সম্প্রতি ভারতের বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি এক তরুণীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয় অনলাইনে। এতে টনক নড়ে দুই দেশের প্রশাসনের। গ্রেপ্তার হয় অন্তরালের হোতারা। বিগত কয়েক বছরে এই চক্র বেশি বেতনের চাকরি ও টিকটকের তারকা বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে কয়েক হাজার তরুণীকে ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে। আইন ও প্রশাসনের নজরদারি থাকা সত্ত্বেও থামছে না নারী পাচার। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাজিদা ইসলাম পারুল

পরিবারের ওপর অভিমান করে রংপুর থেকে ঢাকায় চলে আসেন আয়েশা (ছদ্মনাম)। পরে এক বান্ধবীর সহযোগিতায় গার্মেন্টে চাকরিও নেন। সবকিছুই স্বাভাবিক চলছিল। তখন রুবেল নামে এক সহকর্মী আরেকটি ভালো চাকরি দেওয়ার নাম করে টাঙ্গাইলের যৌনপল্লিতে তাকে বিক্রি করে দেয়।

ঘটনা ভিন্ন হলেও একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল সাবিহাকেও। ভালোবেসে আতিককে বিয়ে করেছিলেন তিনি। তারা তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেননি। পরে তারা উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় যান। তবে ভালোবাসার চশমা চোখ থেকে খুলে পড়তে সময় নেয়নি। একপর্যায়ে আতিকের বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হলে সাবিহাকে তিনি বিক্রি করে দেন সেখানকার এক যৌনপল্লিতে। এই পল্লিতে চার বছর তাকে বাধ্য করা হয় শরীর বিক্রি করতে।

আয়েশা, সাবিহার মতো দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার তরুণীসহ তরুণরাও পাচারকারীদের ফাঁদে পড়েন। সম্প্রতি ভারতের বেঙ্গালুরুতে এক বাংলাদেশি তরুণীর ওপর নির্যাতনের ছবি ভাইরাল হওয়ার পর সংঘবদ্ধ নারী পাচার চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এই অনুসন্ধান নতুন কিছু নয়। কোনো অঘটন ঘটার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। কিছু অপরাধী ধরাও পড়ে। সময়ের ব্যবধানে আবার সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে।

প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষ করে ফেসবুক ও 'টিকটক তারকা' বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে গত এক বছরে দেড় হাজার নারী পাচার হয়েছেন। পাচারের শিকার ভারতফেরত তরুণী জানিয়েছেন- তিনি একা নন, আরও অনেক বাংলাদেশি মেয়ে পাচার হয়ে ভারতের বিভিন্ন শহরে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। বদলে গেছে তাদের নামও। চাকরি দেওয়ার নাম করে তাদের সেখানকার যৌনপল্লিতে যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেছেন, সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী দাবকপাড়া কালিয়ানী এলাকা থেকে মেহেদী হাসান, মহিউদ্দিন ও আবদুল কাদের নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। টিকটকের মডেল বানানো এবং উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এসব নারীকে পাচার করা হয়েছে। নারী পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা আশরাফুল মণ্ডল ওরফে বস রাফিসহ র‌্যাবের হাতে চারজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী পাচারের সঙ্গে এ ধরনের আরও অনেক চক্র জড়িত। তাদের খুঁজে বের করতে না পারলে এ রকম বিচ্ছিন্ন অভিযান কোনো ফল দেবে না। ২০২০ সালের মানব পাচার তথা টিআইপি বা বৈশ্বিক ট্রাফিকিং ইন পারসন (টিআইপি) সূচকে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে ছিল। টায়ার মাইনাস টু থেকে টায়ার টুতে উন্নীত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই এই অগ্রগতির প্রশংসা করেছিল। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে দুই লাখ নারী-পুরুষ ও শিশু পাচার হয়েছে। প্রতিবছর ২০ হাজার নারী ও শিশু ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে যায়। তবে তিন বছর আগে টাইমস অব ইন্ডিয়া বিএসএফের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার নারী পাচার হচ্ছে এবং গত এক দশকে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি নারী ও শিশুকে অবৈধভাবে ভারতে পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য এবং এনজিওর অনুমানের তথ্য উদ্ধৃত করে বিএসএফ এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে আরও বলা হয়, ভারতের বিভিন্ন শহর/রাজ্যে পরিচালিত মানব পাচার সিন্ডিকেট সরাসরি বা কলকাতার এজেন্টদের মাধ্যমে মানব পাচার করা হয়। বাংলাদেশের পাচারকারীর চক্রে রয়েছে ৮৪ শতাংশ পুরুষ ও ১৬ শতাংশ নারী।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং ভারতের কয়েকটি রাজ্যের অপরাধীদের একটি আন্তর্জাতিক চক্র এ কাজ করছে। এই চক্রের মূল আস্তানা বেঙ্গালুরুর আনন্দপুর। পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত করতে বিভিন্ন বয়সের মেয়েকে পাচার করে তারা। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের হোটেলগুলোর সঙ্গে চুক্তি রয়েছে পাচারকারী বিভিন্ন চক্রের। আর বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ৩০টি জেলা দিয়ে নিয়মিত নারী ও শিশুরা পাচার হয়। তবে পাচারকারী নারী ও শিশুদের আগে ভারতের দু-একটা শহর, যেমন কলকাতা ও মুম্বাইয়ে নেওয়া হতো। বর্তমানে ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই বাংলাদেশের মেয়েদের আটকে রাখা হয়।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরীফুল হাসান সমকালকে বলেন, 'মানব পাচার যে শুধু ভারতকেন্দ্রিক হচ্ছে তা নয়। একদিকে যেমন ভারতে বাংলাদেশের তিনটি সীমান্ত এলাকা দিয়ে হচ্ছে, আরেকদিকে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকছে। তারাও বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে মালয়েশিয়া, সিরিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে নারী-পুরুষ পাচার করা হচ্ছে। চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হচ্ছে; অথবা পতিতাপল্লিতে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। দেশে মানব পাচাররোধে আইন করা হয়েছে। যে আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োগ নেই। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে হাজার হাজার মামলা ঝুলে আছে।'

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পর ছয় হাজার মামলা হয়েছে। তবে আগের মামলাসহ এ আইনে মোট ছয় হাজার ৭৩৫টি মামলা করা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়। ছয় হাজার ৭৩৫ মামলার অভিযোগপত্রে জানা যায়, দেশের ভেতর ও বাইরে মিলিয়ে মানব পাচারের শিকার হয়েছেন ১২ হাজার ৩২৪ জন। তাদের মধ্যে ৯ হাজার ৭১০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২৭ হাজার ৩৬৩ জন পাচারকারী যুক্ত ছিল। বিভিন্ন সময়ে ১২ হাজার ২৮০ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদিকে ছয় হাজার ৭৩৫টি মামলার মধ্যে মাত্র ২৩৩টি মামলায় বিভিন্ন ধরনের সাজা হয়েছে। অর্থাৎ মোট ২৩৩টি মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। আর বাকি ৫৭৭টি মামলায় কারোর সাজা হয়নি। অভিযুক্তরা অব্যাহতি পেয়ে গেছে। অর্থাৎ মোট মামলার মধ্যে ৮১০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। সাজার ধরন হিসেবে জানা যায়, মাত্র আটজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন আদালত। বাকি ২৯৯ জনের যাবজ্জীবন হয়। আর বাকি ১০২ জনের বিভিন্ন ধরনের সাজা হয়েছে।

এদিকে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন অনুয়ায়ী, প্রত্যেকটা জেলায় একটি করে ট্রাইব্যুনাল গঠন করার কথা থাকলেও এখনও পর্যন্ত তা হয়নি। সবশেষে গত বছর সাত বিভাগে সাতটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের চেষ্টা থাকলেও বৈশ্বিক মহামারি করোনায় তাও থমকে গেছে।

মন্তব্য করুন