে জড়িয়ে যান। এ রকম অনেক গল্প উদাহরণ হয়ে আছে আমাদের চারপাশে। একটু খোঁজ করলেই হয়তো জানা যাবে। তমার মতো অনেক তরুণী কিংবা বিভিন্ন বয়সের নারীদের তামাকের প্রতি আসক্তির প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে, যা একই সঙ্গে নারীর শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। আগামীকাল ৩১ মে সোমবার বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য 'জয়ী হতে হলে তামাক ছাড়ূন'।

তামাক এবং অন্যান্য নিকোটিন পণ্যে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষকে আকৃষ্ট করতে অত্যন্ত কৌশলী এবং আগ্রাসী প্রচারণা চালিয়ে আসছে দেশি-বিদেশি তামাক কোম্পানিগুলো। পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুসারে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ নিয়মিত তামাকে আসক্ত। সংখ্যায় তারা তিন কোটি ৭৮ লাখ। বিভিন্ন ধরনের তামাকসেবীর মধ্যে ১৮ শতাংশ, অর্থাৎ এক কোটি ৯২ লাখ ধূমপানে অভ্যস্ত। আবার ধূমপান হিসেবে সিগারেটের ব্যবহারই বেশি। দেড় কোটি প্রাপ্তবয়স্ক সিগারেট পান করে থাকেন। শতাংশে এই হার দেশের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ।

আশঙ্কার কথা হচ্ছে, দেশে তামাকের প্রতি আসক্ত নারীর সংখ্যা উল্লেখজনক হারে বাড়ছে। আর্থসামাজিক অবস্থান, বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণে নারীদের মধ্যে তামাকের প্রতি আসক্তির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

তামাকসেবীদের সাধারণত তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়- ধূমপান, ধোঁয়াবিহীন ও ধোঁয়াযুক্ত তামাক। ধোঁয়াযুক্ত তামাকের মধ্যে রয়েছে বিড়ি, সিগারেট ও ই-সিগারেট। ধোঁয়াহীন তামাকের মধ্যে তামাক, জর্দা এবং এই উভয় ধরন একসঙ্গে। তামাকসেবীদের মধ্যে ধূমপান করে পুরুষদের ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। নারীর সংখ্যা ১ শতাংশের কম। শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। অবশ্য ধূমপানে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও ধোঁয়াবিহীন তামাকে পুরুষদের তুলনায় বেশি নারীরা। ধোঁয়াবিহীন তামাকসেবী নারীর সংখ্যা ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। যেখানে পুরুষের সংখ্যা ১৬ দশমিক ২ শতাংশ (পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ)।

জর্দা ও গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন এবং চর্বণযোগ্য তামাক গ্রহণের প্রবণতা পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে অনেক বেশি। দিন দিন এ ধরনের তামাক গ্রহণের প্রবণতা আরও বাড়ছে। তামাকবিরোধী একাধিক সংস্থা ও সংগঠনের গবেষণায় দেখা গেছে, জর্দা ও গুলের কৌটায় উৎপাদনকারী হিসেবে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর বেশিরভাগের কোনো অস্তিত্ব নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল বলছে, তারা অর্ধেকের বেশি জর্দার কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। এ রকম পরিস্থিতির মধ্যেই দেশে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালিত হতে যাচ্ছে।

উবিনীগ (উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা)-এর একটি অনুসন্ধানমূলক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবহারকারীর সংখ্যা শতকরা ২০.৬ ভাগ (২ কোটি ২০ লাখ)। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারী নারীদের মধ্যে বেশি (২৮%) প্রাপ্তবয়স্ক নারী। ব্যবহারকারীর মধ্যে ধোঁয়াযুক্ত তামাক ব্যবহারকারীর ১৮ শতাংশের বেশি (এক কোটি ৯২ লাখ)। [গ্যাটস, ২০১৭] ভারত ও নেপালের পরেই ৯টি দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ধোঁয়াযুক্ত তামাক ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশ তৃতীয়। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫, সংশোধিত ২০১৩ এ তিনটি ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য, যেমন- জর্দা, গুল ও সাদা পাতা তামাকের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং আইনের আওতায় এনে ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ধোঁয়াবিহীন তামাক কারখানায় শ্রমিকের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৫৬ শতাংশ, যা নারী স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

তামাকে নারীদের আসক্ত করার জন্য কোম্পানিগুলো বিশেষ পরিকল্পনা করত। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলিনা থেকে সম্প্রতি নারীদের ধূমপানের ১০০ বছর নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ১৯২০ সাল থেকেই আমেরিকার তামাক কোম্পানি নারীদের জন্য সিগারেট বানাতে শুরু করেছিল। ইউরোপ-আমেরিকায় নারীদের মধ্যে সে সময় ধূমপানের প্রচলন কম ছিল। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্ত্রী ফার্স্ট লেডি এলিনর রুজভেল্ট একজন ফেমিনিস্ট আইকন ছিলেন। তামাক কোম্পানি এমন আইকনদের তামাক সেবনে ব্যবহার করে ফেমিনিস্টদের মধ্যে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছিল। সেবনকারী নিজে জানুক বা না জানুক, তামাক কোম্পানি জানে- ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। তাই তারা ধূমপানে আকৃষ্ট করলেও দেখাতে চেয়েছে পুরুষ যে সিগারেট সেবন করেন, নারী তা করছেন না। তাদের জন্য 'মাইল্ড' যাতে মনে হয় সিগারেট 'হালকা', 'নরম' ব্র্যান্ডের সিগারেট বাজারে ছাড়া হয়েছে। কোম্পানির এই কৌশলে কাজ হয়েছিল ভালোই; ১৯২০ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কর্মক্ষেত্রে নারীর যোগদান বেড়ে গেল, স্বাধীনতার দিক থেকে এক ধাপ এগিয়ে গেল; একই সঙ্গে নারীদের ধূমপানও বাড়তে থাকল। ১৯৬৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সমাজকল্যাণের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সে দেশে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ নারী ধূমপান করছেন।

তাবিনাজ (তামাক বিরোধী নারী জোট)-এর আহ্বায়ক এবং উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার বলেন, 'বাংলাদেশে নারীর সমতার দাবি দীর্ঘদিনের। এখানেও নারীবাদের একটি ধারা আধুনিকতা ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ধূমপান করে। তবুও মোট ধূমপায়ীর মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম; পুরুষ ৩৬.২%, নারী ০.৮%। এর মধ্যে ভাগ করলে দেখা যাচ্ছে, নারী সিগারেট সেবনকারীর হার ০.২% এবং বিড়ি সেবনকারী হচ্ছে ০.৬%। অর্থাৎ গরিব ও খেটে খাওয়া নারীরাই বেশি ধূমপান করছেন। কিন্তু এখানে নারী অন্যভাবে ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হচ্ছেন। যেমন- পুরুষের ধূমপানের কারণে কর্মক্ষেত্রে ১৯.২%, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১১.৪%, অফিস-আদালতে ২২.৮%, গণপরিবহনে ৩৮.২%, রেস্তোরাঁয় ২২.৪%, স্কুলে ৫.২% এবং নিজ বাড়িতে ৩৬.৫% নারী পরোক্ষ ধূমপান বা  Second Hand smoking দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আরও ভয়াবহভাবে আসছে ই-সিগারেট, যা এখনও তরুণদের মধ্যে বেশি ব্যবহার হলেও তরুণীদের হাতেও উঠছে এবং ধারণা দেওয়া হচ্ছে, এগুলো সিগারেটের মতো ক্ষতিকর নয়।'

এর সঙ্গে তিনিও যোগ করে বলেন, 'বাংলাদেশের নারীরা ধূমপানে কম হলেও ধোঁয়াবিহীন তামাক (জর্দা, সাদাপাতা, গুল) ব্যবহারে পুরুষের তুলনায় এগিয়ে আছেন। এখানেও নারীকে একভাবে বোঝানো হয় যে, বিয়ের পর তাকে স্বামীর কাছে আকর্ষণীয় হতে হলে ঠোঁট লাল করে রাখতে হবে। নিম্নবিত্ত নারী এই ফাঁদে পড়ে একসময় আসক্ত হয়ে যান। তখন তিনি নিজেই সেবন করতে থাকেন। সিগারেটের জন্য ভার্জিনিয়া পাতা চাষ করতে গিয়ে নারীকেই পাতা তোলা, স্টিক করা, পোড়ানো কিংবা রোদে শুকানো কাজ করতে হয়। যে তামাক কোম্পানি একসময় নারীকে সমতা অর্জনের জন্য আমেরিকার মতো দেশের নারীর হাতে সিগারেট তুলে দিয়ে ফুসফুসের ক্যান্সারের রোগী বানিয়েছিল, সেই তামাক কোম্পানি নারীকে তামাক পাতা উৎপাদনে ব্যবহার করে স্বামীকে লাভের লোভ দেখিয়ে স্ত্রীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে এবং নারীকে দিচ্ছে নানা রকম রোগ। তামাক সেবন এবং উৎপাদন পুঁজিতান্ত্রিক ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণের হাতিয়ার, কোনো অবস্থাতেই নারীর সমধিকারের মাধ্যম হতে পারে না। এই সহজ সত্যটি বুঝতে হবে।'

তামাকে নারীর আসক্ত বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করা সাবিহা বিনতে বলেন, 'বর্তমান প্রজন্মের মাঝে তামাকের প্রতি, বিশেষ করে ধূমপানে নারীদের আসক্তি বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একাকিত্ব, হতাশা ও খারাপ সঙ্গ এর অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি।'

সম্প্রতি চিকিৎসা পেশাজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর এনসিডি কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (বিএনএনসিপি) এক গবেষণায় দেখা যায়, তামাক পণ্য ব্যবহারের ফলে প্রতিবছর দেশে এক লাখ ৬১ হাজারের অধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এ পরিস্থিতিতে দেশে এখনও প্রায় তিন কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক (ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন) ব্যবহার করেন।

তামাক ব্যবহারে অতিমাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের উপদেষ্টা প্রফেসর ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত 'তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও যুবসমাজের ভূমিকা' শীর্ষক একটি ওয়েবিনারে বলেন, ধূমপানের ফলে পৃথিবীব্যাপী প্রতিবছর ৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়, ২০৩০ সাল নাগাদ এ মৃত্যু ১১ মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে। একটা তামাক পাতায় ১৯টি ক্যান্সারের উপাদান থাকে। চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত মানব শরীরের এমন কোনো অংশ নেই, যা ধূমপানের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতি, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা ধরনের ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি স্থায়ীভাবে অন্ধত্ববরণ পর্যন্ত করতে হতে পারে ধূমপানের ফলে। তামাক ব্যবহারে নারীদের আসক্তি বৃদ্ধির বিষয়ে এখন থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। অতিসত্বর পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

মন্তব্য করুন