'আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ'- এই বুলি আজকের সংঘাতময় পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে ঠুনকো এবং মিথ্যে মনে হবে, যখন সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি হামলায় কিংবা আফগানিস্তানে মার্কিন-তালেবান যুদ্ধে নিহত শিশুদের সংবাদ ও ছবি দেখবেন। ক্ষমতার যুদ্ধের বলি হয়ে লাখো শিশুর জীবনপ্রদীপ নিভে যাচ্ছে অচিরেই।

ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি ১১ দিনের হামলায় কমপক্ষে ৬৭ ফিলিস্তিনি শিশু ও ইসরায়েলের দু'জন শিশু মারা যায়। এ শিশুরা ক্ষমতা, স্বার্থ, দেশ ইত্যাদি ভেদাভেদ বোঝার আগেই ঝরে গেছে অকালে। দুই ভূখণ্ডের মধ্যে সংঘাত পরিস্থিতি স্থিতি পেলে আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিষ্ঠান 'নিউইয়র্ক টাইমস' প্রথম পৃষ্ঠার প্রায় পুরোটা জুড়েই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে নিহত শিশুদের ছবি দিয়ে শিরোনাম করে 'তারা শুধুই শিশু ছিল'। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশু পরিচয়ের বাইরে অন্য পরিচয় হওয়ার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে তারা। কেউ চিকিৎসক, কেউ শিল্পী ও কেউ-বা দেশ পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিল। তবে সে স্বপ্ন পূরণের আগেই বোমা ও রকেট হামলায় চিরবিদায় নেয় তারা।

এ তো গেল ফিলিস্তিনের কথা। গোটা বিশ্বের দিকে যদি চোখ ফেরাই সিরিয়া, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া, সিয়েরালিওন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান- প্রায় সব অঞ্চলেই যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজমান। আর এ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার হলো নিরপরাধ শিশু। এই যখন অবস্থা তার মধ্য দিয়েই গত ৪ জুন পালিত হলো 'ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ফধু ড়ভ রহহড়পবহঃ পযরষফৎবহ ারপঃরসং ড়ভ ধমমৎবংংরড়হ'।

সেভ দ্য চিলড্রেনের এক প্রতিবেদন অনুসারে জানা যায়, গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে সংঘাতের বলি হয়ে নিহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছে এক লাখেরও বেশি শিশু। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে গড়ে প্রতিদিন ২৫ জন শিশু নিহত বা পঙ্গু হয়েছে। তাদের তথ্য মতে, ৪২৬ মিলিয়ন শিশু যুদ্ধ ও সংঘাতের এলাকায় বেড়ে উঠছে; যার মধ্যে ১৬০ মিলিয়ন শিশু তীব্র সংঘাত ও সংকটময় এলাকায় বাস করছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ২০১১ সালে। এই যুদ্ধে মদদ জুগিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা ও রাশিয়ার মতো ক্ষমতাধর দেশগুলো। দ্য সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য মতে, এক দশকের এই গৃহযুদ্ধে আসাদ সরকার ও ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় নিহত হয়েছে ২২ হাজার ৭৫৩ জন। রাশিয়ার যোগদানের পর তাদের হাতে এক হাজার ৯২৮ জন, সিরিয়ার বিরোধী বাহিনীর হাতে ৯৮৪ জন, আইএসের হাতে ৯৫৬ জন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের হাতে ৯২৪ জন ও কুর্দি যোদ্ধাদের হাতে ২১৪ জন শিশু মারা গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বাহিনীর হাতে আটক রয়েছে ৫ হাজারেরও বেশি শিশু। যুদ্ধবিধ্বস্ত এশিয়ার দেশ আফগানিস্তানে গত ১৫ বছরে প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। সূত্র :সেভ দ্য চিলড্রেন।

সংস্থাটির তথ্য মতে, ২০০৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আফগানিস্তানে মারা গেছে অথবা চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেছে কমপক্ষে ২৬ হাজারের বেশি শিশু। বিশ্বে শিশুদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ১১টি দেশের একটি আফগানিস্তান। বৈশ্বিক সহিংসতার ওপর গত শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংগঠনটি বলেছে, শুধু ২০১৯ সালেই দেশটিতে নিহত হয়েছে ৮৭৪ শিশু। আর পঙ্গুত্ববরণ করেছে ২ হাজার ২৭৫ শিশু। হতাহত হওয়া এই শিশুর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ছেলে শিশু। সরকারি সেনা ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই, বোমা বিস্টেম্ফারণ ও আত্মঘাতী হামলায় এই শিশুরা হতাহত হয়। মার্কিন সেনাদের সমর্থনপুষ্ট আফগান সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তালেবান ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান লড়াইয়ে স্কুলগুলোকে নিয়মিতভাবে হামলার নিশানা বানানো হচ্ছে। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে স্কুলগুলোতে তিন শতাধিক হামলা হয়েছে।

হামলার শিকার হয়ে তো নিহত হচ্ছেই শিশুরা। প্রাণ বাঁচাতে দুর্গম পথে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পরিবারের সঙ্গে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে পালাতে গিয়েও বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছে অনেক শিশু। ২০১৫ সালে সিরিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার সময় নৌকাডুবিতে প্রাণ হারানো আইলান কুর্দি। সমুদ্রসৈকতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা তার লাশের ছবির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে আমাদের।

মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া আহত শিশুরা পঙ্গুত্ববরণ ও পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ এবং অপুষ্টির শিকারও হচ্ছে। অজস্র শিশু-কিশোরদের বাধ্য করা হচ্ছে যুদ্ধে অংশ নিতে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ, দাতব্য সংস্থাগুলো এবং বিভিন্ন রাষ্ট্র সংঘাতের বলি হয়ে শিশুমৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনায় নিচ্ছে নানা পদক্ষেপ। সর্বোপরি আমরা যদি মানবিক হয়ে উঠতে না পারি, তবে এই হত্যাযজ্ঞ কিছুতেই থামবে না।

মন্তব্য করুন