পরিবার- চার বর্ণের এই শব্দ মানব জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পরিবার থেকেই আমাদের জীবনযাত্রা শুরু হয়, সমাপ্তিও হয় একই স্থানে। ফলে আমাদের মানস, বোধ এবং চিন্তার গঠন ও শিক্ষণ প্রক্রিয়াও শুরু হয় এখান থেকে। নৈতিকতা, মানবিকতা ও সমতার শিক্ষা যদি পরিবার থেকেই শুরু হয়, তবে হয়তো সমাজের চলমান হানাহানি, বিদ্বেষ ও নারী-পুরুষের ভেদাভেদ কমে আসত। এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন তৌহিদুল হক

সমাজ ব্যবস্থার ধরন অনুসারে মানুষের জীবনের সামগ্রিক আয়োজন শুরু হয়। সমাজ কাঠামো ঠিক করে দেয় সমাজে মানুষের কর্মের পরিচয় কী হবে। সমাজের প্রচলিত রীতি নির্ধারণ করে সম্পর্কের শিরোনাম কিংবা সম্বোধনের বিস্তারিত বিবরণ। একটি দেশের সমাজ ব্যবস্থা সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তিত হয়। পাল্টে যায় মানুষের মানবিক আদর্শ। কোথাও বসবাসের ধরন ব্যক্তিকেন্দ্রিক অবয়বে বেষ্টিত, কোথাও সমষ্টিগত প্রবাহে পরিব্যাপ্ত। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের বসবাস ও চলনের ধরন পরিবারকেন্দ্রিক চিন্তা ও অনুশীলনে দীর্ঘপথ অতিক্রম করেছে। সমষ্টিগত ভাবনায় এখানকার সমাজতরী চলমান সম্পর্কের গতি সামনের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ হয়ে ওঠে 'মানুষ' কিংবা সমাজ টিকিয়ে রাখার সহায়ক শক্তি। প্রতিটি সমাজে কিছু প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো মানুষের মানবিক বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রেখে মানুষের চিন্তার জগতে সমতা ও আদর্শবোধের পরিধি ঠিক করে। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় পরিবার একটি আদি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবারের সদস্যকে সব কর্মের প্রাথমিক শিক্ষণ ও অনুভূতির প্রসারণ সৃষ্টির প্রয়াস তৈরি করে।

পরিবার থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা মানুষের জীবনে মূল উপজীব্য হিসেবে বিবেচ্য। মানুষ বুঝতে পারে সমাজের বৃহৎ পরিসরে মানুষের কর্মের আদল কীভাবে সম্পাদিত হবে এবং ফুটে উঠবে সমাজতাত্ত্বিক বিশ্নেষণে মানুষের মূল পরিচয়। যার প্রেরণা মানবিকবোধ দ্বারা পরিচালিত।

পরিবার শুধু কয়েকজন সদস্যের সমষ্টি নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আরও গভীরে প্রসারিত। পরিবারে একত্রে বসবাস করতে গিয়ে সদস্যরা পরস্পর সহমর্মিতার শিক্ষা অর্জন করে, অর্জন করে উপলব্ধির নিগূঢ় সারবস্তু। পরস্পর পরস্পরের প্রয়োজনে এগিয়ে আসে, এগিয়ে থাকে। ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে আত্মীয়তার বন্ধনকে আরও নিবিড় করে এবং একীভূত ভাবনার পরিবেশ সৃষ্টি করে। ফলে পরিবারের সদস্যরা কখনও ভুলে যেতে পারে না পরিবারের ভূমিকা ও অবস্থানগত আবেগ। একত্রে বসবাসের ফলে সৃষ্ট আবেগ বা অনুভূতির চাপে সদস্যরা পরিবারের ঐতিহ্য ও পরস্পর পরিচয় দীর্ঘদিন বহন করার মানসিকতা ধারণ করে। সদস্যদের মধ্যে প্রসারিত হয় দায়িত্ব পালনের সমতাকেন্দ্রিক মনোভাব। একজনের জন্য অন্যজনের টান কিংবা আগলে রাখার জন্মগত আকাঙ্ক্ষা।

পরিবারের সদস্যরা অভিভাবকদের কাছ থেকে শিক্ষার বুনিয়াদি আয়োজনে মিলিত হয়, উচ্চারণ করে শিক্ষার প্রথম শব্দ কিংবা বাক্যের আবেগগত ব্যাকরণ। পরিবার সদস্যদের মধ্যে নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। সদস্যরা সমাজের দীর্ঘ প্রপঞ্চে কীভাবে নিজেদের পরিচয় ও ভূমিকা পালন করবে তার প্রাথমিক দীক্ষা পরিবার থেকে প্রাপ্ত হয়। আদর্শলিপির এক উজ্জ্বল উদাহরণ পরিবার থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার সমষ্টি। সমাজে ছোট-বড় বয়সভেদে সম্মানের রূপরেখা পরিবার থেকে মানুষ শেখে। মানুষ বুঝতে পারে বয়সে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রতি সামাজিক আদবের নীতিমালা কী হবে।

পরিবার সদস্যকে সমাজের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে উদ্ভূত অবস্থা কীভাবে মোকাবিলা করে সমাজে নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে হয় তার প্রাথমিক হাতেখড়ি দিয়ে থাকে। সব শিক্ষার সূচনা পরিবার থেকে শুরু হয়, আবার পরিবারের মধ্যে জীবনের পরিসমাপ্তি। জীবনের শুরু এবং জীবনের শেষ প্রান্ত- এর মাঝের সময়টুকু অতিক্রমে পরিবার অভিভাবক হিসেবে পাশে থাকে এবং ত্রাণকর্তা হিসেবে ভরসা দিয়ে থাকে।

সমাজ ব্যবস্থায় জেন্ডারগত বিষয় মূল প্রাধান্যের অবস্থানে থেকে মানুষের ভূমিকাগত প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় জেন্ডারগত পরিচয় পরিবার এবং সমাজে নারী-পুরুষের ভূমিকার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেয়। মানুষ বুঝতে পারে এবং মেনে নেয় যে, পুরুষ হলে দায়িত্বের পরিধি কী হবে। তেমনিভাবে নারী হলে কর্মের কর্মসূচি কীভাবে ব্যাপ্ত হবে। প্রশ্ন হলো- পরিবার সদস্যদের মধ্যে জেন্ডারগত বৈষম্য বিলোপ বা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও সমাজের চাপে সফল হতে পারে না। তবে পরিবার নিজ সদস্যদের প্রতি সংবেদনশীলতার উত্তম অনুশীলনের শিক্ষা দিয়ে থাকে। অন্যদিকে সমাজ ব্যবস্থার বাস্তবতা মেনে নিয়ে এটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সমাজে নারীর প্রতি সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করার শিক্ষা মানুষ পরিবার থেকে লাভ করে। একজন নারী শুধু সমাজের সদস্য নয় বরং মানবসভ্যতা বিকাশে সমাজের বিন্যস্তরূপ পরিগ্রহ করার ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা আরও গহিনে প্রসারিত। নারীকে সৃষ্টির মূল প্রেরণার জায়গায় রেখে সম্মানবোধের মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করার চেতনা পরিবার থেকে উদ্ভূত হয় এবং মানুষকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে ভিন্নরূপ দৃশ্যমান হলেও মানুষ নারীর প্রতি সহজাত প্রবণতা অস্বীকার করতে পারে না।

বাংলাদেশে পরিবার ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক ভিত্তি অধিকাংশ পরিবারে এক ব্যক্তির উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক সক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা মানুষের এক অতি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। এক উৎস থেকে উপার্জিত অর্থ সবার চাহিদা পূরণে ব্যয় করার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে বিরল এবং অনুকরণীয়ও বটে। বাংলাদেশে প্রচলিত এই প্রবণতা মানুষের অন্তরে মনুষ্যত্বের জয়গান সংগীতের মতো প্রভাব রাখে। মানুষ চোখের জলে উপলব্ধি করে অন্য সদস্যের কষ্টের মিছিলের প্রতিটি শব্দ। আবার আনন্দ-উৎসবে একত্র হওয়ার তাগিদ মানুষকে গভীরভাবে জড়িত করে বেঁচে থাকার নির্মল প্রয়াসে। এভাবে জীবন বাঁচে, বাঁচে চোখের তারায় স্বপ্নের জমাটবদ্ধ আবরণ। পরিবার মানুষকে বেঁচে থাকার সামগ্রিক আয়োজনে প্রেরণা দেয় নেতৃত্বের মূল অবস্থান থেকে। পরিবারের মাধ্যমেই ভরসা তৈরি হয়, তৈরি হয় অনেক দূরে এগিয়ে যাওয়ার দুর্বার সাহস।

সমাজের ভেতরকার প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত কর্মের অবগাহনে সমাজের ভিত রচিত হয়। সমাজ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, ধর্মীয় উপলব্ধি ও অনুশীলন, পরস্পর সহযোগিতা, সামাজিক সম্প্রীতির বলিষ্ঠ আয়োজন সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাকরণিক রূপ প্রদান করে। বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোয় মানুষের সমাজবদ্ধ পরিচয়ের ক্ষেত্র এভাবেই প্রসারিত এবং অনুরূপভাবে উপলব্ধির মাত্রা সৃষ্টি করে।

মানুষ পরিবারকে কেন্দ্র করে জীবনের সূত্র রচনা করে এগিয়ে যেতে চায় এবং সমাজের চেহারা মানবিক উপলব্ধিতে বিন্যস্তকরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। কিন্তু সমাজের মধ্যকার ক্ষমতা, অর্থের আধিপত্য, সমস্যার বিস্তার নামক দানব মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয় মানুষের কাছ থেকে। সৃষ্টি করে বিভেদ। মানুষ শত্রু হয়ে ওঠে মানুষের। ক্ষতি হয় সমাজ কাঠামোর সহজাত আয়োজনের। প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে সমাজ গঠনের ইতিহাস ও পর্যায়ক্রমে গড়ে ওঠা সংগ্রাম, ত্যাগ ও সাহসের উদাহরণ।

পরিবার যত বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখবে এবং ভূমিকা পালনের সুযোগ তৈরি হবে, সমাজ কাঠামো তত মজবুত হবে। মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হবে সত্যিকার মানবিক চেতনার সব কর্মলিপি। পরিবারঘেঁষা জীবন ব্যবস্থায় সমাজের মধ্যকার দানব মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। মানবিক ধারায় পরিচালিত মানুষ সব সমস্যা দূর করে একত্র হয় মানুষের কল্যাণে, রচনা করে সমতার সংবিধান। যেখানে ধর্ম, বর্ণ কিংবা গোষ্ঠী নয়, মূল পরিচয় মানুষ। সময়ের দীর্ঘ পরিসরে সংগ্রাম ও ত্যাগের মহিমায় মানুষের আশ্রয়স্থল মানুষ। আর এই মানুষ সৃষ্টি হয় পরিবারের সহজাত নিয়ম এবং রীতিতে। পরিবার ব্যবস্থার সক্রিয় পদচারণা সমাজের ভিত আরও মজবুত করে, জাগ্রত করে মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মনুষ্যত্ব ও সহমর্মিতার প্রকাশ; যা প্রকাশে মানুষ জন্মগতভাবে চাপ অনুভব করে।



লেখক

কবি ও সহকারী অধ্যাপক

সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন